করিম হোশাম: এক হাজার ডলারে সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার বিক্রি করেছেন যিনি

ক্রিকেট বা ফুটবলে নিয়মিতই ম্যাচ পাতানোর খবর শোনা যায়। সেদিক থেকে টেনিস বেশ স্বচ্ছ। বিশ্বের অন্যতম দামি এই খেলায় খুব বেশি কলঙ্ক লাগেনি। বরং নারী পুরুষের যে বৈষম্য তার অনেকটাই দূর করেছে টেনিস। অন্যান্য খেলার মতো টেনিসেও সম্ভাবনাময় খেলেয়াড়দের আগমণ ঘটে। এদের মধ্যে কেউ নিজের প্রতি অন্যদের প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে যেতে পারে। আবার কেউ কেউ দুর্ভাগ্যজনকভাবে হারিয়ে যায়। কিন্তু এমন কয়েকজন খেলোয়াড় ছিলেন যারা নিজেদের এক ভুল সিদ্ধান্তে আত্মহুতি দিয়েছেন। মিসরের তরুণ টেনিস খেলোয়াড় করিম হোশাম এদেরই একজন।

১৯৯৪ সালে মিসরের গিজা শহরে জন্মগ্রহণ করেন হোশাম। ২০১৩ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই এটিপি সিঙ্গেলস র‍্যাঙ্কিংয়ে ৩৩৭তম অবস্থানে আসেন তিনি। সেই সময় হোশাম ছিলেন বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় তরুণ টেনিস খেলোয়াড়। ভবিষ্যতে বড় বড় তারকাদের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিয়েছিলেন টেনিস বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু করিম হোশাম সকলের প্রত্যাশাকে পেছনে ফেলে এক ঘৃণিত কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েন।

করিম হোশাম; Image Source: Getty Images

২০১৭ সালে জুনে তিউনিসিয়ার এক বিলাসবহুল হোটেলে সময় কাটাচ্ছিলেন হোশাম। ঠিক সেই সময় থেকে তার ক্যারিয়ারের রহস্যের জট খুলতে শুরু করে। টেনিসে ম্যাচ পাতানোর তদন্ত করতে করতে তার হোটেল রুম পর্যন্ত পৌঁছে যান ব্রিটিশ পুলিশের সাবেক দুই গোয়েন্দা। তারা টেনিস ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের হয়ে কাজ করছিলেন। তাদের সন্দেহ ছিল হোশাম ফিক্সিংয়ের সাথে জড়িত। পরবর্তী ছয় মাস তাদের বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসবাদে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। হোশাম স্বীকার করেন তিনি চার বছর আগে থেকেই ম্যাচ ফিক্সিং করে আসছেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর।

যেভাবে জড়িয়ে পড়েন অন্ধকার জগতের সাথে

২০১৩ সালে মিসরের শার্ম আল শেখ শহরে টুর্নামেন্টের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক টেনিস ফেডারেশন (আইটিএফ)। ধারে-ভারে এই টুর্নামেন্ট উইম্বলডন কিংবা ফ্রেঞ্চ ওপেনের কাছে একেবারেই নস্যি। খেলা হতো শহরের এক শপিংমলের পাশে ছোট এক মাঠে। পুরো টুর্নামেন্টের প্রাইজমানিও ছিল অনেক কম। মাত্র ১৫ হাজার ডলার। এর চারগুণ প্রাইজমানি উইম্বলডনের প্রথম রাউন্ডে বিদায় নেওয়া খেলোয়াড়রা পান। করিম হোশাম আগেও এই টুর্নামেন্ট চারবার জিতেছিলেন। সেবারও তিনিই ছিলেন হট ফেবারিট।

ছোট টুর্নামেন্টের পাশাপাশি হোশাম অ্যাসোসিয়েশন অব টেনিস প্রোফেশনাল (এটিপি) এর টুর্নামেন্টও খেলেছেন। অল্প বয়সেই তিনি অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও ফ্রেঞ্চ ওপেনে বড় বড় তারকার সাথে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু শার্ম আল শেখের আইটিএফ টুর্নামেন্ট বিশ্বের অন্যান্য ছোট টুর্নামেন্টের মতোই। এখানে সাধারণত র‍্যাঙ্কিংয়ের নিচের দিকের খেলোয়াড়রা খেলে থাকেন।

জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে করিম হোশাম; Image Source: Alamy

এই টুর্নামেন্টে নামার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ই হোশামকে ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব দিয়ে বসে তার এক অপরিচিত টেনিস খেলোয়াড়। এই ব্যক্তি এক মাস আগেও তাকে ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। হোশাম তখন কাতার ওপেন খেলছিলেন। কাতার ওপেনে বিশ্বের অন্যতম সেরা টেনিস খেলোয়াড় রিচার্ড গ্যাসকুয়েটের মুখোমুখি হন হোশাম। তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয় এই ম্যাচের প্রথম সেট হারলেই তাকে ১ হাজার ডলার দেওয়া হবে। জবাবে তিনি বলেন,

আমি গ্যাসকুয়েটের বিপক্ষে খেলতে নামছি। ম্যাচ বিক্রি করার জন্য নয়।

মর্যাদার দিক থেকে শার্ম আল শেখের চেয়ে অনেক এগিয়ে কাতার ওপেন। কিন্তু শার্মে যদি হোশাম জেতেন অথবা হারেন তাতে কিছুই আসে যায় না তার। এ কারণে এবার তিনি ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাবে সাড়া দেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে হোশাম বলেন,

আমি শুধুমাত্র একবার করে (ফিক্সিং) দেখতে চেয়েছিলাম। কারণ এর আগে আমি এটা কখনোই করিনি। আমি ভেবেছিলাম এই লোকটা আমার সাথে মিথ্যা বলছে। আমি আসলে জানতামই না সত্যিকার অর্থে ফিক্সিং আছে।

বাজিকরের কথামতো হোশাম ম্যাচটি হেরে যান। এবং সেই ব্যক্তির সাথে দেখা করে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের স্থানীয় এক শাখা থেকে টাকা নিয়ে আসেন। সেই বাজিকর হয়তো এক হাজার ডলারের বিনিময়ে কয়েক গুণ অর্থ আয় করেছে। কিন্তু হোশাম আদতে সামান্য কিছু টাকার জন্য তার ক্যারিয়ারকেই বিক্রি করে দেয়। কিন্তু তিনি সেটা তখনো অনুধাবন করতে পারেননি। অন্যান্য ক্রীড়া সংস্থার চেয়ে টেনিসের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো খুবই কঠোর। একটি মাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে তারা যেকোনো খেলোয়াড়কে আজীবন নিষিদ্ধ পর্যন্ত করে থাকে।

রিচার্ড গ্যাসকুয়েট; Image Source: Getty Images

এই বিষয়টি হোশাম তার বাবার কাছে বলেন। তার বাবা তার প্রতি ক্ষুব্ধ হন। কারণ তিনি জানতেন হোশাম তার ক্যারিয়ারকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর হোশাম ফিক্সিং থেকে দূরে সরে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। তিনি ভাবলেন যদি আরো অর্থ আসে তাহলে ক্যারিয়ারকে আরো সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারবেন। কেননা বড় বড় টুর্নামেন্টে খেলার জন্য এবং তার প্রস্তুতির জন্য বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন ছিল।

ফলে হোশাম আবারো ম্যাচ পাতানো শুরু করেন। টানা চার বছর নিজে সরাসরি ম্যাচ পাতান। নিজে খেলোয়াড় হিসেবে তিউনিসিয়া, মিসর ও নাইজেরিয়াতে ম্যাচ পাতানোর মাধ্যমে বড় জোর ২০০ থেকে ১০০০ ডলার আয় করতেন। এরপর তিনি জুয়াড়ি ও খেলোয়াড়দের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেন। কখনো তিনি সেট, আবার কখনো তিনি পুরো ম্যাচ নিয়ে ফিক্সিং করতেন। সবকিছু নির্ভর করতো জুয়াড়িরা কী চাচ্ছেন।

করিম হোশাম; Image Source: Getty Images

হোশাম ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তার পরিচিত বিভিন্ন তরুণ খেলোয়াড়কে ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব দিতেন। কখনো তাদের ২৫০০ ডলার, আবার কখনো তাদের ৩০০০ ডলার প্রস্তাব করতেন। এবং বিভিন্নভাবে ম্যাচ পাতানো শুরু করেন। উত্তর আফ্রিকার টেনিস খেলোয়াড়দের মধ্যে বড় একটি অংশ ফিক্সিংয়ের সাথে জড়িত। তবে অনেকে আছেন যারা ফিক্সিং করেন না। কিন্তু তারা যদি এ বিষয়ে কোনো কিছু জেনেও থাকেন, তবু প্রকাশ করার সাহস পান না।

২০১৭ সালের জুনে টেনিসের দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষের হাতে হোশাম ধরা পড়েন। তদন্তকারীরা প্রথমেই তার কাছে জানতে চান কীভাবে তিনি এর সাথে জড়িয়ে পড়লেন। তখন তিনি তার আর্থিক দৈন্যতাকে দায়ী করেন। হোশাম ভেবেছিলেন তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সত্য বললে হয়তো শাস্তি কম পাবেন। এ জন্য তিনি সব সত্যি বলে দেন। কিন্তু এতে তার কোনো ফায়দা হয়নি। তিনি আজীবন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পুরোপুরি ব্যর্থ হন। তখন তিনি বলেন,

আমি অনেক তথ্য দিয়েছি। আমি কোনো মিথ্যা বলিনি। কিন্তু এরপরও আজীবন নিষেধাজ্ঞা পেয়েছি। আমি ১৭ বছর ধরে টেনিস খেলেছি, এসব পরিস্থিতি কারণে বাধ্য হয়ে করেছি।

২০১৮ সালের জুলাই থেকে করিম হোশামের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। তাকে আর কখনো টেনিস কোর্টে দেখা যাবে না। তবে ম্যাচ ফিক্সিং এখনো তিনি ছাড়েননি। টেনিস ইন্টিগ্রিটি ইউনিট গত দুই বছরে ম্যাচ পাতানোর জন্য ৪৪ জনকে শাস্তি দিয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জনকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। করিম হোশাম বর্তমান ও আগামীর হাজারো তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য বড় এক উদাহরণ। অর্থের লোভ একজন ক্রীড়াবিদকে নন্দিত থেকে নিন্দিত করে তোলে মুহূর্তেই।

Featured Image Source: Getty Images

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *