ক্রীড়াঙ্গনে ইতিহাস সৃষ্টিকারী নারীদের গল্প

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল বা নারী ফুটবল দলের যাত্রা খুব বেশি দিনের নয়। আমাদের দেশে একসময় খেলাধুলা তো দূরে থাক, অফিস আদালতের কাজেও নারীদের উপস্থিতি মেনে নেয়নি পুরুষ সমাজ। সময় বদলেছে। এখন প্রায় সবক্ষেত্রেই নারীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে ক্রীড়াক্ষেত্রও অন্যতম।

আমাদের দেশের মতোই পরিস্থিতি ছিল পাশ্চাত্যে। সেখানেও পুরুষদের অনেক পরে নারীরা বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করেছেন। আর এজন্য তাদেরকে ভাঙতে হয়েছে সমাজের বহুল প্রচলিত রীতিনীতি। আজকের আলোচনায় তুলে ধরবো এমন কয়েকজন নারী খেলোয়াড়ের নাম, যারা বদলে দিয়েছেন ক্রীড়া জগতের ইতিহাস। পাশাপাশি তুলে ধরবো নারীদের হাত ধরে শুরু হওয়া বিভিন্ন ক্লাব।

ম্যাজ সায়ার্স

ম্যাজ সায়ার্স বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে ১৯০২ সালে আইস স্কেটিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেখানে তিনি দুইজন পুরুষ প্রতিযোগীকে হারিয়ে রৌপ্য পদক জেতেন।

ম্যাজ সায়ার্স; Image Source: realclearsport.com

সায়ার্সের এই সাফল্য আইস স্কেটিংয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নারীদের জন্য আলাদা ইভেন্ট চালু করতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে তিনি ব্রিটেনের হয়ে ১৯০৮ সালে অলিম্পিকে নারীদের আইস স্কেটিংয়ে স্বর্ণ পদক জেতেন।

ডিক কের লেডিস এফসি

১৯১৭ সালে ইংল্যান্ডের একটি যুদ্ধোপকরণ তৈরির কারখানার কিছু সংখ্যক নারী শ্রমিকরা এই ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ফুটবল খেলে যুদ্ধাহত সৈনিকদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা। প্রিস্টল ভিত্তিক এই নারী ফুটবল দল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রচুর খ্যাতি অর্জন করে।

ডিক কের লেডিস এফসি; Image Source: shanklyhotel.com

ডিক কের লেডিস এফসি বর্তমানে ইপিএল খেলা এভারটনের মাঠ গুডিসন পার্কে ৫৩,০০০ দর্শকের সামনে ফুটবল ম্যাচ খেলে। পাশাপাশি তাদের হাত ধরেই আন্তর্জাতিক নারী ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়। ফ্রান্সের নারী ফুটবল একাদশের বিপক্ষে তারা একটি ম্যাচ খেলে। ১৯২১ সালে ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) নারী ফুটবলকে নিষিদ্ধ করে। তবে ডিক কের লেডিস এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থেকে বিশ্বব্যাপী ফুটবল ম্যাচ খেলে। তারা টানা দুই শতাধিক ম্যাচে অপরাজিত থেকে রেকর্ড গড়ে।

গারট্রুড এডার্লে

১৯২৬ সালে বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন গারট্রুড এডার্লে। মাত্র ২০ বছর বয়সে রেকর্ড গড়ে ১৪ ঘন্টা ৩০ মিনিটে এই কীর্তি গড়েন। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার জন্য পুরুষ সাতারুদের চেয়ে দুই ঘন্টা সময় কম নেন গারট্রুড। সাতারের কিছু কঠিন কসরত তার প্রশিক্ষক করতে ব্যর্থ হলেও তিনি অনায়াসে সেসব করতে পারতেন।

ফ্যানি ব্লাঙ্কারস কোয়েন

১৯৪৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে অসামান্য এক ইতিহাস রচনা করে ডাচ স্প্রিন্টার ফ্যানি ব্লাঙ্কারস কোয়েন। ৩০ বছর বয়সে এবং দুই সন্তানের মা হওয়া সত্ত্বেও তিনি এক অলিম্পিকে চারটি স্বর্ণ পদক জয়ের রেকর্ড গড়েন। তিনি তার ক্যারিয়ারে সর্বমোট ২০টি রেকর্ডের মালিক ছিলেন।

আলথিয়া গিবসন

প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে টেনিসের গ্র্যান্ডস্লাম জয়ের রেকর্ড গড়েন আলথিয়া গিবসন। ১৯৫৬ সালে তিনি সর্বপ্রথম ফ্রেঞ্চ ওপেন জেতেন। এরপর একই বছর তিনি উইম্বলডনের শিরোপা জেতেন। পরের বছর তিনি ইউএস ওপেনও জয় করেন।

টেনিস ছাড়া তিনি গলফেও বেশ পারদর্শী ছিলেন। ষাটের দশকে তিনি প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান হিসেবে পেশাদার গলফ টুর্নামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

ক্যাথরিন সুইটজার

১৯৬৭ সালে বোস্টনে প্রথম নারী হিসেবে ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করেন ক্যাথরিন সুইটজার। তখনকার সময়ে ম্যারাথন নারীদের খেলা নয় বলে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সুইটজার সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেন।

পুরুষদের সাথে ম্যারাথনে লড়ছেন ক্যাথরিন সুইটজার; Image Source: Getty Images

প্রথমে তিনি নিজের পরিচয় গোপন করে ম্যারাথনের জন্য রেজিস্টার করেন। কিন্তু প্রতিযোগিতার দিন তিনি যখন নাম্বার কার্ড তুলতে যান, তখন প্রথমে তাকে কার্ড দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর সুইটজারের কাছে থেকে একজন রেস অফিসিয়াল কার্ডটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তার প্রেমিক তার পাশে দাঁড়ান। এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ম্যারাথন শেষ করে অসামান্য এক কীর্তি গড়েন।

বেরিল বার্টন

সাইক্লিস্ট বেরিল বার্টন তার ক্যারিয়ারে সর্বমোট ৯০টি ঘরেয়া চ্যাম্পিয়নসশিপ জেতেন। পাশাপাশি তিনি ৭বার ওয়ার্ল্ড টাইটেলও জেতেন। তার অনেক অর্জনের মধ্যে ১৯৬৭ সালে নারী ও পুরুষ সাইক্লিস্টদের ১২ ঘন্টার ট্রায়াল রেকর্ড ভাঙেন।

বিলি জিন কিং

বিলি জিন কিংকে টেনিস ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি তার ক্যারিয়ারে সিঙ্গেল ও ডাবল মিলিয়ে মোট ৩৯টি গ্র্যান্ডস্লাম জিতেছেন। এই আমেরিকান নারী টেনিস তারকা ওমেন’স টেনিস অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন।

বিলি জিন কিং; Image Source: BBC

বিলি জিন কিং সবসময় নারী অধিকার নিশ্চিত এবং লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণের পক্ষে কথা বলেছেন। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি পুরুষদের সমান প্রাইজ মানি দাবি করেন। এবং তিনি ‘ব্যাটল অব দ্য সেক্সেস’ নামক এক ম্যাচে ববি রিগসকে পরাজিত করে ব্যাপক আলোচিত হন।

জুনকো তাবেই

জাপানের নারী পর্বতারোহী জুনকো তাবেই ১৯৭৫ সালে ৩৫ বছর বয়সে বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন। তখন তিনি দুই সন্তানের মা। এরপর তিনি আরো একটি রেকর্ড সৃষ্টি করেন। বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে তাবেই প্রথম নারী হিসেবে সাত মহাদেশের সর্বোচ্চ উচু পাহাড়গুলো জয় করেন।

ব্যারোনেস গ্রে থম্পসন

ওয়েলসে জন্মগ্রহণ করা গ্রে থম্পসন হুইল চেয়ারে বসেই ১৬টি প্যারা অলিম্পিক পদক জিতেছেন। এর মধ্যে ১১টি পদকই ছিল স্বর্ণ। তিনি ছয়বার লন্ডন ম্যারাথন জিতেছে। এবং পুরো ক্যারিয়ারে সর্বমোট ৩০টি রেকর্ড গড়েছেন। বর্তমানে তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের অধিকার ও খেলাধুলা নিয়ে বিভিন্ন সেমিনারে কথা বলেন।

ক্যারিনা ভোট

২০১৪ সালে শীতকালীন অলিম্পিকে প্রথমবারের মতো স্কি জাম্পিংয়ে স্বর্ণ পদক জেতেন ক্যারিনা ভোট। শীলকালীন অলিম্পিকে স্কি জাম্পিং ইভেন্ট চালুর ৯০ বছর পর প্রথম নারী হিসেবে তিনি এই পদক জেতেন।

স্টেফানি ফ্র্যাপার্ট

২০১৯ সালের শুরুতে স্টেফানি ফ্র্যাপার্ট প্রথম নারী হিসেবে প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ ওয়ানের ম্যাচে রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। তার আগে ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে আর কোনো নারী রেফারিং করেননি। এর আগে ২০১৪ সালে তিনি লিগ টু এর ম্যাচ পরিচালনা করেন।

নিকোলা অ্যাডামস

২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে প্রথম নারী হিসেবে অলিম্পিকের বক্সিং ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন হন। একই বছর তিনি ব্রিটেনে সবচেয়ে প্রভাবশালী নারীর খেতাব পান। ২০১৬ সালে তিনি ওয়ার্ল্ড, ইউরোপিয়ান এবং অলিম্পিক পর্যায়ে লাইট ওয়েট ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হন। পরের বছরে তিনি পেশাদার বক্সিংয়ে নাম লেখান এবং অভিষেক ম্যাচেই জয় পান।

Featured Image Source: BBC

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *