টটেনহামকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতলো ক্লপের লিভারপুল

ঘরোয়া লিগের মৌসুম ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। ফুটবল ভক্তরা নারী বিশ্বকাপ, নেশন্স লিগের সেমিফাইনাল এবং কোপা আমেরিকা দেখার জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষায় রয়েছেন। আর মৌসুমের শেষে মৃতপ্রায় ক্লাব ফুটবলের ভক্তদের জাগিয়ে তুলতে মাদ্রিদ সেজেছিলো নতুন সাজে। অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের নতুন স্টেডিয়াম ওয়ান্ডা মেট্রোপলিটানো প্রস্তুত ইউরোপের নতুন রাজা নির্বাচনে। বলছিলাম বহুল প্রতীক্ষিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালের কথা।

ওয়ান্ডা মেট্রোপলিটানো; Image Source: Standard Uk

১০৯৯ দিন একটানা চ্যাম্পিয়ন হিসেবে রাজত্ব করার পর রিয়াল মাদ্রিদ ইতোমধ্যেই সিংহাস ছেড়ে দিয়েছে। আর এবারের দুই ফাইনালিস্ট টটেনহাম এবং লিভারপুল। অল ইংল্যান্ড ফাইনাল হওয়া মাদ্রিদের সাজসজ্জা ছিলো শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

টটেনহাম বনাম লিভারপুল; Image Source: B/R

দুর্দান্তভাবে পুরো টুর্নামেন্টে জুড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ফাইনালে কোয়ালিফাই করা উভয় দলই শক্তিমত্তায় সমান শক্তিশালী। যদিও এটি ছিলো টটেনহামের ক্লাব ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল। অন্যদিকে, ষষ্ঠবারের মতো এই শিরোপা জিতে বার্সেলোনাকে টপকানোর সুযোগ ছিলো মার্সিসাইডের লিভারপুলের সামনে।

ক্লপ এবং পচেত্তিনো; Image Source: Guardian

এর আগে টানা ৬টি ফাইনালে পরাজিত হওয়া লিভারপুলের কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ এই ফাইনাল ম্যাচটি জেতার ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। লিভারপুলকে এই যুগের সেরা মৌসুম উপহার দেয়া ক্লপের জাদুমন্ত্রে বার্সেলোনাকে পরাজিত করে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে দলটি।

টটেনহাম একাদশ; Image Source: Guardian

অন্যদিকে, কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোর নেতৃত্বে টটেনহাম প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠেছে। বলতে গেলে এই অর্জনটিও তাদের জন্য শিরোপা জয়ের সমান। কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটি, সেমিতে আয়াক্সের মতো দলকে পরাজিত করার পর ফাইনাল জেতার ব্যাপারে অবশ্যই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তিনি। যার ফলে নিজের সেরা একাদশকে নিয়েই মাঠে নামেন পচেত্তিনো।

১ মিনিট নীরবতা; Image Source: Standard Uk

গতকাল সেভিয়েতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়া সাবেক স্প্যানিশ ফুটবলার হোসে অ্যান্তনিও রেয়েসের জন্য ১ মিনিট নীরবতা পালন করে উভয় দল। অতঃপর ওয়ান্ডা মেট্রোপলিটানোতে ম্যাচটি শুরু হয় বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়। ম্যাচের প্রথম আক্রমণটি রচনা করেন লিভারপুলের খেলোয়াড়েরা। লেফট উইং থেকে ড্রিবলিং করে ডি বক্সে ঢুকেই তুলকালাম কাণ্ড ঘটান সাদিও মানে।

গোলের দৃশ্য; Image Source: Guardian

তার দেয়া ক্রসটি ডি বক্সে থাকা টটেনহাম মিডফিল্ডার সিসোকোর হাতে লাগে। এতে করে ম্যাচের প্রথম মিনিটেই পেনাল্টি পায় লিভারপুল। আর এই সুযোগ হাত ছাড়া করেননি প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেনবুট জয়ী তারকা মোহাম্মদ সালাহ। হুগো লরিসকে পরাস্ত করে দ্বিতীয় মিনিটেই লিভারপুলকে ১:০ গোলে এগিয়ে দেন তিনি। ইউরোপিয়ান কাপ থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নামকরণ হওয়ার পর সালাহর এই গোলটিই ফাইনালের সবচেয়ে দ্রুততম গোল।

গোল উদযাপন; Image Source: Guardian

প্রথম গোল হজম করার পরেও নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে থাকেন টটেনহামের খেলোয়াড়েরা। প্রথম দশ মিনিটে সন এবং দেলে আলিরা একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও লিভারপুলের শক্তিশালী রক্ষণভাগ ভেদ করতে পারেননি। এই ক্ষেত্রে অবশ্য লিভারপুলের তরুণ রাইটব্যাক আলেকজান্ডার আর্নল্ডের ভূয়সী প্রশংসা করতে হয়। তিনি একাই টটেনহামের হাফ ডজন আক্রমণ রুখে দিয়েছেন।

Image Source: Guardian

১২ মিনিটের মাথায় টটেনহামের কাপ্তান হ্যারি কেনকে মারাত্মক ট্যাকেল করেন মাতিপ। যদিও এই যাত্রায় কোনো কার্ড দেখতে হয়নি তাকে। অন্যদিকে, ফ্রি কিক পায় স্পার্সরা। সেটি অবশ্য কাজে লাগাতে পারেনি তারা। অতঃপর আক্রমণ এবং প্রতিআক্রমণে ম্যাচের সময় এগুতে থাকে। যদিও বল দখলে মোটামুটি পিছিয়ে পড়ে লিভারপুল। মার্সিসাইডের দলটি প্রথম গোলের পর উল্লেখযোগ্য আক্রমণ করে ২২ মিনিটের মাথায়। আর্নল্ডের কর্নারকে শূন্যে ঝাঁপিয়ে বিপদমুক্ত করেন হুগো লরিস। তা না হলে ভার্গিল ভ্যান ডাইক সহজেই হেডে গোল করে ব্যবধান বাড়িয়ে দিতে পারতেন।

Image Source: Guardian

ভক্তরা যেমন উপভোগ্য ভেবেছিলেন, বাস্তবিক তেমন উপভোগ্য হয়নি ম্যাচটি। দুই দলই অগোছালো আক্রমণ করে সময় অতিবাহিত করতে থাকে। যদিও প্রথমার্ধে লিভারপুলের সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য আক্রমণটি ছিলো ৩৮ মিনিটে। রবার্টসনের জোরালো দূরপাল্লার শটটি শক্তহাতে ফিরিয়ে দেন হুগো লরিস। অতঃপর ১:০ গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় লিভারপুল।

Image Source: Guardian

প্রথমার্ধে বল দখলে পিছিয়ে থাকায় দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই বল দখলের উপর নজর দেন ক্লপের শিষ্যরা। অন্যদিকে সন, কেন, আলি এবং অ্যারিকসেনদের নিয়ে গঠিত শক্তিশালী আক্রমণভাগ রুখতে রক্ষভাগকে আরো শক্তিশালী করেন ক্লপ। এতে করে দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম কয়েক মিনিটও অঘোচালো ফুটবল খেলতে থাকে উভয় দল।

Image Source: Guardian

দ্বিতীয়ার্ধে লিভারপুল প্রথম উল্লেখযোগ্য আক্রমণ সাজায় ম্যাচের ৫৩ এবং ৫৪ মিনিটে। প্রথমবার আলেকজান্ডার আর্নল্ডের ক্রসকে বিপদমুক্ত করলেও পরেরবার ফাঁকা জায়গায় বল পেয়ে যান সালাহ। যদিও তার জোরালো শটটি ভার্তেনগেনের গায়ে লেগে প্রতিহত হয়। ৫৫ মিনিটে টটেনহামের ডি-বক্সে ভয়ঙ্কর ক্রস করেন রবার্টসন। যদিও সাদিও মানে পা লাগানোর আগেই অভিজ্ঞ হুগো লরিস বলটি বুকে আগলে নেন। বড়সড় বিপদ থেতে রক্ষা পায় টটেনহাম।

Image Source: Guardian

এরপর অনেক্ষণ অগোছালো ফুটবল খেলতে থাকে দুই দল। ক্লপ অবশ্য দুইজন খেলোয়াড়কে বদলি করে কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। ৬৯ মিনিটের সময় রাইট উইং থেকে চমৎকার একটি আক্রমণ রচনা করে লিভারপুল। যদিও বদলি হিসেবে নামা মিলনার লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নেয়ায় গোলবঞ্চিত হয় দলটি। ৭৫ মিনিটে ম্যাচে সমতায় ফেরার সুযোগ পায় টটেনহাম। মাঝমাঠ থেকে পাওয়া বল নিয়ে দারুণভাবেই ডি-বক্সে ঢোকেন সন। তিনি শট নেয়ার মুহূর্তে অসাধারভাবে বলটি ক্লিয়ার করে দেন ভ্যান ডাইক।

Image Source: Guardian

৮০ মিনিটের মাথায় লিভারপুল দুর্গে আবারো হানা দেন সেই সন। ২৫ গজ দূরে থেকে তার নেয়া শটটি ফিরিয়ে দেন অ্যালিসন। অতঃপর আবারো বল পেয়ে শট নেন বদলি হিসেবে নামা লুকাস মোরা। এবারও লিভারপুলকে বিপদমুক্ত করেন অ্যালিসন। ৮৬ মিনিটের মাথায় কর্নার থেকে গোল করার সহজ সুযোগ নষ্ট করে টটেনহামের একাধিক খেলোয়াড়। সনের হেডটিও গোলপোস্টে না ঢুকে মাঠের বাইরে চলে যায়। এতে করে শেষের দশ মিনিটে পঞ্চমবারের মতো গোলের সুযোগ হাতছাড়া করে স্পার্সরা।

Image Source: Guardian

৮৮ মিনিটে লিভারপুলের হয়ে কর্নার করেন মিলনার। কর্নার থেকে বল পেয়ে গোল করতে চেষ্টা করেন ভ্যান ডাইক এবং মাতিপ। পরবর্তীতে মাতিপ বল বাড়িয়ে দেন বদলি হিসেবে নামা অরিগির দিকে। অরিগি বল পেয়ে অসাধারভাবে হুগো লরিসকে মোকাবেলা করে লিভারপুলকে দ্বিতীয় গোল এনে দেন। ওয়ান্ডা মেট্রোপলিটানোতে লিভারপুলের সমর্থকরা ততক্ষণে শিরোপা উদযাপন শুরু করেছে। ৯০ মিনিট শেষে অতিরিক্ত ৫ মিনিট দিলেও ব্যবধান কমাতে পারেনি স্পার্সরা। অন্যদিকে, টটেনহামকে ইতিহাসের প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে তুলেও শিরোপা জেতাতে পারেননি মাউরিসিও পচেত্তিনো।

জয় উদযাপন; Image Source: Guardian

এই জয়ের মধ্যদিয়ে টানা ৬টি ফাইনালে পরাজয়ের পর শিরোপা জিতলেন ইয়ুর্গেন ক্লপ। লিভারপুলকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নের আসনে বসানোর পেছনে সর্বাধিক অবদান রয়েছে তার। ১ পয়েন্টের জন্য লিগ শিরোপা হাতছাড়া করার পর এই জয় মার্সিসাইডে আনন্দের বন্যা বইয়ে দিয়েছে। ২০০৫ সালে পঞ্চম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতার প্রায় ১৪ বছর পর ষষ্ঠ শিরোপা জিতলো লিভারপুল। শিরোপার দিকদিয়ে বার্সেলোনাকেও ছাড়িয়ে গেলো দলটি।

Featured Image: Guardian

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *