ম্যানসিটি ও লিভারপুলের ধ্রুপদী লড়াই এবং ইপিএলের জয়জয়কার

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শেষ দিনে একই সময়ে মুখোমুখি হয়েছিল ম্যানচেস্টার সিটি ও লিভারপুল। অ্যানফিল্ডে উলভসকে আতিথ্য দেয় অলরেডরা। বিপরীতে অ্যামেক্স স্টেডিয়ামে ব্রাইটনের বিপক্ষে অ্যাওয়ে ম্যাচে মাঠে নামে ম্যানসিটি। পয়েন্ট টেবিলে দুই দলের পয়েন্ট ব্যবধান তখন মাত্র ১ পয়েন্ট। লিগের ৩৮তম ম্যাচে লিভারপুলের জন্য সমীকরণ ছিল দুইটি। দীর্ঘ ২৯ বছরের শিরোপা খরা কাটানোর জন্য লিভারপুলের প্রয়োজন ছিল নিজেদের জয়ের পাশাপাশি সিটিজেনদের হার অথবা ড্র। অপরদিকে ম্যানসিটির প্রয়োজন ছিল শুধুমাত্র জয়। পুরো মৌসুমে লিগে ইয়ুর্গেন ক্লপের শিষ্যদের হার মাত্র ১টি। বিপরীতে সিটিজেনদের হার ছিল ৪টি। কিন্তু সিটির ২ ড্রয়ের বিপরীতে লিভারপুলের ড্র ছিল ৭টি। মূলত এখানেই দুই দলের শিরোপা লড়াই জমজমাট হয়।

শিরোপা নিয়ে ম্যানসিটির উল্লাস; Image Source: Getty Images

নিজেদের শেষ ম্যাচে উলভসের বিপক্ষে ১৭ মিনিটেই সাদিও মানের গোলে এগিয়ে যায় লিভারপুল। এই গোলেই ২৯ বছর পর ক্লপের হাত ধরে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে অলরেড ফ্যানরা।অ্যানফিল্ডে বসে লিভারপুলের ভক্তরা ম্যাচ উপভোগের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী সিটির ম্যাচ সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছিল। কেননা নিজেদের চেয়ে সিটির ম্যাচের ফলাফল অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অ্যামেক্স স্টেডিয়ামে যখন ২৭ মিনিটে গ্লেন মুরের গোলে ব্রাইটন এগিয়ে যায় তখন লিভারপুলের ফ্যানদের শিরোপা জয়ের আশা আরো বেড়ে যায়। কিন্তু মাত্র ৮৩ সেকেন্ডের মাথায় সার্জিও আগুয়েরো সিটির হয়ে গোল পরিশোধ করেন।

২.

ইয়ুর্গেন ক্লপ অ্যানফিল্ডে পা রাখার পর থেকে পুরোপুরি বদলে গেছে লিভারপুল। এই জার্মান কোচের হেভিমেটাল ফুটবলে ভর করে টানা দুই মৌসুম চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে পা রেখেছে সালাহ-সানেরা। সেই সাথে ঘরোয়া লিগেও শিরোপা দৌড়ে সমানতালে লড়েছে। গত মৌসুমে ম্যানসিটির চেয়ে অনেক পয়েন্ট পিছিয়ে ছিল লিভারপুল। কিন্তু ২০১৮-১৯ মৌসুমে এই দুই ইংলিশ জায়ান্টের পয়েন্ট ব্যবধান মাত্র এক। সমান ৩৮ ম্যাচ থেকে লিভারপুলের সংগ্রহ ৯৭ পয়েন্ট। ইউরোপিয়ান ফুটবলে ৯৭ পয়েন্ট নিয়েও শিরোপা জয়ের রেকর্ড নেই বললেই চলে।

দুর্দান্ত লিভারপুল; Image Source: liverpoolfc

তবে কী আরো একবার দুর্ভাগ্যের শিকার হলো লিভারপুল? পেশাদার ফুটবলে ভাগ্যের দোহাই দেওয়া সাজে না। তবে একটি দল যখন ৩৮ ম্যাচের মধ্যে মাত্র এক ম্যাচ হেরে শিরোপা জিততে ব্যর্থ হয়, তখন সেটাকে দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কি বা বলা যায়। একদিক থেকে লিভারপুলের এই হার ইপিএলকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। লা লিগায় যখন মৌসুমের অর্ধেক পার হওয়ার পরই চ্যাম্পিয়ন কারা হতে যাচ্ছে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়। সেখানে ইপিএলে লিগের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এই পরিসংখ্যানই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগকে বিশ্বের এক নম্বর লিগে পরিণত করেছে।

৩.

লিগ শিরোপা জয়ের পর সিটির অধিনায়ক ভিনসেন্ট কোম্পানি স্বীকার করেছেন যে তার ক্যারিয়ারে এবারের মৌসুমটি ছিল সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। সিটির হয়ে তিনি এর আগে আরো তিনটি শিরোপা জিতেছেন। কিন্তু এবারের মতো স্নায়ুচাপে তাকে একবারও ভুগতে হয়নি। এবার তার দল শিরোপা জিতেছে সেকেন্ডের ব্যবধানে। লিভারপুলের সাথে তাদের যে পয়েন্ট ব্যবধান সেটাকে তুলনা করা যেতে পারে মিলিমিটারের সাথে। কিন্তু এই সামান্য ব্যবধানই ইতিহাদ স্টেডিয়ামে আলো ঝলমল উৎসবে পরিণত করেছে।

ইপিএলকে আকর্ষণীয় করেছেন এই দুই কোচ; Image Source: Getty Images

তবে এবারের মৌসুমে লিভারপুলের শিরোপা জয়ের সমূহ সম্ভাবনা ছিল। গত ৪ জানুয়ারি ইয়ুর্গেন ক্লপের শিষ্যরা ইতিহাদে ম্যানসিটির বিপক্ষে যখন মাঠে নামে, তখন তারা সিটির চেয়ে সাত পয়েন্ট এগিয়ে। ক্লপ জানতেন এই ম্যাচে জয় পেলেই পয়েন্ট ব্যবধান দাঁড়াবে দুই অঙ্কে। কিন্তু তার শিষ্যরা তাকে হতাশ করেন। সিটির মাঠে ২-১ গোলে হারার ফলে পয়েন্ট ব্যবধান কমে দাঁড়ায় চারে। তবে অলরেডদের এগিয়ে যাওয়ার আবারো সম্ভাবনা ছিল। চেলসি ও ক্রিস্টাল প্যালেসের কাছে সিটিজেনদের টানা হারের সময় লিভারপুল পাঁচ সপ্তাহে ছয় ম্যাচের মধ্যে চারটিতে ড্র করে বসে। মার্চের ৩ তারিখে মার্সিসাইড ডার্বিতে এভারটনের সাথে গোলশূন্য ড্র করার পর আবারো লিগের নিয়ন্ত্রণ নেয় পেপ গার্দিওলার শিষ্যরা।

৪.

ম্যানসিটির তারকা খেলোয়াড়রা দলের প্রয়োজনে জ্বলে উঠেছেন। একইভাবে লিভারপুলের সালাহ-মানেও ধারাবাহিকভাবে পারফরম্যান্স করে গেছেন। তবে ম্যানসিটি তাদের লক্ষ্যের দিকে একনিষ্ট থাকায় মার্চের পর আর দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে আসেনি। এবারের মৌসুমে দুই দলের পারফরম্যান্স থেকে উভয়কেই চ্যাম্পিয়ন বলা যায়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে শিরোপা ইতিহাদেই গিয়েছে। অন্যদিকে লিভারপুলের অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয়েছে।

লিভারপুলের শিরোপা খোয়ানোর জন্য মূলত তিনটি ম্যাচের পারফরম্যান্স দায়ী। আর্সেনাল, ওয়েস্ট হ্যাম ও লেস্টার সিটির বিপক্ষে জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ড্র করে মাঠ ছেড়েছে। তবে লিভারপুলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ই নিজেদের শতভাগ উজার করে দিয়ে খেলেছেন। তাই চাইলেও শিরোপা খরা দীর্ঘায়িত করার জন্য কোনো অলরেড তারকাকে দায়ী করতে পারবেন না।

৫.

গত মৌসুমে ম্যানসিটির সংগ্রহ ছিল ঠিক ১০০ পয়েন্ট। এবারের মৌসুমে তার চেয়ে মাত্র দুই পয়েন্ট কম। এর মধ্য দিয়ে গার্দিওয়ার শিষ্যরা প্রমাণ করেছেন তারা কতটা ধারাবাহিক। ইয়ুর্গেন ক্লপও এটি মেনে নিতে বাধ্য। এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আগামী মৌসুমে আবারো শিরোপা লড়াইয়ে নিয়োজিত হবে। তার আগে উৎসব এখন সিটিতে। তবে লিভারপুলের সামনে আরো বড় শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী মাসে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে টটেনহামকে হারাতে পারলেই ক্লপ ও তার শিষ্যরা নিজেদের প্রাপ্য বুঝে পাবেন।

ম্যানসিটি বনাম লিভারপুল ম্যাচ মানেই ধ্রুপদী লড়াই; Image Source: AFP

এবারের মৌসুমে লিভারপুল ও ম্যানসিটির ধ্রুপদী লড়াই ইপিএলকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইংলিশ লিগ আরো একবার নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। এবার ইউরোপে একক আধিপত্য বিরাজ করছে ইংলিশ ক্লাবগুলোর। চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ইউরোপিয়ান কাপে অল ইংলিশ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘদিন পর স্প্যানিশদের রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে ইংলিশরা। আর এর পেছনে বড় অবদান রয়েছে ইয়ুর্গেন ক্লপ ও লিভারপুলের। তাই বলা যায় সামান্য ব্যবধানে ঘরোয়া লিগের শিরোপা হারালেও অলরেডদের প্রাপ্য সম্মান সকলকেই দিতে হবে।

Featured Image Source: Liverpool FC

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *