বিদেশী লিগে সাফল্য পাওয়া আট ব্রিটিশ কোচ

একজন ব্রিটিশ কোচ অন্য কোন দেশের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে দলের জন্য হাত নাড়ছেন এমন দৃশ্য বেশ বিরল। ব্রিটিশ ফুটবলার হোক বা ব্রিটিশ খেলোয়াড়, ইংল্যান্ডের বাইরে তাদের যাতায়াত একেবারেই সীমিত ছিল সবসময়। গ্যারি লিনেকার ছাড়া বার্সাতে যেমন কোন ব্রিটিশ থিতু হতে পারেননি তেমনিভাবে রিয়ালে গিয়ে অনুজ্জ্বল ছিলেন ডেভিড বেকহাম। যদিও বর্তমানে সময় কিছুটা হলেও বদলেছে। জেডন সানচো বুন্দেসলিগা কাঁপিয়েছেন দারুণভাবে। খেলোয়াড়দের মাঝে অল্প কিছুটা বিদেশী লিগে যাবার প্রবণতা শুরু হলেও এখন পর্যন্ত কোচদের মাঝে খুব বেশি তা দেখা যায়নি।

ইংলিশ কোচ টেরি ভেনাবেলস; image source – bbc.com

এখন পর্যন্ত খুব কম সংখ্যক কোচ অবশ্য নিজেদের বিদেশের লিগে চিনিয়েছেন বেশ ভালভাবে। বাইরের দেশের লিগে সাফল্য পাওয়া তেমন আট বিদেশী কোচের পরিচয় দেখে নিন এক নজরে

৮. গ্রাহাম পটার

সুইডিশ ক্লাব অস্টারসান্ডের ২০১৭ সালের চমক জাগানিয়া উত্থান যার হাত ধরে তিনি গ্রাহাম পটার। অস্টারসান্ডের ডাগআউটে পটার প্রথম এসেছিলেন ২০১০ সালে। দল তখন সুইডিশ লিগের চতুর্থ বিভাগে রীতিমতো ধুঁকছিলো। কিন্তু তার যোগদানের পরপরই রীতিমত বদলে যায় দৃশ্যপট। একের পর এক লিগ জিততে শুরু করেন গ্রাহাম পটার। ২০১৫ সালে ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবারের মত অস্টারসান্ড চলে আসে সুইডেনের শীর্ষ লিগে।

ব্রাইটন কোচের দায়িত্বে আসতে যাচ্ছেন পটার; image source – gettyimages

২০১৭ সালে অস্টারসান্ড জিতে নেয় সুইডিশ কাপের শিরোপা। একই সাথে অর্জন করে ইউরোপা লিগে খেলার যোগ্যতা। ইউরোপা লিগে এসে তারা চমকে দেয় সবাইকে পাওক এফসি এবং গ্যালাতাসারাই এর মতো ক্লাবকে পিছনে ফেলে চলে যায় পরের রাউন্ডে। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ আর্সেনাল। আর্সেনালও রক্ষা পায়নি গ্রাহাম পটারের ব্রিটিশ ম্যাজিক থেকে। ঘরের মাঠ এমিরেটসে আর্সেনাল হেরে বসে ২-১ গোলে। যদিও নিজেদের মাঠে ৩-০ গোলের হারে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় অস্টারসান্ড।

৭. গ্রায়েম সোনেস

টার্কিশ লিগে ফেনেরবাখ আর গ্যালাতাসারাই এর মধ্যেকার তুমুল প্রতিদ্বন্দীতা আর বুনো সমর্থন অনেকসময় টেক্কা দেয় মিলান ডার্বি কিংবা এল ক্লাসিকোকে। সেই লিগে গ্রায়েম সোনেস গ্যালাতাসারাই কোচ হয়ে ফেনেরবাখের মাঠে মাঝখানে পুঁতে এসেছিলেন ক্লাবের নিজস্ব পতাকা। নিজের দলের প্রতি কতখানি বিশ্বাস থাকলে একজন কোচ এমন করতে পারেন তা তলিয়ে দেখার বিষয়। গ্যালাতাসারাইতে নিজের ক্যারিয়ারে টার্কিশ কাপ এবং সুপার কাপের শিরোপা জয় করেন ব্রিটিশ কোচ গ্রায়েম সোনেস।

সোনেস যখন গ্যালাতাসারাই কোচ; Image source – telegraph.co.uk

পরে ১৯৯৭ সালে ইতালিয়ান ক্লাব তুরিনোতে গেলেও স্বাধীনতা না থাকায় মাত্র ৪ মাসেই চাকরি ইস্তফা দেন তিনি। সেখান থেকে সোনেসের ঠিকানা হয় পর্তুগালের ক্লাব বেনফিকায়। বেনফিকায় গিয়ে বেশ কজন ইংলিশ খেলোয়াড় দলে ভেড়ালেও তরুণ ডেকোকে শাইন করাননি তিনি। যার মূল্য পরে বেশ ভালই দিয়েছে দলটি।

৬. ভিক বাকিংহ্যাম

কোচিং ক্যারিয়ারে ভিক বাকিংহ্যাম বেশ অনেক দলেই নিজের জাত চিনিয়েছেন। তিনিই প্রথম ব্রিটিশ কোচ যিনি ইংল্যান্ডের বাইরে কোন দলের ডাগআউটে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৫৯ সালে তিনি নেদারল্যান্ডসের দল আয়াক্স আমস্টারডামের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আয়াক্সের হয়ে তিনি জয় করেন ডাচ কাপ এবং এরেদিভিসি (ডাচ ঘরোয়া লিগ) টাইটেল। যদিও আয়াক্সে তার বড় সাফল্য কোন ট্রফি জয় করা নয় বরং ইয়োহান ক্রুয়েফকে বিশ্বের দরবারে চিনিয়ে দেয়া।

ক্রুয়েফ গুরু ভিক বাকিংহ্যাম; Image source – 101 great goals

বাকিংহ্যাম পরবর্তীতে স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনার দায়িত্ব নেন। বার্সার সেসময় ক্রান্তিকাল বলা চলে। রেলিগেশন জোন থেকে মাত্র একধাপ উপরে ছিল তারা। সেই দলকে প্রথম মৌসুমে তিনি এনে দেন কোপা দেল রে শিরোপা। বার্সেলোনা লিগ শেষ করে ২য় হয়ে। সেটিও পয়েন্ট ব্যবধানে নয় বরং চ্যাম্পিয়ন ভ্যালেন্সিয়ার সাথে হেড টু হেডে পিছিয়ে থাকার কারণে।

৫. টেরি ভেনাবেলস

টেরি ভেনাবেলস একবারই কেবল ব্রিটেনের বাইরে কোচিং করিয়েছেন এবং সেটি বার্সেলোনাতেই। ১৯৮৪-৮৫ মৌসুমে দায়িত্ব নিয়েই বার্সাকে লা লিগা শিরোপার স্বাদ দেন ভেনাবেলস। পরের বছর বার্সেলোনা চলে যায় ইউরোপিয়ান শিরোপার একেবারেই কাছাকাছি। ১৯৬১ সালের সেবারই প্রথম ইউরোপিয়ান মঞ্চে ফাইনালে যায় বার্সেলোনা। কিন্তু তাতে পেনাল্টিতে স্টুয়া বুখারেস্টের কাছে হেরে বসে দলটি।

বার্সা ডাগআউটে টেরি ভেনাবেলস; Image source – gettyimages

নিজের তৃতীয় মৌসুমেও সাফল্য পেয়েছিলেন টেরি ভেনাবেলস। লিগ কাপ জয়ের পাশাপাশি দলে নিয়ে আসেন গ্যারি লিনেকার এবং মার্ক হিউজেসের মত দারুণ কিছু খেলোয়াড়।

৪. রয় হজসন

এই তালিকায় থাকা কোচদের মাঝে যারা সবচেয়ে বর্ষীয়ান এবং চেনা মুখ নিঃসন্দেহে রয় হজসন। একসময় ইংল্যান্ড জাতীয় দলেরও দায়িত্ব নিয়েছিলেন হজসন। বেশ কিছু দলে ডাগআউটে ছিলেন এই কোচ। সাফল্যও তার হাতে এসেছিলো নিয়মিত ভাবে।

রয় হজসনের ইংল্যান্ডের বাইরে প্রথম দল ছিল সুইডেনের হামস্টাড। ১৯৭৬ এবং ১৯৭৯ সালে হামস্টাডের হয়ে সুইডিশ লিগের শিরোপা জয় করেন হজসন। ১৯৮০ সালে সুইডিশ ২য় বিভাগের দল ওরেব্রোতে যোগ দিয়ে ১৯৮৪ সালে ২য় বিভাগ শিরোপা জয় করেন তিনি।

ইংল্যান্ডের কোচ হয়ে রয় হজসন; Image source – gettyimages

তবে নিজের সেরা সাফল্য তিনি পেয়েছেন মালমো এফসির হয়ে। টানা ৫ বার সুইডিশ লিগের শিরোপা জয় করেন তিনি।

৩. জন টোশাক

ইংল্যান্ডের বাইরে জন টোশাকের সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। ১৯৮৭ সালে রিয়াল সোসিয়াদাদের হয়ে জয় করেন কোপা ডেল রে শিরোপা। এটি ছিল সোসিয়াদাদের ইতিহাসে ২য় শিরোপা। স্পেনে রিয়াল সোসিয়াদাদ ছাড়া রিয়াল মুর্সিয়া এবং দেপোর্তিভোর কোচও ছিলেন জন টোশাক।

যদিও স্পেনে তার বড় অর্জন রিয়ালের কোচ হয়ে ১৯৮৯-৯০ মৌসুমের লিগ শিরোপা জয় করা। রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে মোট ৩ বার আলাদা আলাদা ভাবে দায়িত্ব নিলেও সাফল্য ছিল ওই এক মৌসুমেই। ১৯৯৫ সালে দেপোর্তিভোর হয়ে জয় করেন স্প্যানিশ সুপার কাপ। 

সাইডলাইনে উত্তেজিত জন টোশাক; Image source – gettyimages

স্পেনে  ব্যাপক সাফল্যের পর জন টোশাকের ঠিকানা হয় তুরস্কে। বেসিকতাসের সাইডলাইন থেকে ১৯৯৭-৯৮ সালে টার্কিশ কাপের শিরোপাও জয় করেন এই ইংলিশম্যান।

২. স্টিভ ম্যাক্লেরেন

নেদারল্যান্ডে এফসি টুয়েন্টির হয়ে দুবার এবং জার্মানিতে ওলফসবার্গের হয়ে একবার মোট তিন দফায় ইংল্যান্ডের বাইরে কোচিং করিয়েছেন স্টিভ ম্যাক্লেরেন। কিন্তু সাফল্য পেয়েছেন কেবল এফসি টুয়েন্টির হয়ে।

স্টিভ ম্যাক্লেরেন; Image source – gettyimages

এফসি টুয়েন্টির ইতিহাসে প্রথম এরেদিভিসি (ডাচ ঘরোয়া লিগ) শিরোপা আসে ম্যাক্লেরেনের হাত ধরেই। ১৯৯৬ সালে ববি রবসনের পোর্তোর হয়ে ঘরোয়া লিগ জয়ের পর তিনিই প্রথম ব্রিটিশ কোচ যিনি ইংল্যান্ডের বাইরে এমন সাফল্য অর্জন করেছেন।

১। ববি রবসন

ববি রবসনকে নিয়ে একটি কথাই বলা চলে – কিংবদন্তী। ইংল্যান্ড তো বটেই, ইংল্যান্ডের বাইরে পিএসভি, পোর্তো এবং বার্সেলোনাতেও দুহাত ভরে সাফল্য পেয়েছেন ববি রবসন।

পিএসভিতে থাকাকালীন সময়ে ১৯৯০-৯১ এবং ১৯৯১-৯২ মৌসুমে ইরেডভিসিই শিরোপা হাতে তোলেন রবসন। সেই সাথে ইয়োহান ক্রুয়েফ শিল্ডও (সুপার কাপ) আসে তার হাতে। এরপর তিনি চলে যান পর্তুগালে। সেখানে ১৯৯৪ এবং ১৯৯৬ সালে লিগ টাইটেলের পাশাপাশি পর্তুগিজ কাপ এবং সুপার কাপের শিরোপাও জয় করেন এই কিংবদন্তী।

বার্সা কোচ হয়ে ববি রবসন; Image source – these football times

বার্সেলোনা এসেই তিনি দলে ভেড়ান ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী রোনালদো কে। বার্সা অধ্যায়ে রবসন নিজের নামের পাশে যুক্ত করেন একটি কোপা ডেল রে, একটি স্প্যানিশ সুপার কাপ এবং ইউরোপিয়ান সুপার কাপ। বার্সেলোনায় থাকা অবস্থায় তিনি নির্বাচিত হন ‘ইউরোপিয়ান ম্যানেজার অফ দ্য ইয়ার’।

Feature Image – These football times

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *