মাঝমাঠের এক শিল্পী : জাভি হার্নান্দেজ

‘আমার কাছে যা মনে হয়, জাভি ব্যালন ডি অর দাবি করতে পারে, সে সেরা এই কারণে না বরং তার কঠোর পরিশ্রম বাকিদের সাফল্যের কারণ হয়ে উঠে’ – ইয়োহান ক্রুয়েফ

ইউরো ফাইনালে জাভি হার্নান্দেজ; Image source – gettyimages

সম্প্রতি নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের সব হিসেব নিকেশ মিটিয়ে বুট তুলে রেখেছেন সময়ের সেরা মিডফিল্ডার জাভি হার্নান্দেজ। বার্সেলোনার ঘরের ছেলে জাভি ক্যারিয়ার শেষ করেছেন দূর পরবাসে। কাতারের আল-সাদ ক্লাবে খেলোয়াড়ি জীবন শেষে আবার সেখানেই ডাগআউটে দাঁড়াবেন সামনের মৌসুম থেকে। আর জাভির ক্যারিয়ার শেষ হবার মাধ্যমে বলতে গেলে ফুটবলেই একটা অধ্যায়ের শেষ একেবারেই আসন্ন। জিদান, বেকহাম, ফিগো, পিরলো, জেরার্ড, ল্যাম্পার্ড, জাভি কিংবা ইনিয়েস্তা, নব্বইয়ের দশকের গোঁড়া থেকে ইউরোপের নামী সব দলের মিডফিল্ড কাঁপানো প্রজন্মের শেষ সদস্য হয়ে রয়ে গেলেন কেবলই আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা।

জাভি হার্নান্দেজ : লা মাসিয়া থেকে বার্সার কান্ডারি

জন্ম ২৫ জানুয়ারি ১৯৮০ সালে। মাত্র ১২ বছর বয়সে নিজ শহরের ক্লাব বার্সেলোনার যুব একাডেমী ‘লা মাসিয়া’ তে যোগ দেন জাভি। তখন সালটা ১৯৯২। বার্সেলোনা ছিল নিজেদের সেরা সময়ে। ইয়োহান ক্রুয়েফ দলের ডাগআউটে। কেবল মূল দলেই না, ক্রুয়েফ প্রভাব বিদ্যমান সারা বার্সায়। ‘লা মাসিয়া’ তে চলছে কিশোরদের গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা। কিশোর জাভির মাঝে তখনই ফুটবল মানে ইয়োহান ক্রুয়েফ। নিজের ফুটবল দর্শন নিয়ে জাভি বলেছিলেন,

‘আমি চাই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে, সেই সাথে শৈশব থেকেই আমরা যা ভালবাসি সেটা ধরে রেখে চলতে; সেটি পজিশন নির্ভর ফুটবল।’

কিশোর বয়সের অভিষিক্ত জাভি; Image source – pinterest

ক্রুয়েফের আদর্শে দীক্ষিত হলেও জাভির বড় বন্ধু এবং শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন আরেক বার্সা গ্রেট। নিজ সময়ে তিনিও ছিলেন সেরা এক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। নাম পেপ গার্দিওলা। মাঝমাঠে বার্সার হাল ধরতে শেখাটা ছিল গার্দিওলা থেকেই।

গার্দিওলার মত তার বিল্ড আপও একই রকম। ২০০৯ সালে দারুণ এক মৌসুম কাটাবার সময় এল পেরিওডিকো পত্রিকায় বলেছিলেন,

‘বল যার পায়ে থাকবে। ফুটবল মাঠে সেই আসল রাজা।’

কোচ গার্দিওলার সাথে; Image source – goal.com

বার্সা মূল দলে জাভির অভিষেক হয় ১৯৯৮ সালে। লুই ভ্যান হালের অধীনে শুরু হলেই নিজেকে মেলে ধরার শুরুটা ২০০৩ সালে ফ্রাংক রাইকার্ডের হাত ধরে। আর ২০০৮ সালে সাবেক সতীর্থ পেপ গার্দিওলা যখন বার্সার কোচ, জাভি তখন হয়ে উঠলেন বার্সার সবকিছুর মূল কারিগর।

দ্য জাভি ওয়ে এবং গার্দিওলার বার্সা

জাভির নিজের খেলার ধরন ছিল একেবারেই সাদামাটা

‘চিন্তা করতে হবে খুব দ্রুত, সেই সাথে খালি জায়গা খুঁজে নিতে হবে। আমি তাই করি। পুরোটা সময় জুড়ে। মাঠে সবসময় খালি জায়গা খুঁজে যাই, খালি জায়গা এবং খালি জায়গা’।

জাভির কাছে ফুটবলের মন্ত্র একটাই ছিল পুরো ক্যারিয়ারে। বল ধরে রাখা প্রয়োজন, যত বেশি পাস খেলা যায় ততটাই পাস খেলা দরকার। দ্রুত মুভমেন্ট, নিঁখুত পাসিং আর বল পজিশনে একক আধিপত্য সব মিলিয়ে জাভি ছিলেন নিজ সময়ের সেরা মিডফিল্ডার।

ন্যু ক্যাম্পে জাভি হার্নান্দেজ; Image source – pinimg

মূলত গার্দিওলা আসার পরেই জাভিকে নিয়ে প্রথমবার ব্যাপক হইচই পড়ে যায় সবার মাঝে। ২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত গার্দিওলার স্বর্ণালী যুগে জাভি ছিলেন মূল কারিগর। মাঝমাঠে জাভির নৈপুণ্য এতটাই মুগ্ধ করার মত ছিল যে ২০১০ বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টাইন কোচ ম্যারাডোনা বলেছিলেন, নিজ দলে ভেরনকে তিনি চান আর্জেন্টিনার জাভি হিসেবে।

গার্দিওলার বার্সা আগমন নিঃসন্দেহে জাভির ক্যারিয়ারে বড় এক প্রভাব। রাইকার্ড পরবর্তী সময়ে দুজন ছিলেন বার্সার রাডারে। একজন গার্দিওলা এবং অন্যজন দীর্ঘদিন বার্সার সহকারি কোচ হয়ে থাকা হোসে মরিনহো। শেষ পর্যন্ত ক্রুয়েফের ইচ্ছায় বার্সায় আসেন পেপ গার্দিওলা। গার্দিওলার কোচ হওয়া নিয়ে ‘টেক দ্য বল পাস দ্য বল’ ডকুমেন্টরিতে জাভি বলেছিলেন,

‘যখনই শুনলাম পেপ কোচ হতে যাচ্ছে আমি জানতাম এবার ভাল কিছুই হতে যাচ্ছে।’

গোলের পর ;Image source – uefa.com

পেপ গার্দিওলার ‘টেক দ্য বল, পাস দ্য বল’ মন্ত্রের মূল সাধক যেন ছিলেন জাভি হার্নান্দেজ। বেশ কিছু ম্যাচে জাভির পাসিং ছিল ১০০ ভাগ। যেখানে তাকে খেলতে হয়েছে পুরো ম্যাচ। এবং সতীর্থদের দিয়েছেন ১০০র’ও বেশি পাস। অনেকের মতেই লিওনেল মেসির উপস্থিরি জাভিকে আর বেশি আলোয় নিয়ে এসেছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না এই জাভি মেসিকে ছাড়াই স্পেনকে এনে দিয়েছেন ২০০৮ এবং ২০১২ ইউরো শিরোপা। মাঝে ছিল ২০১০ সালের বিশ্বকাপ শিরোপাও। আর জাভি বিহীন মেসি জাতীয় দলে এখন পর্যন্ত শিরোপা শূন্য।

জাভির প্রভাব; স্পেনে এবং বার্সাতে

সার্জিও বুসকেটস বল দখল নিলেন, বল গেল ইনিয়েস্তার পায়ে কিংবা অন্য কারো কাছে, সেখান থেকে মেসি এবং গোল। চিরায়ত বার্সার সবই আছে। নেই শুধু গোলের আগে ৬ নাম্বার জার্সিতে জাভি নাম লেখা একজনের চোখ জুড়ানো ১০ থেকে ১২ টি পাস। ইস্কো, এসেন্সিও, পাকো আলকাসের সবাই খেলছেন, নেই জাভির ডিফেন্স চেরা সব পাস।

২০১০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। ফুটবল সেদিন মুখোমুখি শিল্প আর মেশিনের মাঝে দাঁড়িয়ে। জার্মানি দলে তারার অভাব নেই। অভাব নেই স্পেন দলেও। কিন্তু জার্মানি সেদিন বড্ড অসহায়। জাভি খেলছেন আর খেলাচ্ছেন। একের পর এক ডিফেন্স ভাঙা পাস। মাঝ মাঠে অজিল আর বাস্তিয়ান শোয়েন্সটাইগার কেবলই ছুটছেন। সামনে অসহায় দাঁড়িয়ে মিরোস্লাভ ক্লোসা।

সেমিতে জার্মানির সাথে পুয়োলের গোলের পর; Image source – gettyimages

ম্যাচের ৭৩ মিনিটের কর্নার। জাভির কর্নার থেকে পুয়োলের হেড আর গোল। আর ফাইনালে ইনিয়েস্তার গোল।  

কিংবা তার থেকে দুই বছর পর ২০১২ ইউরোর ফাইনাল। সামনে আরেক কিংবদন্তী, ইতালির আন্দ্রেয়া পিরলো। সেদিন পিরলো দিলেন ৫৭ পাস আর জাভি খেললেন ৯৫ পাস। জর্দি আলবার গোলে তার অ্যাসিস্ট।

বিশ্বকাপ জয়ের পর; Image source – pinterest

অথবা কোন এক এল ক্লাসিকো ম্যাচ। মেসির আচমকা দৌড়। ৩ ডিফেন্ডারের মাথার উপর দিয়ে বল আলত চিপ করলেন। বুক দিয়ে বল মাটিতে নামিয়ে গোল করলেন মেসি। হয়তো আরেক ক্লাসিকোয় করলেন ব্যাক হিলের আলতো লব আর সে থেকেই ট্যাপ ইন করে গোল।

স্পেনের হয়ে ২ ইউরো আর ১ বিশ্বকাপ। বার্সা ক্যারিয়ারে জিতেছেন ৮ টি লিগ টাইটেল, ৩ টি কোপা ডেল রে, ৪ টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ৬ টি স্প্যানিশ সুপার কাপ এবং ২ টি উয়েফা সুপার কাপ। ছিলেন ২০০৮-০৯ এবং ২০১৪-১৫ সালে ট্রেবল জয়ী দলের মূল কারিগর হিসেবে। সব মিলিয়ে ক্যারিয়ার শেষের আগে সবই জিতে নিয়েছেন এল মায়েস্ত্রা জাভি হার্নান্দেজ।

ইনিয়েস্তার সাথে গড়েছিলেন অনন্য এক জুটি; Image source – pinterest

ফুটবলটা ছিল তার ভাষা। সতীর্থ ইনিয়েস্তার সাথে গড়েছিলেন অনন্য এক জুটি। ইনিয়েস্তা বলেছিলেন, নিজেদের এতটাই ভাল জানেন তারা চোখ বন্ধ থাকলেও একে অন্যকে খুঁজে নিতে সক্ষম। শুধু ইনিয়েস্তা অবশ্য না। ইংল্যান্ডে প্রিমিয়ার লীগ কাঁপানো পল স্কোলস এক সাক্ষাতে জাভিকে নিয়ে বলেছিলেন,

‘সে খেলাটা এমনভাবে খেলে যেটা খেলা উচিত। নিজের সেরা সময়ে জাভিই বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডার’।

লিওনেল মেসির সাথে জাভি; Image source – pinterest

জাভির কাছে যে পল স্কোলস নিজেও হেরেছেন দুবার। ২০০৯ আর ২০১১ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে। বুটজোড়া তুলে রাখলেও তাই জাভি স্তুতি শেষ হবার নয়। বরং বার্সা সমর্থকদের আশা হয়ত খুব শীঘ্রই আবার ন্যু ক্যাম্পে পা রাখবেন তাদের এই জাদুকর। কোচ গার্দিওলা যেমন সাবেক সতীর্থ জাভিকে নিয়ে মহাকাব্য লিখেছেন। জাভিও তেমন মহাকাব্য লিখবেন তারই সাবেক কোন সতীর্থকে নিয়ে। 

Feature Image : pinimg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *