মুখোমুখি বায়ার্ন-বরুশিয়া: আজই নিশ্চিত হতে পারে লিগ চ্যাম্পিয়ন

ফুটবল ভক্তদের কাছে জার্মান লিগ রীতিমতো বায়ার্ন লিগ হিসেবেই পরিচিত। রেকর্ড ৩৩ বারের চ্যাম্পিয়ন বাভারিয়ানরা। মাঝে অনেকেই হুঙ্কার দিতে চায়। শালকে জিরো ফোর কিংবা বেয়ার লেভারকুসেন হঠাৎ আলো ছড়ালেও বায়ার্নই শেষ পর্যন্ত লিগ শিরোপা হাতে উল্লাস করে। লিগে বায়ার্নের প্রতিপক্ষ বলতে একটা দলই। দূরের ডর্টমুন্ড শহরের ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ড। কিন্তু ডর্টমুন্ড যেন হ্যালির ধুমকেতু। এই এলো আর এই হারালো।

অ্যালিয়াঞ্জ এরিনায় আজ মুখোমুখি ডর্টমুন্ড ও বায়ার্ন মিউনিখ; Image source: stadium business

২০১২ সালের এপ্রিল মাস। লিগের ২৯ তম ম্যাচ । বায়ার্ন ডাগআউটে অভিজ্ঞ ইয়ুপ হেইঙ্কেস আর মাঠে একঝাঁক পরীক্ষিত মুখ। অন্যদিকে ডর্টমুন্ডের ভরসা পাগলাটে এক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ, নিজেদের ডেরা সিগনাল ইদুনা পার্ক আর তরুণ কিছু মুখ। লিগে তখন এগিয়ে আছে বরুশিয়া ৩ পয়েন্টে। ৭৭ মিনিটে লেভানডফস্কির গোলের পর নাটক জমালেন আরিয়েন রোবেন। ৮৬ মিনিটের ডাইভে পেলেন পেনাল্টি। কিন্তু সেদিনটা অন্তত বায়ার্নের ছিল না। আগের ৭ পেনাল্টিতে সফল রোবেন মিস করলেন। ডর্টমুন্ড ডিফেন্ডার সুবোটিচ এসে ভেংচি কেটে জবাব দিলেন নিজের মত করে।

পূর্বসূরীর হয়ে সুবোটিচের জবাব; Image source: goal.com

গল্পটা আরেকটু পেছানো যাক। ১৯৯৫-৯৬ মৌসুম। সেবারও লিগ শিরোপার দৌড়ে ডর্টমুন্ড আর বায়ার্ন। ডর্টমুন্ড তখনো বড় দল না। সাফল্য সূর্য কেবল উঁকি দিচ্ছে শহরটায়। সেবার পেনাল্টি পেয়েছিল ডর্টমুন্ড। মিস করেছিলেন আন্দ্রেস মোলার। আর কান্না করা শিশুর মত তাকে কিছু একটা বুঝিয়েছিলেন কিংবদন্তি লোথার ম্যাথিউস। সেই দুবারই কিন্তু লিগ টাইটেল হাতছাড়া করে বায়ার্ন। বুন্দেসলিগার শিরোপা গেল বুরুশিয়া ডর্টমুণ্ডের কাছে। 

মোলারকে ম্যাথিয়াসের ব্যঙ্গ করা সেই মুহুর্ত; Image source: gettyimages

ডর্টমুন্ডের বড় দল হয়ে ওঠা এবং ডের ক্লাসিকার

একই শব্দটা অন্যান্য দেশে হয় ক্লাসিকো নামে। এল ক্লাসিকো, সুপার ক্লাসিকো এমনই। কেবল জার্মানিতে এসেই শব্দটা হয়ে গেলো ক্লাসিকার। শব্দের মতই একটু ভিন্ন এদের খেলাটাও। রিভারপ্লেট আর বোকা জুনিয়ার্সের খেলা হয় সমানে সমানে। রিয়াল বার্সাও শেষ অব্দি টেক্কা দেয় একে অন্যের সাথে। কিন্তু একটা বড় সময় পর্যন্ত ডের ক্লাসিকার ফেভারিট কেবলই বায়ার্ন। ১৯৬৫ সাল থেকেই শুরু ইতিহাসের। বায়ার্ন জমিদারিতে যেন স্বাধীন কৃষক বুরুশিয়া ডর্টমুন্ড। কিন্তু বাভারিয়ানদের সামনে টেকা বড় দায়। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত তেমনই ছিল চিত্র। দুই দলের শত্রুতা একেবারেই চরমে ছিল সেসময়।

জার্মান লিগের বড় আকর্ষণ ডের ক্লাসিকার; Image source: miasanmontreal

১৯৯৫ আর ১৯৯৬ দুইবারই অটোমার হেজফিল্ডের অধীনে লিগ টাইটেল নিজেদের করে নিলো বুরুশিয়া ডর্টমুন্ড। বায়ার্ন লিগ শেষ করলো একবার ছয়ে থেকে আরেকবার পজিশন ছিল দুই। এরপর ১৯৯৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতলেও জার্মান লিগ শিরোপা আর ঘরে তোলেনি ডর্টমুন্ড। লিগ শিরোপা ফিরে যায় নিজের ঠিকানা মিউনিখ শহরে। এরপর ১৯৯৯, ২০০০ আর ২০০১ সালেও বায়ার্ন জিতে নিয়েছিল বুন্দেসলিগা শিরোপা। বুরুশিয়া নিজেদের কাছে আবার লিগ টাইটেল পায় ২০০২ সালে। সেই শিরোপা আবার ফিরে পায় ইয়ুর্গেন ক্লপের অধীনে ২০১১ আর ২০১২ সালে।

ডের ক্লাসিকার ২০১৯

নতুন দিনের বুরুশিয়া ডর্টমুন্ড

বেলায় বেলায় পেরিয়েছে অনেকগুলো দিন। হারিয়ে যাওয়া যাদের অভ্যাস তারা হারিয়েই গেলো। ক্লপের পর ডর্টমুন্ডকে স্বপ্ন দেখাতে পারেননি কেউই। অথচ সুযোগ যে ছিল না তা নয়। দলে ছিলেন লেভানডফস্কি, রয়েস, শিনজি কাগাওয়া বা মারিও গোটশে, মাটস হুমেলস। কিন্তু হয়ে হয়েও হয়নি। উপরন্তু হলুদ কালো শিবির থেকে বায়ার্নে গিয়েছেন লেভানডফস্কি, গোটজা আর হুমেলস। গোটশে ফিরে এসে আবার জুটি বাঁধলেন রয়েসের সাথে।

নতুন দিনের বুরুশিয়া ডর্ট্মুন্ড; Image source: reuters

বুড়ো কাগাওয়া এখনো আছেন দলে। ২০১৯ সালে তাদের দলে কোচ হয়ে এলেন লুচিয়ান ফ্যাভ্রি। আর এসেই করলেন দারুন কিছু সাইনিং। বার্সেলোনা থেকে নিয়ে এলেন অপাংক্তেয় পাকো আলকাসেরকে। পাকো আছেন দারুণ ফর্মে। গত ম্যাচেও নব্বইয়ের ঘরে দুই গোলে ম্যাচ জিতিয়েছেন ডর্টমুন্ডকে। বুন্দেসলিগা ইতিহাসে বদলি নেমে তার চেয়ে বেশি গোল আর কারোরই নেই।

উইটসেল আর রয়েস আজকের বড় ভরসা; Image source: goal.com

ফ্যাভ্রির দলে এলেন ম্যানচেস্টার সিটির একাডেমিতে গড়া জেডন সানচো। সতীর্থ ফিল ফোডেন যেখানে বেঞ্চ গরম করছেন সেখানে সানচো এখন ইউরোপের বড় দলের রীতিমতো আরাধ্য এক উইঙ্গার। মাঝেমাঠে গোটজার বিকল্প হিসেবে হাল ধরতে আসলেন অ্যালেক্স উইটসেল। আর রয়েসের হাতে পাকাপাকি ভাবে উঠল আর্মব্যান্ড। ইনজুরি প্রবণ ছেলেটা তরুণ হলেও এখনই ডর্টমুন্ডের মহানায়ক হবার পথে।

নিকো কোভাচের পথহারা বায়ার্ন

জাবি আলোনসো আর ফিলিপ লাম গেলেন। গেলেন ইয়ুপ হেইঙ্কেস। সেই সাথে বায়ার্নের লালেও ছিল রঙ উঠে গেলো। মুলার, বোয়াটেং, থিয়াগো আলকান্তারা, হামেস রদ্রিগেজরা আছেন। আছেন নতুন জার্মানির নতুন লাম জশুয়া কিমিচ । সেই সাথে নিকোলাস সুল। আর পোস্টের নিচে বিশ্বস্ত ম্যানুয়েল নয়্যার। তবু নিকো কোভাচের দলে কিছু একটা নেই। পথ হারানো এক পথিকের মতই ঘুরছিল বায়ার্ন মিউনিখ। মাঝপথে ডর্টমুন্ড পয়েন্ট হারালে সেখান থেকে লিগে ফিরে আসার শুরু করে বাভারিয়ানরা।

বায়ার্নের এমন রূপ এই মৌসুমে ছিল বেশ অচেনা; Image source: spox.com

কিন্তু সেও ক্ষণিকের জন্য। ডর্টমুন্ডেরই সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ নিকো কোভাচকে দেখিয়ে দিলেন বায়ার্নের দুর্দশা। যেই অ্যালিয়াঞ্জ এরিনায় পা রাখতেই সবার দম আটকে সেই মাঠেই বায়ার্ন হারলো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচ। শেষ ষোলতেই শেষ জার্মান চ্যাম্পিয়নদের যাত্রা। লিগে ২য় অবস্থানে থেকেও তাই শান্তি নেই মিউনিখ শহরে। 

তরুণ বায়ার্ন মিউনিখ; Image source: spox.com

২৭ ম্যাচ শেষে আপাতত পয়েন্ট ব্যবধান মাত্র দুই। এই ম্যাচেই শিরোপায় এক হাত রাখতে পারে ডর্টমুন্ড। আবার ফিরে এসে লিগ জমাতে পারে বায়ার্ন মিউনিখও।

কেমন হতে পারে আজকের একাদশ

ফ্যাভ্রির সহজ গণিত

দলের ব্যাপারে ডর্টমুন্ড কোচ লুচিয়ান ফ্যাভ্রি গণিতের এক শিক্ষক। হাতে কেবল একটাই সূত্র। তাতেই মিলিয়ে নিতে হবে পুরো হিসেব। গেল সপ্তাহেই বাবা হওয়া মার্কো রয়েস দলে ফিরবেন এটা ৯০ শতাংশ নিশ্চিত। দলের ফরমেশন বরাবরের মতই ৪-২-৩-১ হবে। আলকাসের, সানচো আর রয়েসের সাথে উপরের দিকে থাকবেন ব্রন লারসেন। মিডফিল্ডে বড় কাজের কাজি বরাবরের মতই অ্যালেক্স উইটসেল আর থমাস ডেলানি।

দুরন্ত ফর্মে থাকা পাকো আলকাসের; Image source: dw

মৌসুমে দারুণ ছন্দে আছে বুরুশিয়ার আক্রমণভাগ। পাকো আলকাসেরের এমন ফর্ম দেখে বরং হা হুতাশ করছেন বার্সার সমর্থকরা। মেসির অনুপস্থিতিতে এই খুনে আলকাসেরই হতে পারতেন দলের ত্রাতা। তেমনিভাবে জেডন সানচোকে দেখে আক্ষেপে পুড়ছেন সিটির সমর্থক গোষ্ঠীতে। কাচা হীরেটাই কিনা ছিনিয়ে নিল জার্মানির দলটি। এই মৌসুমে ১৩ অ্যাসিস্টের সাথে সাথে ৮ গোলও করেছেন সানচো। আর আলকাসের ফর্ম আরো ঈর্ষণীয়। ২১ ম্যাচে তার গোল ১৬ টি।

ডর্টমুন্ড বস লুচিয়ান ফ্যাভ্রি; Image source: dw

আর নীরবে দলের বড় কাজ করে চলেছেন অধিনায়ক মার্কো রয়েস। অধিনায়ক আর্মব্যান্ড পাবার পর এই মৌসুমে ২২ ম্যাচে তার গোল ১৫ টি। সাথে আছে ৬ অ্যাসিস্ট।

নিকো কোভাচের কঠিন রসায়ন

ডর্টমুন্ডের এই ব্যাপক সম্ভাবনার বিপরীতে একটু পিছিয়ে বায়ার্ন মিউনিখ। নয়্যারের ইনজুরিতে এই ম্যাচে মাঠে নামতে পারেন স্যাভন উলরিচ। ডিফেন্সে অভিজ্ঞ আলাবার পাশাপাশি মাঝমাঠে ক্রিশ্চিয়ান তুলিসো আর আক্রমণের আরিয়েন রোবেনও থাকছেন না আজকের খেলায়। ফরমেশন সাজাতে তাই নিকো কোভাচের কাজ রসায়নবিদের মত। পরীক্ষা নিরীক্ষা আর সম্ভাবনার খেলায় যেকোন কিছুই হতে পারে।

বায়ার্ন কোচ নিকো কোভাচ; Image source: bayern.com

দলের বড় ভরসা সাবেক ডর্টমুন্ড তারকা পোলিশ স্ট্রাইকার লেভানডফস্কি। ২৬ ম্যাচে ৭ অ্যাসিস্টের সাথে করেছেন মোট ১৯ গোল। ফরমেশন হিসেবে ৪-৩-৩ করতে গেলে খানিক সমস্যা পোহাতে হবে কোভাচকে। গ্যাব্রি, রিবেরি, গোরেৎজকা সহ বেশ কিছু বিকল্প থাকলেও কারো ট্যালিই খুব বেশি আশা জোগাবে না বাভারিয়ান শিবিরে। গ্যাব্রি, হামেস দুজনেরই গোল ৭ টি। হামেস এবং রিবেরি যদি আক্রমণের তিন হয়ে থাকেন তবে সমস্যায় পড়বেন আরেক অভিজ্ঞ সেনানী মুলার।

বায়ার্নের বড় অস্ত্র রিবেরি এবং লেভানডফস্কি; Image source: 90min

দলে তাই হয়ত এক স্ট্রাইকার হিসেবে নামবেন লেভানডফস্কি। আর ৪-২-৩-১ ফরম্যাটে ৩ এ থাকবেন মুলার, রিবেরি এবং হামেস। মিডফিল্ড সামলাতে পারেন থিয়াগো আলকান্তারা। ডিফেন্সে বড় ভরসা বোয়াটেং এবং হামেলস। আর বায়ার্নের হয়ে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের মালিক জশুয়া কিমিচ তো থাকছেনই।

ডের ক্লাসিকারে মুখোমুখি দুই মাস্টারমাইন্ড; Image source: bundesliga

ডর্টমুন্ড যেন ভবঘুরে এক ছেলে। এই এসেছে আর এই হারিয়ে গেলো। ২০১৯ সালটা ঠিক তেমনই। হঠাৎ ফিরে এলো অনেকটা দিন পর। ডর্টমিন্ড কি পারবে এবার? নাকি জার্মান কাপ আর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ হারানো বায়ার্ন রিবেরি রোবেনকে বিদায় দিবে লিগ টাইটেল সহ? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে অ্যালিয়াঞ্জ এরিনার রাত সাড়ে দশটার ম্যাচ শেষে।

Feature Image : miasanmontreal

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *