রাজত্ব ধরে রাখলো রোনালদোর পর্তুগাল

কেমন হতো যদি নেশন্স লিগের শিরোপা ভার্জিল ভ্যান ডাইক উঁচিয়ে ধরতেন? ইউরোর সবশেষ আসরের চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল। কাগজে কলমে ইউরোপের রাজা তারাই। নেশন্স লিগের কল্যাণে কি আপনি নেদারল্যান্ডকে ইউরোপের রাজা বলতেন? এই জটিলতায় অবশ্য আপনাকে ফেলেনি পর্তুগাল এবং গঞ্জালো গুইদেস। ইউরো ২০১৬ এর পর ইতিহাসের প্রথম উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপাও গিয়েছে পর্তুগালের শো-কেসে। রোনালদোর মুকুটে যুক্ত হলো ২য় আন্তর্জাতিক শিরোপার পালক। সেই সাথে আসন্ন ইউরো ২০২০ এর জন্যও বড় বার্তা দিয়ে রাখলো পর্তুগাল।

উয়েফা নেশন্স লিগ শিরোপা; Source : Standard.uk

ঘরের মাঠ স্তাদিও দো দ্রাগাওতে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেছিলেন রোনালদো। দেশের মাটিতে এর আগে ২০০৪ সালেই পেতে পারতেন শিরোপার স্বাদ। কিন্তু গ্রিস রূপকথায় সেবার আর হয়নি। রোনালদোর বয়স এখন ৩৪। দেশের মাটিতে কিছু করার এটাই বোধহয় ছিল সেরা সুযোগ। কিন্তু সেখানে বড় বাঁধা ছিলেন অন্য প্রান্তের দুজন। বর্তমান সময়ের সেরা দুই রক্ষণকর্মী ভার্জিল ভ্যান ডাইক এবং ম্যাথিয়াস ডি লিট। এই মৌসুমে ব্যালনের দৌড়ে দারুণ এগিয়ে ভ্যান ডাইক। আর জুভেন্টাসের রোনালদোকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে একাই আটকেছেন আয়াক্সের ডি লিট। রোনালদোর পাশে অবশ্য ছিলেন প্রিমিয়ার লিগ জয়ী ম্যানসিটির প্লেয়ার অফ দ্য সিজন বার্নাদো সিলভা। লড়াইটা তাই হতো সমানে সমানে।

উয়েফা নেশন্স লিগ কি এবং কেন

বছরজুড়ে চলতে থাকা ক্লাব সূচির মাঝে বিরতি পড়লেই ফুটবল ফেডারেশনগুলো আয়োজন করতো আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ। কিন্তু ম্যাড়ম্যাড়ে সেইসব ম্যাচ নিয়ে দর্শক আগ্রহ ছিল খুবই কম। টিভিস্বত্তও ছিল পড়তির দিকে। একারণেই উয়েফা তাদের সদস্যভুক্ত ৫৫ দেশ নিয়ে চালু করে উয়েফা নেশন্স লিগ।

উয়েফা নেশন্স লিগ লোগো; Source : Standard.uk

চার বিভাগে চারটি গ্রুপ করে শুরু হয় এই লিগ। প্রতি গ্রুপের শেষ দল থাকবে অবনমন অঞ্চলে। আর নিচের দিকের গ্রুপ সেরারা দখল করবে সেই স্থান। এ বিভাগের চার গ্রুপের শীর্ষ চার জায়গা করে নেয় লিগের সেমিফাইনালে। পর্তুগাল পায় ফাইনাল আয়োজনের দায়িত্ব। সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে নিজেদের জানান দেয় পর্তুগাল আর ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্থান নিশ্চিত করে নেদারল্যান্ড।

লড়াইয়ের মঞ্চে ছিলেন যারা

লড়াই আসলে পর্তুগাল নেদারল্যান্ডের বাইরে আরো অনেকের মাঝেই ছিল। লিভারপুলের ভ্যান ডাইক আর ওয়াইনাল্ডাম পেয়েছেন লিগ শিরোপা জেতা সিটির স্ট্রাইকার বার্নাদো সিলভাকে। রোনালদো প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন তাকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার থেকে বিদায় করা আয়াক্সের একঝাক তরুণের বিপরীতে। বার্সার নেলসন সেমেদোও হয়ত একহাত নিতে চেয়েছেন ওয়াইনাল্ডামের বিপক্ষে। যার দুই গোলে তিন গোলের লিড থেকেও লিভারপুলের কাছে ৪-০ তে হেরে আরেকবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ স্বপ্ন হাতছাড়া হলো বার্সার। তবে সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল দুই অধিনায়কের মাঝে।

দুই অধিনায়ক রোনালদো এবং ভ্যান ডাইক; Source : Standard.uk

ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে আছেন নেদারল্যান্ডের ভার্জিল ভ্যান ডাইক। জিতেছেন প্রিমিয়ার লিগের বর্ষসেরা খেতাব। সেই সাথে সেরা ডিফেন্ডার পুরস্কারও। গলায় উঠেছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ মেডেলটাও। মেসিকে আটকে দেয়া ভ্যান ডাইক, রোনালদোর বিপক্ষে কি করেন সেটাই ছিল দেখার ব্যাপার।

শারীরিক পর্তুগাল, এলোমেলো নেদারল্যান্ড

ম্যাচ গড়ালো পর্তুগালের কিক অফ দিয়ে। গোলমুখে পারফেক্ট নাম্বার নাইন না থাকা, সেই সাথে ভ্যান ডাইক এবং ডি লিটের উপস্থিতি, একইসাথে আবার রোনালদো, সিলভার দুরন্ত ফর্ম – সব মিলিয়ে নেদারল্যান্ড বস রোনাল্ড কোম্যান বাজি রাখলেন রক্ষণের উপর। কাজে দিল তার সিদ্ধান্ত। পর্তুগাল আক্রমণে যাচ্ছে আর একের পর এক ক্লিয়ারেন্স বা ইন্টারসেপশনে ডাচদের রক্ষা করছেন ডি লিট আর ভ্যান ডাইক। পুরো প্রথম অর্ধে এমনই ছিল চেহারা। এক পর্যায়ে রীতিমতো নিজেদের বদলে ফেলে পর্তুগাল। ডি লিট, ভ্যান ডাইক আর ড্যানি ব্লিন্ড থেকে বাঁচতে দুরপাল্লার শট নির্ভর আক্রমণে শাণাতে থাকে তারা।

নেদারল্যান্ডসের ভরসার দুই নাম ডি লিট এবং ভ্যান ডাইক; Source : Standard.uk

প্রথমার্ধে নেদারল্যান্ডসের এলোমেলো ফুটবলের বিপরীতে বেশ শারীরিক ফুটবল খেলে পর্তুগাল। কড়া ট্যাকল, মাঝমাঠে ডি রন আর ওয়াইনাল্ডামের পাসিং এর বিপরীতে পর্তুগাল খেলেছে বেশ অনেকটা পরিশ্রম করে। আগের ম্যাচে উজ্জ্বল বার্সার নতুন সাইনিং ডি ইয়ং এই ম্যাচে ছিলেন খোলসবন্দী হয়ে। প্রথমার্ধ শেষে পর্তুগালের ৯ শটের বিপরীতে নেদারল্যান্ডসের শট ছিল না একটিও।

আক্রমণাত্মক রোনালদো; Source : Standard.uk

গুইদেসের গোল এবং একজন রুই প্যাট্রিসিও

প্রথমার্ধে নিষ্প্রভ ছিল নেদারল্যান্ডস, পর্তুগিজ গোলরক্ষক প্যাট্রিসিও তাই খুব বেশি পরিশ্রম করেননি গোলবারের নিচে। দ্বিতীয়ার্ধে তার পরীক্ষা নিতে চাইলো ডাচরা, আর তাতেই কপাল পুড়লো তাদের। পাল্টা আক্রমণে দারুণ মৌসুম কাটানো বানার্দো সিলভা পাস দিলেন গুইদেসকে। সেখান থেকেই কামান দাগানো শট। গুইদেসের নাম উঠলো স্কোরশিটে। ম্যাচের বয়স তখন ঠিক ঠিক এক ঘন্টা।

গুইদেসের গোল, উড়ন্ত বানার্দো সিলভা; Source : Standard.uk

পরের অংশটা তোলা থাক শুধুই রুই প্যাট্রিসিও আর ফন্টে রুবেন ডিয়াজের জন্য। আক্রমণের ধার বাড়িয়েছে নেদারল্যান্ডস। কিন্তু পর্তুগালের রক্ষণ দেয়াল আর ভাঙা হয়নি তাদের। আগের ম্যাচে দুই গোল করা কুইন্সে প্রমিস নেমেও আশা দেখাতে পারেননি। মেমফিস ডিপাই বেশ কবার পরীক্ষায় ফেলেছিলেন রুই প্যাট্রিসিওকে কিন্তু তাতে খুব বড় বিপদ ঘটেনি। ঘরের মাঠে পর্তুগাল প্রথমবার পেল শিরোপার স্বাদ। আর ১৯৮৮ সালের ইউরোর পর আর কোন আন্তর্জাতিক ট্রফি না জেতার আক্ষেপ নিয়েই মাঠ ছেড়েছেন কোম্যান ভ্যান ডাইকরা।

শিরোপা হাতে রোনালদো এবং পর্তুগাল; Source : Standard.uk

শেষটা একেবারেই চেনা দৃশ্যের মত। রোনালদোর হাতে আরেকটা শিরোপা। তবে এবার পর্তুগালের লালে। ৩ বছর আগে এডারের গোল, আর এবার গুইদেসের। নিশ্চিত হলো ইউরো ২০২০ এর অংশগ্রহণ। সেই সাথে ইউরোপের রাজা পর্তুগালই থাকলো, সিংহাসন অন্তত ঘরের মাঠে হাতছাড়া করেননি রোনালদো। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসেও নিজের উপর নিজের আত্মবিশ্বাসে আরেকদফা প্রলেপ দিতে পারেন সিআর সেভেন।  

Featured Image Source: standard.co.uk

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *