ইয়ুর্গেন ক্লপ এবং বদলে যাওয়া লিভারপুল

দলটি ইংল্যান্ডের রেকর্ড চ্যাম্পিয়ন ছিল। তাদের স্টেডিয়ামের টানেলে তখন বড় দলগুলোর হেঁটে যেতে কিছু একটা না হোক অন্তত গলার কাছে দম আটকে আসতো। সেই দলটার হঠাৎ ছন্দপতন। শিরোপা নাহয় নাই এলো তাদের ঘরে। কিন্তু ভাল খেলা, শিরোপা রেসে থাকা কিংবা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জায়গা করা নেয়া সবই ভুলতে বসেছিল তারা। একে একে অনেকে এলো গেলো, কিন্তু তাদের আর ফেরা হয়না। হয়ত অসাধারণ কিছু ম্যাচ খেললো, কিন্তু মৌসুম শেষে তারা সাত কিংবা আট নাম্বারের একটি দল।

লিভারপুলে তার প্রথম দিন; Image source – besoccer.com

দলটা সেবার শিরোপা পেতে পারতো কিন্তু অধিনায়ক নিজেই হঠাৎ নিজেদের অর্ধে হোঁচট খেলেন। হোঁচট খেলো শিরোপার স্বপ্নটাও। গল্পের দলটার নাম লিভারপুল। সেই লিভারপুলের দায়িত্ব নিলেন একজন জার্মান। নাম ইয়ুর্গেন ক্লপ। লিভারপুলের মত বড় দলে আসার আগে কাজ করেছেন শুধুমাত্র জার্মানির ঘরোয়া লিগে মেইঞ্জ এবং বুরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে। মূলত ছিলেন ফুটবল বিশ্লেষক। খেলোয়াড়ি জীবনেও খুব বড় তারকা ছিলেন না। কিন্তু তিনি আসতেই বদলে যেতে শুরু করলো মার্সিসাইডের লাল অংশের প্রতিনিধিরা।

লিভারপুল ডাগআউটে ক্লপ; Image source- wallpaercave.com

একের পর এক দারুণ সাইনিং, হেভি মেটাল প্রেসিং ফুটবল, কোট টাই ছেড়ে ট্র্যাক স্যুট আর ভারি চশমায় খেলোয়াড়দের সাথে বন্ধু হয়ে ওঠা, সবমিলিয়ে অ্যানফিল্ডে আবার ফিরে আসতে শুরু করে বসন্তের বাতাস। যে বসন্তের কারিগর একজন ইয়ুর্গেন ক্লপ

কোচিং ছেড়ে ক্লপ যখন অভিভাবক

একজন ফুটবলার বল পায়ে কী করতে পারেন কিংবা বল ছাড়া মাঠে তার ভূমিকা কী সেটা একজন কোচ নির্ধারণ করে দিতে পারেন। কিন্তু যা পারেন না তা হলো সেইসব খেলোয়াড় আসলেই কে, তাদের ফুটবল নয় বরং জীবনদর্শন বা বিশ্বাস কি, তারা কতটা পথ পাড়ি দিয়ে আজকের অবস্থায় এসেছেন। ক্লপ খবর রাখেন সবকিছুরই। প্রতিটা খেলোয়াড়ের আবেগ, ভালবাসা। অ্যানফিল্ড কিংবা ট্রেনিং ফিল্ড মেলউড পরবর্তী জীবনটাকেও চিনতে শুরু করলেন ক্লপ। কোচের চেয়ে ক্লপ হতে চাইলেন সবার বন্ধু, সবার অভিভাবক।

খেলোয়াড়দের সাথে বন্ধুর মতই মিশেছেন ক্লপ; Image source- wallpaercave.com

সেবার ক্লাবে মাত্রই যোগ দিয়েছেন অ্যান্ডি রবার্টসন। কিন্তু দিন দুয়েক বাদেই ট্রেনিং এ নেই তিনি। বাবা হতে যাচ্ছেন তিনি। ক্লপ আর দেরি না করেই ছুটি দিলেন তাকে। আর ক্লাবের স্টাফদের অনেকেই যখন রবার্টসনের খোঁজে ক্লপ তখন বিষ্মিত সুরে বললেন,

‘তোমরা এতবড় ঘটনা না জেনে কিভাবে বসে আছো? এটা তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়।’

সাদামাটা অভিব্যক্তির আড়ালে একজন মাস্টারমাইন্ড; Image source- wallpaercave.com

সেই রবার্টসন বর্তমানে ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় লেফটব্যাক। আর ম্যাচ শেষে মাঠে গিয়ে ফলাফলকে একপাশে সরিয়ে রেখে সব খেলোয়াড়দের বুকে টেনে নিতে পেরেছেন বলেই হয়ত লিভারপুল আজ স্বপ্ন দেখে বড় কিছুর।

ছুটির দিন এবং হোয়াটস অ্যাপ চ্যাট গ্রুপ

গ্রীষ্মের ছুটিতে সবাই যার যার ঘরে। দেশের হয়ে খেলার তাড়াও খুব বেশি নেই। হয়ত একেকজন একেকপ্রান্তে থাকতে পারতেন। কিন্তু দলের কোচ যে ইয়ুর্গেন ক্লপ! হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে সবাইকে ধরে রাখলেন ছুটির দিনেও। দলের হাল ধরার পর থেকেই এই অবস্থার শুরু। দলের মাঝে আলাদা বন্ধন তৈরি করা, নতুন বোঝাপড়ার জন্ম দেয়া, খেলার মাঠের দায়িত্ব বুঝে নেয়া সবই ছিল এই গ্রুপে।

ক্লপের কাছে খেলার চেয়েও মুখ্য খেলোয়াড়; Image source- wallpaercave.com

গত মৌসুমেই খেলোয়াড়রা একে একে নিজেদের ট্রেডমিলে দৌড়ানোর ছবি তুলে ক্লপকে বুঝিয়ে দিলেন, শরীর ফিট রাখতে তারা প্রস্তুত। ক্লপ পালটা উত্তর দিলেন,

‘বাহ! বেশ ভালো। কিন্তু তোমাদের কি মনে হয় এটাই সত্যিকার রানিং? ভুল!’

ক্লপ বুঝিয়ে দিলেন ছেলেদের কেন তিনি মেশিনের পিছনে চান না। এক সপ্তাহ পর চিত্রটা বদলে গেল। সালাহ, মানে আর ফিরমিনোদের দেখা গেল সত্যিকার দৌড়ের ছবিতে।

অন্য ভুবনের ক্লপ

দুই মৌসুম আগের কথা। লিগ শেষ। হংকং এর ওজোন স্কাই বারের ১১৮ তলায় দাঁড়িয়ে ৫০ বছর বয়সী ক্লপ। ভাবছেন গত বছর কেন লিগ টাইটেল হাতে এলো না। খেলার সবই ঠিক ছিল। এক দুটা ম্যাচে হয়ত হেরেছেন, কিন্তু খেলোয়াড়দের মনোসংযোগে তাতেই চিড় ধরে গেল। লিভারপুলের সেবার আর ফেরা হলোনা। পুরো মৌসুমের অর্ধেকটা দারুণ খেলেও লিভারপুল তাই চার নাম্বারে।

এখন পর্যন্ত ক্লপেই আস্থা অলরেড ভক্তদের; Image source- wallpaercave.com

সেদিন গোল ডট কমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ক্লপ বলেন

আমি বলব ৩১ ডিসেম্বর ম্যানচেস্টার সিটির সাথে ম্যাচটার আগেও সব ঠিকই ছিল। দুই দলই দারুন খেলেছে। এবং সিটি যোগ্য দল হিসেবেই ১-০ গোলের জয় পেয়েছে। কিন্তু সে ম্যাচে আরো অনেককিছুই হতে পারতো। দুইদিন পর, সান্দারল্যান্ডের সাথে আলাদা একটা ম্যাচ খেললাম। এবার আমাদের ভাগ্যে এলো ড্র। তারা দারুণ ডিফেন্সিভ ছিল। আমাদের দুটা পেনাল্টি প্রাপ্য ছিল। হয়ত আমাদেরই ভুল ছিল। আমরা আমাদের সুযোগকে কাজে লাগাইনি।’

খেলার আগে চিন্তামগ্ন ক্লপ; Image source- wallpaercave.com

কিন্তু ক্লপের প্রশ্ন অন্য জায়গায়। এটা তো কেবল এক বা দুই ম্যাচ। চেলসিও সেই মৌসুমে হেরেছিল। তবু তারা লিগ চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু এসব ছাপিয়ে ক্লপের মাথায় চলছিল অন্যকিছু।

‘জানুয়ারির শুরুতেই আমাদের মনোবলে ভেঙে পড়ে। নিজেদের প্রতি যতটা আত্মবিশ্বাস আমাদের থাকা দরকার ছিল ততটা আমাদের ছিল না। আবার একই সময় সাদিও (মানে) ছিল আফ্রিকান কাপ অফ নেশন্সে। এটা আমাদের জন্য বড় ধাক্কা। ফেব্রুয়ারি মাসেও আমাদের সেই দুরবস্থা কাটেনি। আমাদের সেই বাজে অবস্থা চলতেই থাকলো। মার্চে আমরা ঘুরে দাঁড়াই। ম্যাচ জিততে শুরু করি। কিন্তু ততদিনে সবাই বলতে শুরু করলো আমাদের খেলার ধরন বদলেছে। আমাদের মাঠে আরো কষ্ট করতে হচ্ছে। ছেলেরা এসব কথায় আরো বেশি সমস্যায় পড়ে গেলো।’

প্ল্যান বি এবং ক্লপ ভাবনা                                                 

সবার কাছেই মৌসুমের শেষভাগে এসে সমালোচনা শুনলেন ক্লপ। একটাই কথা, ক্লপের কোনো বিকল্প চিন্তা বা প্ল্যান বি নেই। কিন্তু ইয়ুর্গেন ক্লপ অন্য ধারার মানুষ। তার কাছে কোনো প্ল্যান বি থাকেনা। তার কাছে প্ল্যান বি রক্ষা মানেই নিজেদের বোঝাপড়া আর আত্মবিশ্বাসের অভাব। একজন জার্মান হয়ে কিভাবে তা থাকবে তার মগজে?

‘দেখুন বিষয়টি এমন না যে, আরে! এইতো প্ল্যান ডি, এফ কিংবা কিউ… আমার কাজ মাঠে ১০০০ টি ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় দল পরিচালনার না। আমার কাজ, আমাদের যা সক্ষমতা, আমাদের যা আত্মবিশ্বাস সেই অনুযায়ী সেরা খেলা বের করে আনা।’

ক্লপ এমন এক কোচ যার কোন বিকল্প ভাবনা নেই; Image source- wallpaercave.com

কিন্তু কোচ ক্লপ না চাইলেও অন্যদের কাছে এসব সমালোচনা গুরুত্ব পায়। স্বভাবতই খানিক বিরক্তিও চলে আসে সাবেক এই ফুটবলবোদ্ধার মনে।

‘আমি যখন এধরনের খবর পাই আমি জানি আমি এসব খবর শতভাগ এড়িয়ে যাই। কিন্তু হায় ঈশ্বর। বাকি সবাই এসব নিয়ে মাতামাতি করছে। আমাদের এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা বন্ধ করা উচিত।’

ভুলই যার দর্শন শিক্ষার অঙ্গ

ক্লপের ফুটবল দর্শনের এই এক আলাদা দিক। ভুল আর খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত পছন্দের মাঝে পছন্দটাকেই তিনি বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন সবসময়। ঠিক যেন আদুরে একজন বাবা। সন্তানের সব অপরাধ ক্ষমা করে দিয়ে সে যা করতে চাইছে তাতেই সায় দিচ্ছেন।


ক্লপ যখন ডর্টমুন্ড কোচ; Image source- wallpaercave.com

‘আপনি ফিরমিনোর কথা চিন্তা করুন। সবাই বলছে ফিরমিনো গোল পাচ্ছেনা। কি আশ্চর্য! ফিরমিনো গোল ছাড়াই অসাধারণ খেলছে। দলের গোলে ভূমিকা রাখছে। প্রেসিং করছে। কিন্তু সে যদি গোলের কথা ভেবে খেলতে গিয়ে অযথা শট করতে শুরু করে? তার চেয়ে সে চাইছে অন্যদের জায়গা করে খেলাটা গুছিয়ে দিতে। সে তাই করে যাচ্ছে।’

ক্লপ বিশ্বাস করেন, খেলোয়াড়দের স্বাধীন হতে দিলেই ভাল কিছু শুরু হবে।

‘আমাদের একটা পরিকল্পনা, একটা আওয়াজ কিংবা একটা বিশ্বাসের দরকার। এটা যে শতভাগ সঠিক হবে তা নয়। আমরা কেউই শতভাগ সঠিক না। কিন্তু এভাবেই আমাদের এগুতে হবে।

যার কোচিং এ ভুলই সবচেয়ে বড় শিক্ষা; Image source- gettyimages

ফুটবল দলগত খেলা, ক্লপ নিজেও তা বিশ্বাস করেন। কিন্তু লিভারপুলে থাকা প্রতিটা মানুষের জন্য তিনি তৈরি করেছেন আলাদা আলাদা স্বত্ত্বা। ট্রেন্ট আলেকজান্ডার আর্নল্ড যখন একইসাথে আক্রমণ আর রক্ষণে ব্যস্ত থাকতে চেয়েছে, ক্লপ তাকে তাই শিখিয়েছেন। আলেকজান্ডার আর্নল্ডের ভুল থাকলেও ক্লপ মেনে নিয়েছেন অকপটে।

তার হাতেই নিজেকে বড়মঞ্চে চিনিয়েছেন জিনি ওয়াইনাল্ডাম, ডিভক অরিগি কিংবা বেন উডবার্নের মত তরুণরা। ক্লপের ডাগআউট থেকে একটাই কথা সবার জন্য

‘যা করছো তাই করে যাও। চেষ্টা করতে থাকো, করতেই থাকো। সুযোগ হারানো কখনোই ব্যর্থতা নয়। এটা একটা শিক্ষা। সেই শিক্ষাটা গ্রহণ করে আবারো চেষ্টা করো।’

প্রেস কনফারেন্সে উজ্জ্বল ক্লপ; Image source- wallpaercave.com

দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, আমাদের নিজেদের সন্দেহ থেকে বিশ্বাসের দিকে পরিবর্তন করতে হবে। এত দিন পর লিভারপুল আসলেই বিশ্বাস করতে শিখেছে। বিল শ্যাঙ্কলি বা বব পেইসলির মত হয়ত আরো একজন তাদের মাঝে এসেছেন। তিনি ইয়ুর্গেন ক্লপ। এখনো কিছুটা সময় তার প্রয়োজন। তবে অ্যানফিল্ডে সুদিন আসবে। এবং সেটা হয়তো ক্লপের হাত ধরে।

Feature image – Wallpapercave

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *