পজিশন বদলে ক্যারিয়ার পার করা ১১ ফুটবলার

একজন ফুটবলারের সবচেয়ে বড় গুণ সম্ভবত দলের প্রয়োজনে নিজেকে যেকোনো পজিশনে খেলতে পারা। যেকোনো কারণে ডিফেন্স, অ্যাটাক বা মিডফিল্ডে নেমে ব্যবধান গড়ে দেয়ার মতো প্রতিভা নিয়ে কেউই মাঠে নামতে পারেন না। কিন্তু সচরাচর এমন পজিশনিং, বিল্ড আপ সেন্স এবং খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মত খেলোয়াড় দেখা যায় না। খুব কম সংখ্যক খেলোয়াড়ই ছিলেন যাদের পুরো ফুটবল ক্যারিয়ার কেটেছে মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে। দলের প্রয়োজনে তারা একেকজন ছিলেন যাযাবর ফুটবলার হয়ে।

১১. অ্যান্ডারসন

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার অ্যান্ডারসন নিজের পজিশন কি হবে সে নিয়ে খুব সম্ভব নিজেই জানতেন না। নিজের সেরা সময় তিনি কাটিয়েছেন ইংল্যান্ডের মাটিতে। গুছিয়ে বললে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে কিংবদন্তী স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে পা রাখার পর ফার্গুসন তাকে নিয়ে আসলেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে। কখনো কখনো ছিলেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবেও।

ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার অ্যান্ডারসন; Image Source: Gettyimages

কয়েক মৌসুম পরেই তিনি হয়ে গেলেন বক্স টু বক্স খেলোয়াড়। নিজের পজিশনে তাকে আরেকটু ছাড় দিলেন ফার্গি। কিন্তু অ্যান্ডারসনের উত্থান ছিল উইঙ্গার হিসেবে। ম্যানচেস্টারের লাল দুর্গে পা রাখবার আগে ব্রাজিলের গ্রেমিও আর পর্তুগালের ক্লাব পোর্তোয় তিনি ছিলেন নিখাদ এক উইঙ্গার।

১০. হাভিয়ের মাশ্চেরানো

জার্সিতে যখন মেরুন আর নীল মাশ্চেরানো তখন পুরোদস্তুর ডিফেন্ডার। জার্সি যখন আকাশি আর সাদা তখনি মাশ্চেরানো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। ২০১০ সালে লিভারপুল ছেড়ে বার্সায় নাম লেখাবার সময় বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিলেন আর্জেন্টাইন তারকা হাভিয়ের মাশ্চেরানো। কিন্তু ন্যু ক্যাম্পে পা রাখার পরই রীতিমতো সেন্টার ব্যাক হয়ে গেলেন মাশ্চেরানো।

হাভিয়ের মাশ্চেরানো; Image Source: Gettyimages

পরবর্তীতে অবশ্য সেন্টার ব্যাক হয়েই বার্সা ক্যারিয়ারে ব্যাপক অবদান রেখেছেন তিনি।

৯. অ্যালান স্মিথ

সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড অ্যালান স্মিথের ক্যারিয়ারেও বড় রদবদল ঘটিয়েছিলেন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন। নিজের শহরের ক্লাব লিডস ইউনাইটেডে ফরোয়ার্ড হিসেবে সাফল্য লাভের পর ম্যানইউতে পা রেখেছিলেন স্মিথ। সেখানেও তার শুরুটা হয়েছিল ফরোয়ার্ড হিসেবেই।

ম্যানইউ জার্সিতে অ্যালান স্মিথ; Image source – these football

কিন্তু সময় বদলাতেই স্মিথকে সামনের সারি থেকে সরিয়ে আনলেন ফার্গি। ইউনাইটেড কিংবদন্তী রয় কিনের ভবিষ্যৎ উত্তরসূরী হিসেবেই তাকে দেখতে চেয়েছিলেন দ্য গ্রেট ফার্গুসন। যদিও শেষ পর্যন্ত স্মিথ সে আশা খুব ভালভাবে পূরণ করতে পারেননি।

৮. ডিওন ডাবলিন

তার ক্যারিয়ার নিয়ে বলা চলে মরু থেকে মেরু। ৯০ এর দশকের শেষ অংশ থেকে ২০০০ এর গোঁড়ার দিকে ডাবলিন ছিলেন প্রতিপক্ষের ডিবক্সের কাছে নিয়মিত মুখ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, কভেন্ট্রি সিটি আর অ্যাস্টন ভিলায় ছিলেন সহজাত গোল স্কোরার।

গোলের পর ডিওন ডাবলিন; Image source: pinterest

কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষভাগে এসে বিপরীত চিত্রটাও দেখলেন ডিওন ডাবলিন। লেস্টার সিটি, নরউইচ সিটি আর সেল্টিকে তিনি ছিলেন ডিফেন্ডার হিসেবে। তবে পুরাতন অভ্যাস যেমন ছাড়া হয়নি, তেমনি অভ্যস্ত হতে পারেননি নতুন রূপেও। ডিফেন্ডার হয়েও প্রায়ই উপরে উঠে গোল করেছেন ডাবলিন। ফলে ডিফেন্সে ভুল বেড়েছে। সম্ভাবনার ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে একেবারেই নিভৃতে।

৭. রবিন ভ্যান পার্সি

চলতি মৌসুমেই বুটজোড়া তুলে রেখেছেন নিজের সময়ের সেরা এই ফরোয়ার্ড। আর্সেনালের জার্সিতে হয়েছেন প্রিমিয়ার লীগের সেরা খেলোয়াড়, হয়েছেন মৌসুম সেরা। ম্যানইউ’র জার্সিতে পেয়েছেন লিগ টাইটেলের শিরোপাও। ২০১৪ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে তার গোল আর অনেকগুলো ভক্তদের মাঝে বিস্ময় জাগিয়ে যাবে।

প্রিমিয়ারলীগ কিংবদন্তী রবিন ভ্যান পার্সি; Image Source: Gettyimages

আর ভ্যান পার্সির সব সাফল্য শুরু হয়েছিল নিজের পজিশন বদলে নেবার পর থেকে। আর্সেনালে আসার আগে ছিলেন পুরোদস্তুর লেফট উইঙ্গার। কিন্তু সেখান থেকেই তাকে সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে নিয়ে আসেন কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার। একই কাজ ওয়েঙ্গার করেছিলেন থিয়েরি অঁরির ক্ষেত্রেও। বলাই বাহুল্য ভ্যান পার্সির ক্যারিয়ারে সেটিই ছিল বড় পদক্ষেপ।

৬. মুসা ডেম্বেলে

মুসা ডেম্বেলের ফুটবল পজিশনিং খুবই আকর্ষণীয়। পুরোদস্তুর এই মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ারে এখনো পর্যন্ত স্থিরতা আসেনি। মিডফিল্ডার হয়েও নিজের অ্যাটাকিং গুণের কারণে প্রায়ই তাকে প্লেমেকার বা অ্যাটাকিং পজিশনে দেখা যায়। মূলত অ্যাটাকিং থার্ডেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য করেন এই বেলজিয়ান।

মুসা ডেম্বেলে; Image source: pinterest

এবং মজার কথা হলো মুসা ডেম্বেলে সত্যিকার অর্থেই ফরোয়ার্ড হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। সাবেক ক্লাব হিসেবে জার্মানির ব্রেস্কট, উইলেম টু এবং এজেড পার্মায় খেলেছেন ফরোয়ার্ড হয়েই। কিন্তু প্রিমিয়ার লীগের ফুলহ্যাম এবং বর্তমানে টটেনহ্যামে তিনি আছেন মিডফিল্ডার পজিশনে।

৫. জন চার্লস 

কিংবদন্তী জন চার্লস তার বিশাল দেহের কারণে সেন্টার ব্যাক এবং সেন্টার ফরোয়ার্ড দুই পজিশনেই অনবদ্য ছিলেন। বর্ণিল ক্যারিয়ার শেষের সময় ভক্তরা তাকে মনে রেখেছিল তার অ্যাটাক এবং ডিফেন্সের অসাধারণ সমন্বয়ের কারণে।

দীর্ঘকায় ফরোয়ার্ড জন চার্লস; Image Source: Gettyimages

৫০ এবং ৬০ এর দশকের দিকে খেলা জন চার্লস লিডস ইউনাইটেড এবং ইতালিয়ান জায়ান্ট জুভেন্টাস দুই ক্লাবেই ছিলেন ফরোয়ার্ড হিসেবে। দুই ক্লাব মিলিয়ে তার গোলের সংখ্যা ছিল ২০০ এর বেশি। আবার পজিশন বদলে ডিফেন্সে চলে আসার পর দীর্ঘ শরীরের জন্য এরিয়াল ডুয়েলে বল জিতে নেয়া কিংবা ডিফেন্স লাইনে প্রবল শক্তিমত্তার পরিচয় দেয়া দুই ক্ষেত্রেই ছিলেন সফল।

৪. বাস্তিয়ান শোয়েনস্টাইগার

পুরো ক্যারিয়ারে দুহাত ভরে সাফল্য পেয়েছেন। নামের পাশে সম্ভাব্য সব ট্রফিই আছে তার। জার্মানির শেষ স্বর্ণালী সময়ে তিনিই ছিলেন অধিনায়ক। ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা সময় খেলেছেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে। ২০১৪ বিশ্বকাপে সেন্ট্রাল মিডে মেসিকে আটকে দেয়া দারুণ সব প্রেসিং আজো আর্জেন্টাইন ভক্তদের দুঃস্বপ্ন।

জার্মান জার্সিতে বাস্তিয়ান; Image source: DNA India

অথচ মিউনিখের একাডেমী থেকে মূল দলে শোয়েইনি এসেছিলেন ওয়াইড মিডফিল্ডার হিসেবে। মাঠের ডান বা বাম পাশেই মূলত খেলতেন বাস্তিয়ান। কিন্তু কালের পরিক্রমায় হয়ে যান পুরোদস্তুর সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। আর তাতেই পেয়েছিলেন একের পর এক সাফল্য।

৩. আন্দ্রেয়া পিরলো

ইতালিয়ান মিডফিল্ডার পিরলোকে মনে রাখার মতো বলতে গেলে দুটো ম্যাচই যথেষ্ট। ২০০৬ বিশ্বকাপে সেমিতে জার্মানির বিপক্ষে আগুন ঝড়া পারফর্ম আর ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার ম্যাচ গড়ে দেয়া। ফাইনালে সেন্ট্রাল মিডফিল্ড পজিশন থেকে ইতালির প্রতিটা আক্রমণের মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন পিরলো। ডেভিড ত্রেজেগে আর অঁরির মাঝে দেয়াল হিসেবে দাঁড়িয়ে ইতালিকে এনে দিয়েছিলেন বিশ্বকাপ শিরোপাও।

ইতালিয়ান কিংবদন্তী আন্দ্রেয়া পিরলো; Image source: alphacoders

যদিও সেন্ট্রাল মিডে অন্তত অতি মানবীয় সেই পারফর্ম করার কথাই ছিল না পিরলোর। ১৯৯৫ সালে ব্রেসিয়ায় অভিষেক হওয়া পিরলো ছিলেন মূলত অ্যাটাকিং প্লেয়ার। প্লে মেকার হিসেবে তিনি খেলতেন ফরোয়ার্ডদের ঠিক নিচে। পিরলোকে বলা চলে সাপোর্টিং ফরোয়ার্ড। কিন্তু ১৯৯৮ সালে ইন্টার আর ২০০১ সালে এসি মিলানে ট্রান্সফার হবার পরই পজিশন নিচে নামাতে বাধ্য হন পিরলো।

২. থিয়েরি অঁরি

ফ্রান্স থেকে তাকে আর্সেন ওয়েঙ্গার উড়িয়ে এনেছিলেন লেফট উইঙ্গার হিসেবে। ১৯৯৯ সালে ট্রান্সফারের ঠিক আগে ১৯৯৮ সালেই তিনি জিতে নিয়েছিলেন বিশ্বকাপ শিরোপা। কিন্তু ওয়েঙ্গারের ভাবনা ছিল অন্যরকম। অঁরিকে নিয়ে আসলেন সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে। পরবর্তীতে ওয়েঙ্গারের দলে আসেন নেদারল্যান্ডের ডেনিস বার্গক্যাম্প। পরের কয়েক বছর অঁরি বার্গক্যাম্প জুটি প্রিমিয়ার লীগে রীতিমতো রাজত্ব করেছিল। ২০০৪ সালে অঁরির দুরন্ত সুবাদের ফলে আর্সেনাল ভক্তদের উপহার দিয়েছিল ইনভিন্সিবল সিজন।

থিয়েরি অঁরি; Image Source: Gettyimages

অঁরি পরে বার্সায় গিয়েছিলেন। সেন্টার ফরোয়ার্ড হয়ে জিতেছিলেন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। মেসি ইতো আর অঁরি হয়ে উঠেছিলেন লা লিগার নতুন আতঙ্ক।

১. লোথার ম্যাথিউস

সর্বকালের সেরাদের নাম করতে গেলে লোথার ম্যাথিউস একজন হিসেবে অবশ্যই থাকবেন। তাকে বাদ দিয়ে জার্মানির ফুটবলের গল্প করা চলে না। নিজের সময়ের সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় হিসেবে জার্মান ফুটবলের হাল ধরেছিলেন ম্যাথিউস। ১৯৯০ বিশ্বকাপজয়ী জার্মান দলে তিনি ছিলেন অধিনায়ক। খেলেছেন বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে। মিডফিল্ডে তার কার্যকারীতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মত সক্ষমতা ছিলো না কারোরই। ঘরোয়া লিগে বায়ার্নের হয়েও পেয়েছেন অগণিত সাফল্য।

লোথার ম্যাথিউস; Image Source: Gettyimages

কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে এসে হঠাৎ নিজেকে বদলে ফেলেন ম্যাথিউস। মিডফিল্ড থেকে সরে এসে চলে এলেন সুইপার রোলে। সুইপার রোলে সাধারণত খেলা হয় ডিফেন্স লাইনে কিংবা ডিপ মিডফিল্ডে। আক্রমণে উঠে যাওয়া নয় বরং ডিফেন্ডারকে সাহায্য করাই এই পজিশনের মূল লক্ষ্য। লোথার ম্যাথিউস সফল ছিলেন সেই পজিশনেও।

Feature Image – alphacoders

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *