ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ট্রেবল জয়ের ইতিবৃত্ত

গত ২৬ মে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ঐতিহাসিক ট্রেবল জয়ে ২০ বছর পূর্তি হয়েছে। ১৯৯৯ সালে ইপিএলের প্রথম ও একমাত্র দল হিসেবে প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ ও চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জয়ের গৌরব অর্জন করে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ম্যানইউ। এই দিনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে একটি রিম্যাচের আয়োজন করে ম্যানইউ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফাউন্ডেশনের অর্থ সংগ্রহের জন্যও এই ম্যাচের আয়োজন করা হয়। আর এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে ওল্ড ট্রাফোর্ডে রেড ডেভিলদের ডাগআউটে আবারো দেখা যায় স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনকে।

রিম্যাচে গোলের পর ডেভিড বেকহাম; Image Source: AFP

১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে ম্যানইউর ট্রেবল জয়ের সম্ভাবনা ছিল সরল দোলকের মতো। মৌসুমের শুরুতে ফার্গুসনের শিষ্যরা ভাবতেই পারেননি ইপিএলের কোনো দলের পক্ষে ট্রেবল জয় সম্ভব। কিন্তু অসম্ভবকে বাস্তবে রূপ দেয় ম্যানইউ। রেড ডেভিলদের হয়ে তখন মাঠ মাতিয়েছে বর্তমান কোচ ওলে গানার সলশেয়ার, ডেভিড বেকহাম, রয় কিন, পিটার নেভিল, গ্যারি নেভিল, রায়ান গিগস, পল স্কোলস ও পিটার শেমিচেলের মতো তারকারা।

কাতালান জায়ান্ট বার্সেলোনার ঘরের মাঠ ন্যু ক্যাম্পে ট্রেবল জয়ের স্বপ্ন পূরণ করে ম্যানইউ। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনারেে ছয় সপ্তাহ আগেই তাদের ট্রেবল জয়ের স্বপ্ন থেমে যেতে পারতো। এফএ কাপের সেমিফাইনালে আর্সেনালের মুখোমুখি হয় রেড ডেভিলরা। রয় কিনকে রেফারি লাল কার্ড দেখানোয় সেই ম্যাচে ১০ জনের দল নিয়েই লড়াই চালাতে হয় ফার্গুসনকে। এর মধ্যেই ভিলা পার্কে যোগ করা সময়ে মুহূর্তে পেনাল্টি পায় গানাররা। ম্যাচের ফলাফল তখন ১-১। রেড ডেভিলরা তখন এফএ কাপ থেকে বাদ পড়ার শঙ্কায়। স্পটকিক নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হন ডেনিশ বার্গক্যাম্প। আর্সেনালের হয়ে নেওয়া আগের ছয়টি পেনাল্টির সবগুলো থেকেই গোল করার রেকর্ড ছিল বার্গক্যাম্পের।

বার্গক্যাম্পের পেনাল্টি আটকে দিচ্ছেন স্মাইকেল; Image Source: sport.net

সেই সময় ইউনাইটেডের একমাত্র ভরসা ছিল পিটার স্মাইকেল। কিন্তু ম্যাচের আগে তার পেনাল্টি ঠেকানোর জন্য বিশেষ কোনো প্রস্তুতি ছিলনা। বার্গক্যাম্পের নেওয়া শটটি আটকানোর জন্য তিনি অনুমান করে বাম দিকে ঝাপিয়ে পড়েন। কিন্তু তার এই অনুমান পুরোপুরি সঠিক ছিল। স্মাইকেল দলকে বিপদের হাত থেকে রক্ষার করার পরই জ্বলে উঠেন রায়ান গিগস। এফ এ কাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল করে তিনি ম্যানইউকে ফাইনালে নিয়ে যান।

এফ এক কাপের সেমিফাইনাল অতিরিক্ত সময়ে জয়ের পর রেড ডেভিলরা ইতিহাস রচনার দিকে মনোযোগী হয়। কিন্তু এর জন্য তাদের আরো ১০টি ম্যাচ খেলা বাকি ছিল। এর মধ্যে কোনো একটি ম্যাচে হারলেই স্বপ্ন ভঙ্গ হবে। এমন সমীকরণে লিগে টানা তিন ম্যাচে জয় তুলে নেয়। কিন্তু চতুর্থ ম্যাচে লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে ড্র করে বসে রয় কিনরা। তবে এই ড্রয়ের আগে ম্যানইউ বড় এক সাফল্য পায়।

লিডসের বিপক্ষে মাঠে নামার আগেই রেড ডেভিলরা চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগ খেলার জন্য তুরিনে পাড়ি জমায়। জুভেন্টাসের সাথে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ১-১ গোলে ড্র করায় দ্বিতীয় লেগে পিছিয়ে ছিল ম্যানইউ। দ্বিতীয় লেগের শুরুতেই দুই গোলে এগিয়ে যায় তুরিনের ওল্ড লেডিরা। কিন্তু ম্যাচে তখনো রয় কিনের জাদু দেখানো বাকি ছিল। ২৪ মিনিটের তার হেডে এক গোল পরিশোধ করে সফরকারীরা। ১০ মিনিট পর আরেক গোল পরিশোধ করেন ডোয়াইট ইয়র্ক। আর ম্যাচে শেষ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় গোলটি করেন অ্যান্ডি কোল। এই ম্যাচে রয় কিন চোট নিয়েও মাঠ ছাড়েননি। ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি যুদ্ধাহত সৈনিকের মতো লড়াই করেছেন।

জুভেন্টাসকে হারানোর পর ম্যানইউর খেলোয়াড়দের উল্লাস; Image Source: Getty Images

১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে এখনকার মতো ইউরোপিয়ান ফুটবলে বিপুল অর্থের ছড়াছড়ি ছিল না। ইউনাইটেডে তখন একজন মাত্র ফিজিও ছিল। ছিল না কোনো কন্ডিশনিং ও ফিটনেস কোচ। জিমি কারেন খেলোয়াড়দের শরীর ম্যাসাজ করে দিতেন। সেই সাথে টিমবাসও চালাতেন জিমি। রেড ডেভিলদের ড্রেসিং রুমও ছিল খুব সাদাসিধা।

লিগ শিরোপা দিয়ে ফার্গুসন তার ট্রেবল জয়ের যাত্রা করেন। লিগের শেষ দিনে ঘরের মাঠে টটেনহামকে ২-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তোলে রয় কিন-সলশেয়াররা। তাদের চেয়ে এক পয়েন্ট কম নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে লিগ শেষ করে আর্সেনাল। কিন্তু লিগ সাফল্য উদযাপন করতে গিয়ে বাগড়া বাঁধান রয় কিন। ম্যানচেস্টারের এক বারে গিয়ে মারামারি করে পুলিশের হাতে আটক হন। পরের দিন সকালে ফার্গুসন তাকে মুক্ত করলেও তার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এফএ। ফলে তিনি চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে দর্শক বনে যান।

প্রিমিয়ার লিগে শিরোপা জয়ের পর টেডি শার্নিংহাম এবং ওলে গানার সলশেয়ার; Image Source: manchestereveningnews.co.uk

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রত্যেক খেলোয়াড় দলকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। দলের সাফল্যের জন্য কেউ কেউ নিজের ক্যারিয়ারকেও হুমকির মুখে ফেলতে কুণ্ঠা বোধ করেননি। ১৯৯৯ সালের ২২ মে এফএ কাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়। নিউক্যাসেলের বিপক্ষে ম্যাচের আগে দলের ফিজিও ডেভ ফ্যাব্রের সাথে কথা হয় দলের ডিফেন্ডার ইয়াপ স্ট্যামের। স্ট্যাম তখন হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে ভুগছিলেন। এরপরও তিনি ফাইনালে মাঠে নামার জন্য মরিয়া ছিলেন। কিন্তু তার রিপোর্টগুলো দেখে স্ট্যামকে না করে দেন ফ্যাব্রে। তখন রেড ডেভিল ডিফেন্ডার অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। ফাইনালে অবশ্য স্ট্যাম মাঠে নামেন। তবে মাত্র ১২ মিনিটের জন্য। তার মাঠে নামার আগেই শার্নিংহাম ও স্কোলসের গোলে মৌসুমের দ্বিতীয় শিরোপা নিশ্চিত করে ম্যানইউ।

এফএ কাপ জয়ের পর ফার্গুসন খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলা নিয়ে পুরোপুরি সজাগ ছিলেন। তিনি দলের খেলোয়াড়দের শিরোপা উদযাপন নিষিদ্ধ করেন। পাশাপাশি রাত ১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে সব খেলোয়াড়কে ঘুমাতে বাধ্য করেন। এফএ কাপ জয়ের পর ওল্ড ট্রাফোর্ডে না গিয়ে বার্কশায়ারে বিশাম অ্যাবে ন্যাশনাল স্পোর্টস সেন্টারে ক্যাম্প করে ম্যানইউ। সেখানে একজন পুষ্টিবিদ ও বাবুর্চিকে সাথে করে নিয়ে যান ফার্গুসন। পুরো মৌসুমে খেলোয়াড়দের শারীরিক ধকল কাটিয়ে উঠার জন্য পুষ্টিবিদের শরণাপন্ন হন তিনি। পাশাপাশি সেখানে বায়ার্ন মিউনিখের খেলা ম্যাচগুলোর ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করতে থাকেন। এরপর তিনি দলবল নিয়ে বার্সেলোনার উদ্দেশ্যে রওনা হন।

চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর ম্যানইউ; Image Source: Getty Images

ন্যু ক্যাম্পে ম্যাচের ছয় মিনিটের মাথায় এগিয়ে যায় বায়ার্ন। জার্মান জায়ান্টদের হয়ে গোল করেন মারিও বাসলার। পুরো নব্বই মিনিটে এই এক গোল পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় ম্যানইউর তারকারা। তবে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল বায়ার্ন। কিন্তু স্মাইকেল ও ভাগ্যের কাছে হার মানতে হয় তাদের। বায়ার্নের দুইটি শট বারে লেগে ফিরে আসে। আরো বেশ কিছু আক্রমণ আটকে যায় স্মাইকেলের গ্লাভসে।

ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষে অতিরিক্ত তিন মিনিট যোগ করা হয়। প্রথম মিনিটেই ডেভিড বেকহামের নেওয়া কর্নার কিক থেকে গোল করেন টেডি শার্নিংহাম। ৯৩ মিনিটে বেকহাম আবারো কর্নার কিক নেন। এবার ইতিহাস সৃষ্টিকারী গোলটি করেন সলশেয়ার। পুরো ম্যাচে দারুণ খেলা অলিভার কান ও বায়ার্নকে মেনে নিতে হয় ভাগ্যের নির্মম পরিহাস।

দেশে ফেরার পর ম্যানইউকে ভক্তদের নজিরবিহীন সম্মাননা; Image Source: Getty Images

অপরদিকে ম্যানচেস্টারে তখন উৎসবের আমেজ। রেড ডেভিলদের টিম বাস ডিনসগেট থেকে ওল্ড ট্রাফোর্ডে পৌছায় দীর্ঘ তিন ঘন্টা পর। যে রাস্তা মাত্র ১০ মিনিটের। প্রধান সড়ক তখন লালে লাল। ফার্গুসন তার শিষ্যদের নিয়ে মাথা উচু করে ওল্ড ট্রাফোর্ডে প্রবেশ করেন। ম্যানইউ তাদের ক্লাব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ গল্পের রচনা করে মাত্র ছয় সপ্তাহে। এই ছয় সপ্তাহের মধ্যে তারা তিনটি শিরোপা ঘরে তোলে। যা আজো করতে পারেনি ইপিএলের অন্য কোনো দল।

Featured Image Source: Getty Images

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *