চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রোনালদোর ১০টি স্মরণীয় মুহূর্ত

নিঃসন্দেহে বর্তমান সময়ে প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টের মধ্যে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সর্বাধিক জনপ্রিয়। প্রতি মৌসুমে ইউরোপীয় ফুটবলের প্রথম সারির দলগুলো এই টুর্নামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এটিকে ফুটবল ভক্তদের নিকট সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে এই টুর্নামেন্টকে যিনি বিশেষভাবে নতুনত্ব এনে দিয়েছেন তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এখন অবধি এই টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। সেই সাথে দুটি ভিন্ন দলের হয়ে সর্বমোট পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপাও জিতেছেন ৩৩ বছর বয়সী এই পর্তুগিজ উইঙ্গার।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো; Image Source: Fb

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১৫টি দেশের ৩২টি ভিন্ন ভিন্ন দলের বিপক্ষে সর্বমোট ১২৪টি গোল করেছেন রোনালদো। এই গোল সমূহের মধ্যে ৬৩টি গোল তিনি করেছেন শুধুমাত্র নক আউট পর্বে। যখন যে ক্লাবের হয়ে মাঠে নামেন তখন সেই দলের জার্সি গায়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ধারাবাহিকভাবে জ্বলে উঠেন রোনালদো। আর এই কারণেই ভক্তরা এটিকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর লিগ নামেও আখ্যায়িত করেন। কিন্তু এতকিছুর মাঝেও রোনালদো তার সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন এবং নিজেও উপভোগ করেছেন। আজকে আলোচনা করা হলো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সিংহভাগ রেকর্ডের মালিক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ১০টি স্মরণীয় মুহূর্ত নিয়ে।

রোমার বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে প্রথম গোল (২০০৭)

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের হাত ধরে রোনালদো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে পাড়ি জমান। আজকের যে রোনালদোর খেলা আমরা উপভোগ করি, তার বেড়ে উঠা ম্যানইউতে। ২০০৭ সালে রোমার বিপক্ষে ওল্ড ট্রাফোর্ডে এক স্মরণীয় সন্ধ্যার সাক্ষী হন তিনি। সেটি ছিলো ম্যানইউর হয়ে তার চতুর্থ মৌসুম। লিগের পাশাপাশি সেবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও দাপটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।

রোমার বিপক্ষে রোনালদোর উদযাপন; Image Source: 90Min

এপ্রিলে কোয়ার্টার ফাইনালের দ্বিতীয় লেগে রোমার বিপক্ষে ৭-১ গোলের বিশাল জয় পায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। সেই ম্যাচে মোট দুটি গোল করে এই টুর্নামেন্টে গোলের খাতা খুলেন রোনালদো। প্রথম গোলের পর তার উদযাপন ছিলো ফ্রেমে বন্দী করার মতো। সেদিন সন্ধ্যায় ওল্ড ট্রাফোর্ডে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজের প্রথম গোল করা রোনালদোই আজ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

চেলসির বিপক্ষে ফাইনালে ম্যানইকে জয় উপহার দেয়া (২০০৮)

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে নিজের পঞ্চম মৌসুমে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জেতার সুযোগ পান রোনালদো। সেবার পুরো মৌসুমে ৪২টি গোল করে প্রথমবারের মতো শীর্ষ গোলদাতাদের তালিকায় জায়গা করে নেন তিনি। এছাড়াও পুরো মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বমোট ৮টি গোল করেন রোনালদো। বলতে গেলে তার কল্যাণেই সেবার শিরোপা জেতে ম্যানইউ।

রোনালদোর উদযাপন; Image Source: 90Min

মস্কোতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে চেলসির মোকাবেলা করে রোনালদোর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। সেই ম্যাচে তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হন স্টেডিয়ামে থাকা প্রায় সবৃৃঐ দর্শক। ম্যাচের প্রথমার্ধে হেডের মাধ্যমে করা রোনালদোর গোলে এগিয়ে যায় ম্যানইউ। যদিও চেলসি গোল পরিশোধ করায় ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ায়। টাইব্রেকারে ৬-৫ গোলে চেলসিকে পরাজিত করে ম্যানইউ। এতে করে রোনালদো জেতেন ক্যারিয়ারের প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা।

আর্সেনালের বিপক্ষে সেমিফাইনালে জোড়া গোল (২০০৯)

২০০৮ সালে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার কারণে পরের বছর ব্যালন ডি’অর জেতেন রোনালদো। আর সেবারও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ধারাবাহিকভাবে পারফরম্যান্স উপহার দেন তিনি। তার পারফরম্যান্স নৈপুণ্যে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে পৌছায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।

রোনালদোর উদযাপন; Image Source: 90Min

যদিও দ্বিতীয়বার ফাইনাল নিশ্চিত করতে বেশ কণ্টকাকীর্ণ পথ পার করতে হয় তাদের। সেবার সেমিফাইনালে আর্সেনালের মুখোমুখি হয় ম্যানইউ। আর সেকেন্ড লেগে জোড়া গোল করে ইতিহাদকে স্তব্ধ করে দেন রোনালদো।

লা ডেসিমা (২০১৪)

২০০৯ সালে তৎকালীন দলবদল মৌসুমে সর্বোচ্চ দামে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমান ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কিন্তু রিয়ালে যোগ দেয়ার পর প্রতি মৌসুমে অনেক গোল পেলেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে দীর্ঘ ৪ মৌসুম অপেক্ষা করতে হয় তাকে। অন্যদিকে, ততদিনে সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার এক যুগ পার করে ফেলেছে রিয়াল।

জার্সি খুলে উদযাপনরত রোনালদো; Image Source: 90Min

কার্লো আনচেলত্তির হাত ধরে ২০১৩-১৪ মৌসুমে জ্বলে উঠেন রোনালদো। সেবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১৭ গোল করেন তিনি। ফাইনালে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে পেনাল্টিতে দলের চতুর্থ গোলটি করেন রোনালদো। গোল করার পর তার জার্সি খোলা উদযাপনটি এখনো স্মরণীয়। সেবার টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা নির্বাচিত হন তিনি। তার কল্যাণেই দীর্ঘ এক যুগ পর স্বপ্নের লা ডেসিমা জেতে রিয়াল।

পেনাল্টিতে জয়সূচক গোল (২০১৬)

২০১৪ সালে বহুলাকাঙ্ক্ষিত লা দেসিমা জেতার পরের মৌসুম রিয়ালের তেমন একটা ভালো কাটেনি। ট্রফিলেস থাকায় বহিষ্কৃত হন কার্লো আনচেলত্তি। কিন্তু তার জায়গায় নিয়োগ পাওয়া বেনিতেজের অধীনেও বেশ বাজেভাবে ২০১৫-১৬ মৌসুম পার করে রিয়াল। অতঃপর মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে এসে তাকে বহিষ্কার করে যুব দলের কোচ জিদানকে নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ।

২০১৬ সালে শিরোপা হাতে রোনালদো; Image Source: 90Min

জিদান যখন নিয়োগ পান তখন অবধি শুধুমাত্র চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ছাড়া বাকি সব টুর্নামেন্টের শিরোপা প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কিন্তু তার অধীনে আবারো ঘুরে দাঁড়ায় রিয়াল। রোনালদোও জ্বলে উঠেন আরো একবার। সেবার মিলানে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের মুখোমুখি হয় জিদানের রিয়াল মাদ্রিদ। ম্যাচের ফলাফল সেবার টাইব্রেকারে গড়ায়। হুয়ানফ্রান গোল করতে ব্যর্থ হওয়ায় জয়ের সম্ভাবনা প্রখর হয় রিয়ালের। আর ঠিক তখনি রিয়ালের হয়ে শেষ শটটি নিতে আসেন রোনালদো। তার জোরালো শট কোনোভাবেই রুখতে পারেননি ইয়ান অবলাক। জয় সূচক গোল করে জার্সি খুলে রোনালদোর সেই উদযাপন এখন অবধি রিয়াল ভক্তদের চোখে ভাসে।

বায়ার্নের বিপক্ষে পাঁচ গোল (২০১৭)

জিদানের অধীনে দ্বিতীয় মৌসুমে রোনালদো ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। বলতে গেলে গত দুই দশকে ২০১৬-১৭ মৌসুমটি ছিলো রিয়াল মাদ্রিদের সবচেয়ে সফল মৌসুম। সেবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখের মুখোমুখি হয় রিয়াল।

রোনালদোর উদযাপন; Image Source: StandardUk

বায়ার্নের নেতৃত্বে তখন রিয়ালের সাবেক কোচ কার্লো আনচেলত্তি। দুই লেগ মিলিয়ে বায়ার্নের জালে সর্বমোট ৬ বার বল জড়ায় রিয়াল। যার মধ্যে ৫টি গোলই করেন রোনালদো। সেই ম্যাচের দ্বিতীয় লেগে রোনালদো চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজের শততম গোল পূর্ণ করেন।

কার্ডিফে জুভেন্টাসের বিপক্ষে জোড়া গোল (২০১৭)

২০১৭ সালে টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পৌঁছায় রোনালদোর রিয়াল মাদ্রিদ। সেবারও তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। ফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিলো ২০১৫ সালের ফাইনালিস্ট জুভেন্তাস। আর এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় কার্ডিফে।

ম্যাচশেষে রোনালদোর উদযাপন; Image Source: 90Min

রিয়াল বনাম জুভেন্টাসের ম্যাচটি নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনা ছিলো তুঙ্গে। কিন্তু ফাইনালে পার্থক্যটা গড়ে দেন স্বয়ং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সেই ম্যাচে রিয়াল ৪-১ গোলে জেতে রিয়াল, যার মধ্যে ২টি গোলই করেন রোনালদো। ম্যাচ শেষে মাঠে হাঁটুগেড়ে বসে রোনালদোর উদযাপনটা এখন অবধি স্মরণীয়।

রিয়ালের হয়ে সেঞ্চুরি (২০১৮)

২০১৭ সালের এপ্রিলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজের শততম গোল পূর্ণ করেন। ভক্তরা তখনি বুঝেন রোনালদো এই মাইলফলক আরো অনেকদূর পর্যন্ত নিয়ে যাবেন। এক বছর পর ২০১৮ সালে রোনালদো আরো একটি রেকর্ডের মালিক হন। ২০১৭-১৮ মৌসুমে দ্বিতীয় রাউন্ডে পিএসজির মুখোমুখি হয় রিয়াল।

রোনালদোর উদযাপন; Image Source: 90min

দুই লেগ মিলিয়ে রিয়াল জেতে ৫-২ গোলের ব্যবধানে। যার মধ্যে রোনালদো একাই করেন ৩টি গোল। আর এতে করে রিয়ালের জার্সিতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে একশত গোল পূর্ণ করেন রোনালদো। এর আগে কোনো ফুটবলার একই ক্লাবের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে শত গোল করতে পারেননি।

জুভেন্টাসের বিপক্ষে দুর্দান্ত গোল (২০১৮)

গত মৌসুমে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা রিয়াল মাদ্রিদ কোয়ার্টার ফাইনালে ২০১৭ সালের ফাইনালিস্ট জুভেন্টাসের মুখোমুখি হয়। তুরিনে প্রথম লেগের ম্যাচটি রিয়াল জেতে ৩-০ গোলের ব্যবধানে। আর সেই ম্যাচে রোনালদো একটি অসাধারণ গোল করেন।

ঐতিহাসিক গোলটি; Image Source: ESPN

দানি কারভাহালের ক্রস থেকে ডি বক্সে শূণ্যে ভেসে একটি নান্দনিক বাইসাইকেল শটে গোল করেন রোনালদো। এই গোলের পর স্টেডিয়ামে থাকা সকল দর্শক তাকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানায়। রোনালদো এই গোলটিকে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা গোল হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তুরিনের দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক (২০১৯)

গত গ্রীষ্মকালীন দলবদলে রোনালদো যোগ দেন ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাসে। আর তুরিনে পাড়ি জমিয়ে ভক্তদের একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা উপহার দেবেন বলেও জানান রোনালদো। দ্বিতীয় রাউন্ডে জুভেন্টাসের প্রতিপক্ষ ছিলো স্প্যানিশ জায়ান্ট অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ। আর সেই সুবাদে প্রথম লেগটি ওয়ান্ডা মেট্রোপলিটানোতে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ০-২ গোলে পরাজিত হয়ে ফিরে আসে রোনালদোর জুভেন্তাস।

রোনালদোর উদযাপনের দৃশ্য; Image Source: Marca

কিন্তু মিডিয়া যখন জুভেন্টাসের বিদায়ের সংবাদ প্রচার করতে শুরু করে ঠিক তখনি জুভেন্টাসকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলবেন বলে ঘোষণা দেন রোনালদো। তুরিনে দ্বিতীয় লেগে ফুটবল বিশ্ব দেখে এক ভয়ঙ্কর জুভেন্টাসকে। যার নেতৃত্ব ছিলো রোনালদোর হাতে। একে একে তিনটি গোল করে জুভেন্টাসের জয় নিশ্চিত করেন তিনি। দুই লেগ মিলিয়ে ৩-২ গোলের ব্যবধানে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত হয় জুভেদের। অন্যদিকে, নিন্দুকদের আবারো নিজের প্রত্যাবর্তন জানান দেন রোনালদো।

Featured Image: Marca

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *