প্রিমিয়ার লিগের কতিপয় অর্থহীন নান্দনিক পরিসংখ্যান

বর্তমান সময়ে জনপ্রিয়তার দিকদিয়ে ফুটবল শীর্ষে অবস্থান করছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুটবল আজ এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে অগণিত ক্লাব, খেলোয়াড় এবং ফুটবল পরিচালকের অবদান রয়েছে। ফুটবল যতটা আধুনিক হয়েছে তার সঙ্গে খেলোয়াড়দের নিজ নিজ অবস্থানে দায়িত্বও ততটাই বেড়ে গেছে।

হ্যারি কেন; Image Source: StandardUk

এখনকার সময়ে এসে মিডফিল্ডাররা অসংখ্য গোল করে সেরাদের তালিকায় আসতে পারেন না। ঠিক তেমনিভাবে স্ট্রাইকাররাও গোল না করে অনেকগুলো অ্যাসিস্ট করে সেরাদের কাতারে জায়গা পান না। যদি এমন হতো তবে ওলে গানার সলশেয়ার হতেন ইতিহাসের সেরা মিডফিল্ডার। কারণ তিনি তার সময়ের মিডফিল্ডারদের মধ্যে সর্বাধিক গোল করেছেন।

উদযাপনের দৃশ্য; Image Source: StandardUk

আজকে আমরা আলোচনা করবো ফুটবলারদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে। যেগুলো সাধারণ দৃষ্টিতে অনেক ভালো এবং উপভোগ্য মনে হলেও তা দলের প্রয়োজনে কিংবা ম্যাচের ফলাফল বদলে কোনোপ্রকার ভূমিকাই পালন করেনা। আর সেসব বিষয়ের পার্থক্য নিরূপণ করতে, ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স এবং সেসবের যৌক্তিকতা নিয়ে। সেজন্যই ব্যবহার করা যেতে পারে নিজের অন্তর্দৃষ্টিকে। কোনো খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সকে আমরা যদি নিজের দুচোখ ছাড়াও যুক্তি দিয়ে, অন্তর দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করি তাহলে খুব সহজভাবে বুঝে নিতে পারবো তা দলীয় সফলতার ক্ষেত্রে কতটুকু ভূমিকা পালন করেছে। চলুন দেখা যাক এমনই কিছু ব্যক্তিগত সেরা পারফরম্যান্স যা বস্তুত কোনো কাজেই লাগেনি।

অনেকগুলো সফল পাস, কিন্তু যা দিনশেষে মূল্যহীন

ইউরোপীয় ফুটবলে সর্বাধিক পাস সম্পন্ন করা ফুটবলারদের মধ্যে জর্জিনহো অন্যতম। ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত ইতালিয়ান এই মিডফিল্ডার চলতি মৌসুমের শুরুতে মাউরিসিও সারির হাত ধরে চেলসিতে পাড়ি জমান। আর চেলসিতে যোগ দিয়েই নতুন করে ইতিহাসের সাক্ষী হন এই তারকা। গত ফেব্রুয়ারি মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জর্জিনহো চলতি মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে সর্বাধিক পাস সম্পন্ন করা ফুটবলার। ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি সর্বমোট ২২৮০টি পাস সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তার এমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্স চেলসির কোনো কাজেই লাগেনি।

জর্জিনহো; Image Source: Standard

গত ফেব্রুয়ারিতে ক্যারাবাও কাপের ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে টাইব্রেকারে পরাজিত হয় চেলসি। সেই ম্যাচে সিটির পাসিং ফুটবলের বিপরীতে সারির সারিবল ট্যাকটিকসে বেশ ভালোই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দলটি। পুরো ম্যাচে কোনো গোলও হজম করেনি চেলসি। অন্যদিকে দলের খেলোয়াড়েরা খেলতে থাকেন অসাধারণ সব কাউন্টার অ্যাটার্ক। কিন্তু সেদিন মাঝমাঠের প্রাণ হিসেবে আখ্যায়িত জর্জিনহো ছিলেন একেবারেই নিষ্প্রভ। তিনি শ’খানেক পাস সম্পন্ন করলেও তা দলের প্রয়োজনে মোটেও কাজে দেয়নি।

জর্জিনহো; Image Source: Talksports

তেমনিভাবে চলতি মৌসুমে এখন অবধি সর্বোচ্চ সংখ্যক পাস সম্পন্ন করেও একটি অ্যাসিস্টের দেখা পাননি জর্জিনহো। প্রিমিয়ার লিগ এবং ইউরোপা লিগ মিলিয়ে ৩৬ ম্যাচ খেলে মাত্র ৩টি গোল করেছেন এই মিডফিল্ডার। অথচ একজন মিডফিল্ডারের কাজ শত শত পাস সম্পন্ন না করে যে কোনোভাবে অ্যাসিস্ট করা যা দলের জয়ে ভূমিকা পালন করবে। চেলসি জর্জিনহোকে ৫০ মিলিয়নে দলে ভিড়িয়েছে। বিপরীতে তিনি প্রতি ম্যাচে অগণিত পাস সম্পন্ন করে যাচ্ছেন যা দলের প্রয়োজনে কোনো ভূমিকাই পালন করছেনা।

খেলোয়াড়দের তালিকা; Image Source: BBC

প্রিমিয়ার লিগে জর্জিনহোর মতো দুই হাজারের অধিক পাস সম্পন্ন করে কোনো অ্যাসিস্ট করতে না পারা এমন আরো ৫ ফুটবলার রয়েছেন। ২০১১-১২ মৌসুমে সোয়ানসি সিটির হয়ে খেলেন লিওন ব্রিটন। পুরো মৌসুমে তিনি ২২৩১টি পাস সম্পন্ন করলেও কোনো অ্যাসিস্ট পাননি। একই পথে হেঁটেছেন মিকেল আর্তেতা এবং অরিয়ল রোমিও। মিকেল ২০১৩-১৪ মৌসুমে আর্সেনালের হয়ে ২১০৪টি পাস সম্পন্ন করেও কোনো অ্যাসিস্ট পাননি। তেমনিভাবে রোমিও সাউদাম্পটনের হয়ে ২০১৬-১৭ মৌসুমে ২০৭১টি পাস সম্পন্ন করে একটি অ্যাসিস্টও করতে পারেননি।

ম্যাচের দৃশ্য; Image Source: Standard

কিন্তু এই চার জনের থেকেও সবচেয়ে বাজে পরিসংখ্যানের মালিক বার্মিংহাম সিটির ব্যারি ফার্গুসন। তিনি টানা দুই মৌসুম দুই হাজারের অধিক পাস দিয়েও কোনো অ্যাসিস্ট পাননি। ২০০৯-১০ মৌসুমে ২১৬৮টি এবং ২০১০-১১ মৌসুমে ২১৫০টি পাস সম্পন্ন করেন ব্যারি ফার্গুসন। অতএব, সবদিকে বিবেচনা করে যদি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে লক্ষ্য করা যায় তবে দেখা যাবে, দুই হাজারের অধিক পাস সম্পন্ন করেও কোনো অ্যাসিস্ট করতে না পারা খেলোয়াড়দের পুরো পারফরম্যান্সই বৃথা। কারণ দিনশেষে ফুটবল গোলের খেলা এবং মিডফিল্ডারদের কাজ গোলের যোগান দেয়া।

অনেকগুলো শট নেয়া খারাপ নাকি ভালো?

যখন শটের কথা আসে তখন তা অবশ্যই স্ট্রাইকারদের নিয়ে আলোচনার তাগিদেই আসে। আধুনিক ফুটবলে স্ট্রাইকাররাই দলের জয়ে সর্বাধিক ভূমিকা পালন করেন। কারণ ফুটবলের জয় পরাজয় গোলের সংখ্যা দিয়েই নির্ধারণ করা হয়। আর স্ট্রাইকাররা গোল করতে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী এবং ধারাবাহিক। কিন্তু প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করলে এমন চারজন খেলোয়াড়ের নাম বেরিয়ে আসে যারা একক ম্যাচে ১০টির মতো শট নিয়েও কোনো গোল করতে পারেননি। আর তাদের এমন গোল করতে ব্যর্থ হওয়াই দলের জন্য কাল হয়ে দাড়ায়।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো; Image Source: BBC

অসংখ্য পাস সম্পন্ন করে কোনো অ্যাসিস্ট করতে না পারা যেমন মূল্যহীন, তেমনিভাবে ডজনখানেক শট নিয়েও কোনো গোল করতে না পারাও মূল্যহীন। প্রিমিয়ার লিগে এখন অবধি একক কোনো ম্যাচে সর্বোচ্চ সংখ্যক শট নিয়ে গোল না পাওয়া খেলোয়াড়দের তালিকায় সবার উপরে রয়েছেন সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তিনি ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ওয়েস্ট হামের বিপক্ষে একটি ম্যাচে সর্বমোট ১১টি শট নেন যার মধ্যে ৪টি টার্গেটে ছিলো। কিন্তু একটিও গোলে পরিণত হয়নি। পরবর্তীতে ওয়েস্ট হামের রেও সোকারের গোলে ম্যাচটি হেরে যায় ম্যানইউ।

খেলোয়াড়দের তালিকা; Image Source: BBC

২০১২ সালের জানুয়ারিতে সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে একই কীর্তি গড়েন এডেন জেকো। সেই ম্যাচে তিনি সর্বমোট ১০টি শট নেন যার মধ্যে ২টি টার্গেটে ছিলো। জেকোর এমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পরেও গোলবঞ্চিত থাকে ম্যানচেস্টার সিটি। তেমনিভাবে ২০০৬ সালের আগস্টে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ১০টি শট নিয়েও কোনো গোল পাননি থিয়েরি অঁরি। তার গোল ব্যর্থতার মহড়ায় সেদিন সিটির বিপক্ষে হেরেই বসে আর্সেনাল।

ফন পার্সি; Image Source: Independent

একইভাবে ১০টি শট নিয়ে গোল না পাওয়া চতুর্থ খেলোয়াড় রবিন ফন পার্সি। ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক এই ডাচ স্ট্রাইকার ২০১৫ সালের মে মাসে নিজেকে এমন হতাশাজনক ঘটণার সাক্ষী করেন। সেদিন ওয়েস্ট ব্রমউইচের বিপক্ষে তার নেয়া ১০টি শটের ৬টিই লক্ষ্যে ছিলো। যদিও ভাগ্য সহায় না হওয়ায় একটিও গোল হয়নি। এখান থেকে প্রমাণ হয় যে ডজনখানেক শট কখনোই ম্যাচের ফলাফল বদলে দিতে পারেনা যদি না সেগুলো গোলে পরিণত হয়।

থিয়েরে অঁরি; Image Source: Standard

কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে, তাই বলে কি স্ট্রাইকাররা শট নেয়া কমিয়ে দিবেন? আর এই প্রশ্নের সহজ উত্তর আজকের পরিপূর্ণ মেসি, রোনালদো কিংবা লেভানডফস্কি। মেসি এবং লেভানডফস্কিকে কখনোই এলোমেলো শট নিতে দেখা যায় না। অথচ মৌসুম শেষে তাদের নামের সঙ্গে ৪০ গোল থাকে। একই পথে হাঁটছেন রোনালদো নিজেও। রিয়ালে যোগ দেয়ার পর তিনিও তার অযথা শট নেয়া কমিয়েছেন।

মাঝেমধ্যে চূড়ান্ত ফলাফল নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করা যায় না

প্রিমিয়ার লিগ এখন অবধি সর্বাধিক জনপ্রিয় হওয়ার কারণ এখানকার দলগুলোর মাঝে চলমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা। শীর্ষ ৫ লিগের অন্য চারটি লিগের সবগুলোতেই দুই কিংবা তিনটি দলের প্রাধান্য দেখা যায়। অন্যদিকে ইপিএলে ম্যানচেস্টার সিটি, ইউনাইটেড, চেলসি, আর্সেনাল, টটেনহাম, লিভারপুল এবং এভারটন দলগতভাবে শক্তিশালী। কিন্তু মাঝে মাঝে এই দলগুলো ভালো খেলেও এমন কয়েকটি দলের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিতভাবে হেরেছে যা কল্পনাতীত।

ম্যাচের দৃশ্য; Image Source: Standard

কিন্তু পুরো ম্যাচে বল দখল, সর্বমোট শট কিংবা গোলের সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে ছিলো দলগুলো। ২০১৫ সালে এমনই একটি ঘটননর সাক্ষী হয় ইতিহাদ। সেবার ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনির নেতৃত্বে ওয়েস্ট হামের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে বসে ম্যানচেস্টার সিটি। তেমনিভাবে এর আগের মৌসুমে ব্রিটানিয়া স্টেডিয়ামে ম্যাচের সকল দিকদিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেও ১-২ গোলে স্টোক সিটির বিপক্ষে পরাজিত হয় দলটি।

সিটির খেলোয়াড়েরা; Image Source: Nsports

অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিবেচনা করলে এমন ম্যাচগুলোর ফলাফল যে কারো পক্ষেই মেনে নেয়া সম্ভব নয়। কোনো দল পুরো ৯০ মিনিটে ৭০% বল দখলে এগিয়ে থেকে ডজনখানেক শট নিয়েও যদি ম্যাচ হেরে বসে তবে সেখানে ভাগ্যকেই শুধুমাত্র দোষারোপ করা যায়। ২০১৫ সালে ওয়েস্ট হামের বিপক্ষে সেই ম্যাচটির পর সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই বলেন ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি। শুধু তিনি কেন?

ম্যাচের দৃশ্য; Image Source: Standard

যে কোনো ফুটবল বিশেষজ্ঞই এতে একমত হতে বাধ্য যে ফুটবল গোলের খেলা। এখানে জয় পরাজয় গোলের সংখ্যা দিয়ে হিসেব করা হয়। সেক্ষেত্রে কারা কতটুকু নান্দনিক ফুটবল উপহার দিলো তা মূখ্য বিষয় নয়। হতে পারে নান্দনিকতা কিংবা ঘোচালো ফুটবল যে কাউকে সেই দলের সমর্থক হতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু এক ডজন শট, দুই হাজার পাস কিংবা ম্যাচে ৬০% বল দখলে এগিয়ে থেকে গোল করতে না পারলে জয়লাভ করা সম্ভব না। যার কারণে ৯০ মিনিট শেষে সেসবের পুরোটাই অর্থহীন থেকে যায়।

Featured Image: Goal.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *