ভার্জিল ভ্যান ডিক: হোটেল কর্মী থেকে ইপিএলের সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠার গল্প

ভার্জিল ভ্যান ডিক; ফুটবল বিশ্বে এক পরিচিত মুখ। ইয়ুর্গেন ক্লপের হাত ধরে বদলে যাওয়া লিভারপুলের অন্যতম নায়ক এই ডাচ ফুটবলার। ক্লপ যদি তার কোচিং ক্যারিয়ারে দুইজন সেরা খেলোয়াড় আবিষ্কার করে থাকেন তার একজন ভার্জিল ভ্যান ডিক, আর অপরজন মোহাম্মদ সালাহ। অলরেডদের আক্রমণভাগে সালাহ যেমন দুর্দান্ত, রক্ষণভাগে ঠিক তেমনই অনবদ্য ভ্যান ডিক। এই ডাচ সেন্টারব্যাককে বলা হয় বর্তমান ফুটবল বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডার। কিন্তু তার এই সেরা হওয়ার পেছনে রয়েছে এক যুদ্ধ জয়ের গল্প। নেদারল্যান্ডের ছোট্ট শহর থেকে উঠে আসা ভ্যান ডিককে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাব লিভারপুলে জায়গা করে নিতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

ভার্জিল ভ্যান ডিক; Image Source: bleacherreport.com

ভ্যান ডিক শৈশবে নেদারল্যান্ডের উইলেম টু ক্লাবের যুবদলের হয়ে খেলতেন। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসার কারণে তিনি ফুটবল খেলার পাশাপাশি স্থানীয় এক হোটেলে থালা-বাসন ধোঁয়ার কাজ করতেন। উইলেম টুতে রাইট ব্যাক হিসেবে খেলতেন। কিন্তু এই পজিশনে তিনি সুবিধা করতে পারেননি। ফলে ২০০৮ সাল থেকে পজিশন পরিবর্তন করে সেন্টার ব্যাক হিসেবে খেলতে শুরু করেন। তখন ভ্যান ডিকের বয়স ১৭ বছর। কিন্তু বয়সের তুলনায় তার উচ্চতা অনেক কম ছিল। ফলে উইলেমের মূল দলের কোচ তাকে দলে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেননি। এমনকি ভ্যান ডিককে কোনো চুক্তির প্রস্তাবও দেয়নি ডাচ ক্লাবটি। কিন্তু সেই ভ্যান ডিক আজ ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এক বিশালদেহী খেলোয়াড়। এবং তিনি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে দামি ডিফেন্ডার। চলতি মৌসুমে তার দল ইপিএলের শিরোপা জিতলে তিনিই হতে পারেন লিগের সেরা খেলোয়াড়।

গ্রোনিনগেনের জার্সিতে ভার্জিল ভ্যান ডিক; Image Source: Getty Images

২০১০ সালে ভ্যান ডিক যখন উইলেমের হয়ে খেলতেন তখন নেদারল্যান্ডের সাবেক খেলোয়াড় এরউইন কোম্যানের নজরে আসেন। কোম্যান তখন ডাচ ক্লাব গ্রোনিনগেনের হয়ে কাজ করতেন। উইলেমের সাথে ভ্যান ডিকের কোনো চুক্তি না থাকায় ২০১০ সালেই তিনি ফ্রি ট্রান্সফারে গ্রোনিনগেনে যোগ দেন। কিন্তু এখানেও মূল দলে জায়গা করে নিতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়। কারণ গ্রোনিনগেনের কোচিং স্টাফদের ধারণা ছিল ভ্যান ডিক তার পূর্বের ক্লাব একাডেমিতে অতিরিক্ত খেলার কারণে বেশ ক্লান্ত ছিলেন। এ কারণে তাকে দীর্ঘদিন বিশ্রামে রাখা হয়। অবশেষে ২০১১ সালের ১ মে আডো ডেন ভাগের বিপক্ষে ভ্যান ডিকের অভিষেক হয়। ম্যাচের ৭২ মিনিটে পিটার অ্যান্ডারসনের পরিবর্তন হিসেবে প্রথমবারের মতো পেশাদার ফুটবল খেলার সুযোগ পান। এরপর একই মাসের ২৯ তারিখে একই দলের বিপক্ষে প্রথম একাদশের হয়ে মাঠে নামেন। ইউরোপা লিগের সেই ম্যাচে ভ্যান ডিক জোড়া গোল করেন করেন এবং তার দল ৫-১ গোলের বড় জয় পায়।

২.

পেশাদার ফুটবলে থিতু হওয়ার আগেই ভ্যান ডিকের জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। মাত্র ২০ বছর বয়সেই পেরিটোনাইটিস ও কিডনির সংক্রমণের কারণে তিনি প্রায় মরতে বসেছিলেন। এমনকি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ভ্যান ডিক নিজের অর্থ সম্পদ তার মায়ের নামের উইলও করে দেন। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন,

আমি হাসপাতালের বিছানায় কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত মনে করতে পারি। আমার শরীর পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। আমি কিছুই করতে পারছিলাম না। জীবনে প্রথমবার ফুটবল আমার কাছে গুরুত্বহীন মনে হয়েছিল। আমি কিছু কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছিলাম। সেটা ছিল সংক্ষিপ্ত দানপত্র, যাতে আমার কিছু সম্পদ আমার মা পান। আমার সবসময়ই মনে হয়েছে আমি আর বাঁচবো না। এবং সেই মুহূর্তগুলো খুবই কষ্টের ছিল।

কিন্তু কিছু দিন পরেই ভ্যান ডিকের মনের সকল দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায় এবং তিনি সুস্থ হয়ে আবারো মাঠে ফেরেন। গ্রোনিনগেনে ভ্যান ডিক নিজেকে পুরোপুরি সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে গড়ে তোলেন। গ্রোনিনগেনেন কোচ রবার্ট মাসকান্ত এই ডাচ ডিফেন্ডারের অসাধারণ একটি গুণ আবিষ্কার করেন। ভ্যান ডিক সমালোচকদের কথাগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নেন এবং খুব দ্রুত নিজের ভুলগুলো কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করেন। আর এর মাধ্যমেই তিনি নিজেকে অসাধারণ এক ডিফেন্ডার হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছেন।

৩.

গ্রোনিনগেনে ভ্যান ডিক নিজেকে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করেছিলেন। তবে তার জন্মই হয়েছিল ইউরোপের বড় কোনো ক্লাবে খেলার জন্য। সেই লক্ষ্যে তিনি নিজ দেশের বড় ক্লাবগুলোর কোনো একটিতে খেলার ইচ্ছাপোষণ করেন। সেজন্য তিনি ইংলিশ ক্লাব ব্রাইটন এবং রাশিয়ান ক্লাব ক্রাসনোদারের বড় অঙ্কের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। কিন্তু তাকে কেনার জন্য নেদারল্যান্ডের বড় কোনো ক্লাবই আগ্রহ প্রকাশ করেনি। পরবর্তীতে গ্রোনিনগেনের পক্ষ থেকে আয়াক্সের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর মার্ক ওভারমার্সের কাছে ভ্যান ডিককে বিক্রি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু আয়াক্স এর কিছুদিন আগেই ভ্যান ডার হর্নকে দলে কেনায় গ্রোনিনগেনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। আজ সেই ভ্যান ডার হর্ন সোয়ানসির হয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ খেলছেন। বিপরীতে ভ্যান ডিক লিভারপুলের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ মাতাচ্ছেন।

সেল্টিকের জার্সিতে ভ্যান ডিক; Image Source: express.co.uk

২০১৩ সালে মাত্র ২.৬ মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফিতে স্কটিশ ক্লাব সেল্টিকে যোগ দেন। সেখানে শুরু থেকেই নিজের সেরাটা উজাড় করে দিতে থাকেন এবং টানা দুই মৌসুম স্কটিশ ঘরোয়া লিগের শিরোপক জয় করেন। কিন্তু এরপরও তাকে ব্রাজিল বিশ্বকাপের জন্য দলে জায়গা দেননি লুইস ভ্যান গাল। ভ্যান ডিকের পরিবর্তে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা করে নেন টেরেন্স কঙ্গোলো এবং ব্রুনো মার্টিন্স ইন্ডি। তবে এর জন্য ভ্যান ডিক কখনোই ভ্যান গালকে দোষারোপ করেননি।

৪.

এরপর ২০১৫ সালে ১৩ মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফিতে সাউদাম্পটনে যোগ দেন ভ্যান ডিক। সেল্টিকের হয়ে খেলার সময় তিনি সাউদাম্পটন কোচ রোনাল্ড কোম্যানের নজর কাড়েন। এখানে মোট দুই মৌসুম কাটান। দলগতভাবে বড় কোনো সাফল্য না পেলেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন। সে কারণেই তাকে দলে ভেড়ান লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ভ্যান ডিক রেকর্ড ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফিতে অ্যানফিল্ডে পা রাখেন। বর্তমান সময়ে তিনিই বিশ্বের সবচেয়ে দামি ডিফেন্ডার। সাধারণত ডিফেন্ডারদের দাম এত বেশি হয় না। কিন্তু ভ্যান ডিক এক বিশেষ জাতের ফুটবলার। যার মূল্য ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ডও অনেক কম।

ভ্যান ডিক; Image Source: Getty Images

তবে লিভারপুলের জার্সি গায়ে নিজের উচ্চ মূল্যের প্রতিদান দিয়ে যাচ্ছেন। অলরেডদের হয়ে তিনি অভিষেক ম্যাচেই এভারটনের বিপক্ষে গোল করেন। এরপর থেকে তিনি লিভারপুলের হয়ে যা করে যাচ্ছেন সেটা এক কথায় অতিমানবীয়। তিনি প্রায় একাই বিপক্ষ দলের দুই তিনজন ফরোয়ার্ডকে সামলাতে পারেন, তাও সেটা একবারে অত্যন্ত নিপুণতার সাথে। লিভারপুলের রক্ষণভাগে তিনি এক মহাপ্রাচীর। গত দুই মৌসুমে লিভারপুল যতটুকু সফলতা পেয়েছে তার বড় অংশের দাবিদার ভ্যান ডিক। তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।

ভার্জিল ভ্যান ডিক ফুটবলকে যতটা ভালোবাসেন, ঠিক তেমনই প্রতিদান পেয়েছেন। ফুটবলার না হতে পারলে সম্ভবত তাকে সেই হোটেলের বাসন পরিষ্কার করেই জীবন পার করতে হতো। কিন্তু ফুটবল তাকে সেই জীবন থেকে অর্থ ও খ্যাতি দুটোই দিয়েছে। নিজ দেশের ক্লাবের ব্রাত্য হয়ে থাকা এই ডিফেন্ডার চলতি বছর জিততে চলেছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।

Featured Image: Getty Images

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *