ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যবধানের পাঁচটি জয়

বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ফুটবল ভক্তদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবলের খোরাক মিটিয়ে আসছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। ইপিএলে অংশ নেওয়া প্রায় প্রতিটি দলই শক্তি সামর্থ্যের দিক থেকে প্রায় সমান। অন্যান্য লিগে একটি বা দুটি দলের আধিপত্য থাকলেও, ইংলিশ লিগে সেই সুযোগ নেই। এখানে শিরোপা জিতলে হলে প্রতিটি দলকেই অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। লা লিগায় ঘুরেফিরে শিরোপা জয় করে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা নয়তো অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। কিন্তু ইপিএলে বড় ছয় দল অর্থাৎ ম্যানইউ, ম্যানসিটি, আর্সেনাল, চেলসি, টটেনহাম ও লিভারপুলের বাইরেও অন্যান্য দলগুলোকে শিরোপার হিসাবনিকাশ থেকে দূরে রাখা একেবারেই অসম্ভব।

১৮৮৮ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ চালু হয়। সত্তর ও আশির দশকে ইউরোপিয়ান ফুটবলে ইংলিশ লিগের দলগুলো সাফল্য পেলেও তখনো লিগ হিসেবে ইতালিয়ান সিরি আ ও লা লিগার পেছনেই ছিল ইংলিশ লিগ। সেই কারণে ঘরোয়া ফুটবলের মান উন্নয়নের জন্য ১৯৯২ সালে প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগকে প্রিমিয়ার লিগ হিসেবে রূপান্তর করে ইংল্যান্ডের ফুটবল ফেডারেশন। তখন থেকে প্রতি মৌসুমে ২০ দলের অংশগ্রহণে জমজমাট ফুটবল লিগ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ইপিএলের ২৭ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৩ বার শিরোপা জিতেছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। আর গোল সংখ্যার দিকে সবার উপরে রয়েছেন অ্যালান শিয়ারার। আজকের আলোচনায় থাকছে ইপিএল ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যবধানের পাঁচটি জয়।

চেলসি বনাম অ্যাস্টন ভিলা (৮-০)

২০১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর অ্যাস্টন ভিলার মুখোমুখি হয় রাফায়েল বেনিতেজের চেলসি। কোচ হিসেবে চেলসির ডাগআউটে এটি ছিল তার নবম ম্যাচ। আর সেই ম্যাচেই অ্যাস্টন ভিলাকে বিধ্বস্ত করে ৮-০ ব্যবধানে জয় পায় নীল জার্সিধারীরা। চেলসির ১১ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ৭ জনই গোলদাতার তালিকায় নাম লেখান।

গোলের সূচনা করেন স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ফার্নান্দো তোরেস। ম্যাচের তিন মিনিটের মাথায় গোল করে করে দলকে এগিয়ে দেন তোরেস। এরপর ২৯ মিনিটে ফ্রি কিক থেকে অসাধারণ এক গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ব্রাজিলিয়ান তারকা ডেভিড লুইজ। পাঁচ মিনিট পর দলের হয়ে তৃতীয় গোল করেন ব্রানিস্লাভ ইভানোভিচ। তিন গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় স্বাগতিক চেলসি।

গোলের পর চেলসির খেলোয়াড়রা; Image Source: PA

বিরতি থেকে ফিরে আসার পর অ্যাস্টন ভিলার তরুণ খেলোয়াড়রা বেশ কিছু সময় চেলসিকে গোল দেওয়া থেকে বিরত রাখেন। কিন্তু ৫৯ মিনিটে তাদের রক্ষণভাগ চেলসিকে আটকাতে আবারো ব্যর্থ হয়। ৫৯ মিনিটে গোল করে নিজের ৫০০তম ইপিএল ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখেন ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড। এরপর ৭৫ আবারো গোল করে ব্যবধান ৫-০ তে নিয়ে যান রামিরেস। ৭৯ মিনিটে ও ৮৩ মিনিটে আরো দুইটি গোল পায় চেলসি। যোগ করা সময়ে অ্যাস্টন ভিলার জালে সর্বশেষ বলটি পাঠান রামিরেস।

চেলসি বনাম উইগান অ্যাথলেটিক (৮-০)

২০১০ সালে প্রিমিয়ার লিগ জয়ের পথে এগিয়ে ছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও চেলসি। আগের ম্যাচে স্টোক সিটিকে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলে এগিয়ে যায় রেড ডেভিলরা। ফলে লিগের শেষ ম্যাচে উইগানের বিপক্ষে জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না ব্লুজদের। তখন চেলসির কোচ ছিলেন কার্লো আনচেলেত্তি। তার সামনে তখন কোচ হিসেবে প্রথম মৌসুমেই চেলসিকে শিরোপা জেতানোর বড় এক সুযোগ। তিনি সেটাকে পুরোপুরি কাজে লাগান। তার মন্ত্রবলে শিষ্যরা বড় জয় তুলে নেয়। এর মধ্য দিয়ে ২০০৬ সালের পর আবারো শিরোপা ঘরে তোলে চেলসি।

উইগানকে হারিয়ে চেলসির শিরোপা জয়; Image Source: goal.com

ম্যাচের ছয় মিনিটের মাথায় দলের হয়ে শুভসূচনা করেন নিকোলাস আনেলকা। তার গোলেই এগিয়ে যায় চেলসি। ৩১ মিনিটে গ্যারি ক্যাল্ডওয়েল বক্সের মধ্যে ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখেন। এরপর পেনাল্টি থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ল্যাম্পার্ড। ৫৪ মিনিটে চেলসির হয়ে তৃতীয় গোল করেন আইভরিয়ান তারকা সালোমন কালু। দুই মিনিট পরেই নিজের দ্বিতীয় গোল করেন আনেলকা। এরপর ম্যাচের সবটুকু আলো কেড়ে নেন দিদিয়ের দ্রগবা। হ্যাটট্রিক করে দলকে শিরোপা জেতানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে ২০০৯-১০ মৌসুমে ইপিএলের গোল্ডেন বুট জয় করেন। চেলসির হয়ে সর্বশেষ গোলটি করেন অ্যাশলে কোল।

টটেনহাম বনাম উইগান অ্যাথলেটিক (৯-১)

২০০৯ সালের ২২ নভেম্বর ঘরের মাঠে হোয়াইট হার্ট লেনে উইগান অ্যাথলেটিককে আতিথ্য দেয় টটেনহাম। জার্মেইন ডিফোয়ের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে ভর করে উইগানের বিপক্ষে ৯-১ গোলের বড় জয় পায় স্বাগতিকরা। ডিফোয়ে একাই করেন পাঁচ গোল। ম্যাচের নয় মিনিটের মাথায় প্রথম গোল করেস পিটার ক্রাউচ। এরপর প্রথমার্ধে আর কোনো দলই গোল পায়নি।

সেই ম্যাচের স্কোরবোর্ড; Image Source: weatealltropies.com

কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সাত মিনিটের মধ্যে ডিফোয়ে তিন গোল করেন। ৫১ মিনিট থেকে ৫৮ মিনিটের মধ্যে গোল তিনটি করেন এই ইংলিশ তারকা। এর মাঝে অবশ্য এক গোল পরিশোধ করে উইগান। তাদের হয়ে গোলটি করেন অস্ট্রিয়ান তারকা পল শানার। যদিও তার গোলটি ছিল বিতর্কিত। তবে উইগান আর কোনো গোল করতে না পারলেও টটেনহাম আরো পাঁচবার প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ায়। এর মধ্যে ডিফোয়ের ছিল দুইটি। বাকি তিনটি গোল আসে অ্যারন লেনন, ক্রিস কির্কল্যান্ড ও নিকো ক্রানচারের পা থেকে।

নিউক্যাসেল ইউনাইটেড বনাম শেফিল্ড ওয়েনেসডে (৮-০)

১৯৯৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঘরের মাঠে শেফিল্ড ওয়েনেসডের মুখোমুখি হয় নিউক্যাসেল ইউনাইটেড। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সফল খেলোয়াড় অ্যালান শিয়ারারের একক নৈপুণ্যে বড় জয় পায় স্বাগতিক দল। শিয়ারার একাই করেন পাঁচ গোল। বিপরীতে সফরকারী দলের কোনো খেলোয়াড়ই গোলের তালিকায় নাম লেখাতে পারেননি।

অ্যালান শিয়ারার; Image Source: sportskeeda

ম্যাচের ১১ মিনিটের মাথায় প্রথম গোল করেন অ্যারন হিউজেস। এরপর প্রথমার্ধেই ব্যবধান ৪-০ করেন শিয়ারার। ৩০, ৩৩ ও ৪২ মিনিটে গোল করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন শিয়ারার। দ্বিতীয়ার্ধের তিন মিনিটের মাথায় দলের হয়ে পঞ্চম গোল করেন কিয়েরন ডায়ার। এরপর ৭৮ মিনিটে ষষ্ঠ গোলটি করেন গ্যারি স্পিড। তারপর আবারো শিয়ারার ম্যাজিক। ৮১ ও ৮৪ মিনিটে তার দুই গোলের উপর ভর করে ৮-০ গোলের বড় জয় পায় নিউক্যাসেল।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বনাম ইপসউইচ টাউন (৯-০)

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যবধানের জয়ের সাথে জড়িয়ে আছে সবচেয়ে সফল ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের নাম। ১৯৯৫ সালের ৪ মার্চ ঘরের মাঠ ওল্ড ট্রাফোর্ডে ইপসউইচ টাউনকে ৯-০ ঘরে হারিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করে রেড ডেভিলরা, যা ইপিএলের অন্য কোনো দল আজো ভাঙতে পারেনি। সেই ম্যাচে ম্যানইউর হয়ে একাই পাঁচ গোল করেন অ্যাশলে কোল।

গোলের পর অ্যাশলে কোল; Image Source: manchestereveningnews.co.uk

ম্যাচের ১৫ মিনিটের মাথায় প্রথম গোল করেন রয় কিন। এরপর ২৩, ৩৬ ও ৫২ মিনিটে টানা তিন গোল করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন কোল। ৫৩ ও ৫৮ মিনিটে দুই গোল করে ব্যবধান ৬-০ তে নিয়ে যান মার্ক হিউজেস। ৬৪ মিনিটে নিজের চতুর্থ গোল করেন কোল। ৭২ মিনিটে দলের অষ্টম গোলটি করেন পল ইন্স। খেলা শেষ হওয়ার তিন মিনিট আগে নিজের পঞ্চম এবং দলের নবম গোলটি করেন অ্যাশলে কোল।

Featured Image Source: manchestereveningnews.co.uk

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *