শেষ হতে চলেছে কুতিনহোর বার্সা অধ্যায়?

নেইমার বার্সেলোনা ছাড়ার পরপরই তার শূন্যতা পূরণ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। আর তার জায়গায় প্রথম পছন্দ হিসেবে তালিকার সবার উপরে ছিলেন আরেক ব্রাজিলিয়ান ফিলিপ কুতিনহো। তিনি তখন লিভারপুলের হয়ে দুর্দান্ত সময় পার করছিলেন। ফলে তাকে প্রথমে ছাড়তে চায়নি অলরেডরা। কিন্তু কুতিনহোর স্বপ্নের ক্লাব ছিল বার্সেলোনা। তবে শুধুমাত্র তিনি নন, বিশ্বের অধিকাংশ ফুটবলারের স্বপ্নের ক্লাব বার্সা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদ। ফলে কাতালান জায়ান্টরা যখন তার জন্য দাম হাঁকানো শুরু করে কুতিনহো তখন থেকেই ক্যাম্প ন্যুতে আসার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

ইয়ুর্গেন ক্লপ শুরু থেকেই কুতিনহোকে লিভারপুল না ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু কুতিনহোর সাবেক সতীর্থ লুইস সুয়ারেজ তাকে বার্সায় ভেড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বার্সা তাকে কেনার জন্য প্রথমে ১০৫ মিলিয়ন পাউন্ড দাম হাঁকায়। কিন্তু লিভারপুল বার্সার প্রস্তাবকে বারবার ফিরিয়ে দিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কুতিনহোর জন্য বার্সাকে ব্যয় করতে হয় ১৪২ মিলিয়ন পাউন্ড বা ১৬০ মিলিয়ন ইউরো। তিনি মূলত লিওনেল মেসি এবং লুইস সুয়ারেজের সাথে জুটি বেঁধে বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু বার্সার তারকাখচিত স্কোয়াড আর আর্নেস্তো ভালভার্দের ফুটবল দর্শনে কুতিনহো এখন পর্যন্ত নিজেকে বার্সার প্রথম একাদশে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেননি।

লিভারপুলের জার্সিতে কুতিনহো; Image Source: daily express

তিনি যে স্বপ্ন নিয়ে ন্যু ক্যাম্পে পা রেখেছিলেন তার অতি সামান্যই পূরণ হয়েছে। এবার তিনি নিজেকে ইউরোপের অন্য কোনো ক্লাবে দেখতে চান বলেই শোনা যাচ্ছে। বার্সায় ব্রাত্য হয়ে থাকলেও কুতিনহোকে কেনার জন্য ইউরোপের অনেক জায়ান্টই মুখিয়ে রয়েছে। গুঞ্জন উঠেছে আগামী গ্রীষ্মকালীন দলবদলের বাজারে তাকে বিক্রি করে দিতে পারে বার্সেলোনা। কুতিনহোর জন্য তারা ১০০ মিলিয়ন ইউরোর অধিক প্রস্তাব আসবে বলেই ধারণা করছে বার্সা। কুতিনহো নিজেও হয়তো আর কাতালান জায়ান্টদের হয়ে খেলতে চাইছেন না। কেননা গত মৌসুমে তিনি ২২ ম্যাচ খেলে ১০ করেছিলেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে একেবারেই খেলার সুযোগ পাচ্ছেন না এই ব্রাজিলিয়ান। এভাবে চলতে থাকলে তার ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়ে যাবে। লিভারপুলে ছিলেন উড়ন্ত ফর্মে, আর বার্সায় তিনি দলে জায়গা পেতেই লড়াই করছেন। কিন্তু কেন?

নির্দিষ্ট পজিশন না পাওয়া

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে কুতিনহো যখন অ্যানফিল্ড ছেড়ে ন্যু ক্যাম্পে আসেন তখন অনেকেই তার পজিশন নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তিনি বার্সার হয়ে কোন পজিশনে খেলবেন সেটা নিয়ে ভক্তদের আগ্রহের কমতি ছিল না। এই ব্রাজিলিয়ান তারকা অবশ্য আক্রমণভাগেন বহুমুখী এক খেলোয়াড়। লিভারপুলে থাকার সময় তিনি মিডফিল্ডের তিন পজিশনেই খেলেছেন। তবে বেশিরভাগ সময়ই তিনি বাম প্রান্তে খেলেছেন। যখন তিনি দেশের জার্সিতে খেলেন তখন তাকে মাঝখানে অথবা ডান প্রান্তে দেখা যায়। যাতে তিনি নেইমারের সাথে জুটি বেঁধে গোল করতে এবং করাতে পারেন।

কিন্তু কুতিনহোকে নিয়ে বার্সা কোচ ভালভার্দে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। তাকে বিভিন্ন পজিশনে খেলিয়েছেন। এবং গত মৌসুমে এই ব্রাজিলিয়ান তারকা নিজেকে নতুন নতুন অবস্থানে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেছেন। চলতি মৌসুমে ইনিয়েস্তা জাপানে চলে যাওয়ায় তার অবস্থান স্থায়ীভাবে মাঝমাঠে হবে এমনই ভেবেছিলেন অনেকে। মৌসুমের শুরুতে তাকে একটানা বেশকিছু ম্যাচে প্রথম একাদশে রাখা হয়। কিন্তু সেপ্টেম্বরে লিগানেসের কাছে হারের পুরো দায়ই যেন তার উপর চাপানো হয়। ভালভার্দে তখন থেকে কুতিনহোর পরিবর্তে উসমান ডেম্বেলের কথা ভাবতে থাকেন। এবং তার সেই ভাবনা থেকেই বার্সার প্রথম একাদশ থেকে ছিটকে পড়েন কুতিনহো।

বার্সার জার্সিতে কুতিনহো; Image Source: marca

তাকে প্রথম একাদশে না রাখার কারণ জানতে চাইলে ভালভার্দে সবসময়ই সংবাদমাধ্যমের কাছে বলে এসেছেন যে, ডেম্বেলে ও কুতিনহোর জন্য তিনি সমান সুযোগ দিবেন। কিন্তু তার কথাগুলো বাস্তবে রূপ নেয়নি। ২০১৯ সালে এখন পর্যন্ত বার্সার ১২ ম্যাচের মধ্যে মাত্র ১টি ম্যাচে ডেম্বেলে ও কুতিনহো একসাথে মাঠে নেমেছেন, যে ম্যাচে মেসিকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল। তিনি যখন বার্সার লেফট উইংয়ে খেলেছেন সেই ম্যাচগুলোতে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেছে বার্সা। যার প্রমাণ গত বছর বার্সার টানা নয় জয়। এর মধ্যে টটেনহাম ও রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষেও জয় ছিল।

গোলের পর কুতিনহোর উল্লাস; Image Source: Getty Images

নভেম্বরের শুরুতে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচ খেলতে গিয়ে চোটে পড়েন কুতিনহো। আর এই সময়ের মধ্যেই অভাবনীয় উত্থান ঘটে ফরাসি তারকা ডেম্বেলের। কুতিননহো মাঠে বাইরে থাকাকালীন চার গোল করেন ডেম্বেলে। পরবর্তীতে সাত ম্যাচে আরো তিনটি গোল করেন তিনি। ফলে বার্সার একাদশে স্থায়ী আসন গেড়ে বসেন ডেম্বেলে। বিপরীতে দলে জায়গা হারান কুতিনহো। যদিও চোটের আগে তিনি দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। কুতিনহো অবশ্য ডিসেম্বরে ভিলারিয়ালের বিপক্ষে প্রথম একাদশে ফিরেছিলেন, তবে সেটা লুইস সুয়ারেজের চোটের কারণে। যার ফলে তিনি পরের সপ্তাহেই দলে জায়গা হারান এবং টানা চারটি লিগ ম্যাচে সাইড বেঞ্চ গরম করেন।

অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস

কুতিনহো যখন লিভারপুল ছেড়ে বার্সায় যোগ দেন তখন তিনি ছিলেন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। তার ধারণা ছিল লিভারপুলের মতো বার্সায়ও তিনি লেফট উইংয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেবেন। এবং বাম প্রান্ত থেকে টপ কর্নারের দিকে নিজের ট্রেডমার্ক শটে স্প্যানিশ ফুটবল ভক্তদের মাতাবেন। আগের ক্লাবে থাকতে তিনি এই কাজটি নিয়মিতভাবে করতেন। সেই সাথে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিয়মিতভাবেই গোল করতে পারতেন।

ফিলিপ কুতিনহো; Image Source: Bein Sports

কিন্তু কুতিনহোর সকল আত্মবিশ্বাস ভালভার্দের ফুটবল কৌশলের কাছে ধীরেধীরে চূর্ণ হতে থাকে। বার্সা তাকে রেকর্ড পরিমাণ মূল্যে দলে ভেড়ায়। ফলে তার প্রতি প্রত্যাশার চাপ ছিল অনেক বেশি। কিন্তু তাকে নিয়ে কোচের অতিরিক্ত পরীক্ষার কারণে তিনি নিজের দিশা খুঁজে পাননি। সেই সাথে তিনি চোটের কারণে দল থেকে বাদ পড়া এবং ডেম্বেলের কাছে নিজের জায়গা হারানোর ফলে তিনি প্রচুর মানসিক চাপে পড়ে নিজের সহজাত ফুটবল খেলতে ব্যর্থ হন। বর্তমানে তিনি নিজে বার্সার ছাড়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে তাকে বার্সার পক্ষ থেকে বিক্রি করে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর তার জন্য গ্রীষ্মের দলবদল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

তার প্রতি আস্থা রয়েছে সতীর্থদের

মাঠের ফুটবলে কোচের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হলেও মাঠের বাইরে কুতিনহোকে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছেন সতীর্থ, বন্ধুবান্ধব এবং পরিবার। কুতিনহো তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে একসাথে থাকেন। সেখান থেকে তিনি মানসিকভাবে লড়াই করার শক্তি পাচ্ছেন। সেই সাথে বিপদের মুহূর্তে তাকে সঙ্গ দিতে ব্রাজিল থেকে উড়ে এসেছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও। ভালভার্দে তাকে দলে না রাখলেও মন থেকে যথেষ্ট ভালোবাসেন।

স্ত্রীর সাথে কুতিনহো; Image Source: Instagram

কুতিনহো বার্সায় যোগ দিয়েছিলেন সুয়ারেজ ও মেসির সাথে ত্রয়ী গড়তে। কিন্তু তাদের মধ্যে জোরালো কোনো বন্ধন তৈরি হয়নি। তবে মেসি ও সুয়ারেজের সাথে তার সম্পর্ক বেশ উষ্ণ। এছাড়া বার্সার ব্রাজিলিয়ান সতীর্থদের সাথে কুতিনহোর সম্পর্ক বেশ চমৎকার। সবাই তার পাশে থেকে হারানো আত্মবিশ্বাসকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

বার্সা অধ্যায় শেষ হওয়ার পথে

কুতিনহো যে স্বপ্ন নিয়ে বার্সায় এসেছিলেন, সেটি এখনো পূরণ হয়নি। কিন্তু এরপরও তিনি বার্সায় থেকে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বার্সা সম্ভবত তাকে ধরে রাখবে না। কারণ মৌসুম শেষে আয়াক্স থেকে ন্যু ক্যাম্পে যোগ দিবেন ফ্রাঙ্কি ডি ইয়ং। সেই সাথে আয়াক্সের আরেক তারকা মাথিস ডি লিগট ও আঁতোয়ান গ্রিজমানকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছে বার্সা। এই দুইজনকে দলে ভেড়ানোর জন্য বার্সা তার স্কোয়াড থেকে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে বিক্রি করে দিতে পারে। তাদের মধ্যে থাকতে পারেন কুতিনহো নিজেও।

কুতিনহো; Image Source: Getty Images

যদি তিনি বার্সা না ছাড়েন অথবা বিক্রি না করা হয়, তবু তার স্থায়ীভাবে প্রথম একাদশে থাকার সম্ভাবনা নেই। কারণ ডেম্বেলে বর্তমানে চোটে থাকলেও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মাঠে আগেই তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি তিনি এই ম্যাচের আগে সুস্থ না হতে পারেন তবে রিয়াল বেটিসের বিপক্ষে তাকে দেখা যেতে। এছাড়া তার প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে রয়েছেন আর্তুরো ভিদাল। ফলে বার্সার বড় ম্যাচগুলোতে কুতিনহোর দলে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। সেই সাথে পরবর্তী মৌসুমে তার দলে জায়গা পাওয়া আরো কঠিন হবে। ফলে সম্ভবত তার বার্সা অধ্যায় চলতি মৌসুমেই শেষ হতে চলেছে। কুতিনহো যখন বার্সায় আসেন তখন বলেছিলেন,

বার্সাকে ‘হ্যাঁ’ বলা খুবই সহজ।

কুতিনহো কী পারবেন এখন অতি সহজে বার্সাকে বিদায় বলতে?

Featured Image: Getty Images

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *