ক্রিকেট বিশ্বকাপের বিশেষ রেকর্ড সমূহ

দরজায় কড়া নাড়ছে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ। এবার ক্রিকেটের সর্ববৃহৎ এই কার্নিভাল বসবে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের মাটিতে। আগের ১১টি আসরের মধ্যে সর্বোচ্চ পাঁচবার শিরোপা জিতেছে অস্ট্রেলিয়া। দুইবার করে জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ভারত। বাকি দুইবার শিরোপা ভাগ করে নিয়েছে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান। বিশ্বকাপের এই ১১টি আসরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য রেকর্ড। তার মধ্য থেকে আজ আমরা বিশেষ কিছু রেকর্ড নিয়ে আলোচনা করবো।

হ্যাটট্রিকের সংখ্যা মোট নয়টি

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সর্বমোট নয়টি হ্যাটট্রিক হয়েছে। এরমধ্যে শ্রীলঙ্কান পেসার লাসিথ মালিঙ্গা একাই দুইটি হ্যাটট্রিকের মালিক। ২০০৭ বিশ্বকাপে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৪ বলে ৪ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড সৃষ্টি করেন। একদিনের ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত মোট ৪৬টি হ্যাটট্রিক হয়েছে। তবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে চতুর্থ বিশ্বকাপ পর্যন্ত। ১৯৮৭ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম হ্যাটট্রিক করেন ভারতীয় বোলার চেতন শর্মা। তিন কিউই ব্যাটসম্যান কেন রাদারফোর্ড, ইয়ান স্মিথ এবং এউইন চ্যাটফিন্ডকে আউট করে চেতন শর্মা এই রেকর্ড গড়েন।

পরবর্তী দুই বিশ্বকাপে কোন হ্যাটট্রিকের দেখা মেলেনি। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানি বোলার সাকলাইন মুশতাক জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন। তার এই হ্যাটট্রিকে ভর করে পাকিস্তান সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয়। ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে লঙ্কান পেসার চামিন্দা ভাস বাংলাদেশের বিপক্ষে আকর্ষণীয় এক হ্যাটট্রিক করেন। ইনিংসের প্রথম তিন বলে ৩ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি।

হ্যাটট্রিক করার পর মালিঙ্গা; Image Source: ICC

তবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে নাটকীয় হ্যাটট্রিকের জন্ম দেন আরেক শ্রীলঙ্কান পেসার লাসিথ মালিঙ্গা। ২০০৭ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হয় তার দল। শ্রীলংকার দেওয়া ২১০ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শেষ ৩২ বলে প্রোটিয়াদের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৪ রান। তাদের হাতে তখনও ৫ উইকেট। সেই মুহূর্তে মালিঙ্গা ৪ বলে ৪ উইকেট নিয়ে শ্রীলঙ্কাকে জয়ের আশা জাগান। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার ৯ নম্বর ব্যাটসম্যান রবিন পিটারসেন বাউন্ডারি মেরে দলের জয় নিশ্চিত করেন এবং মালিঙ্গা প্রথম হ্যাটট্রিক ম্যান হিসেবে পরাজিত দলে নাম লেখান।

তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে মূল্যবান হ্যাটট্রিকের মালিক দক্ষিণ আফ্রিকান বোলার জেপি ডুমিনি। ২০১৫ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনি হ্যাটট্রিক করেন। তার হ্যাটট্রিকে ভর করে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে জয়ের দেখা পায় প্রোটিয়ারা। এবং এই হ্যাটট্রিকটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে নকআউট পর্বের একমাত্র হ্যাটট্রিক।

বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ জয় পাওয়া দল

নিউজিল্যান্ড এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। গত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো তারা ফাইনাল খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। কিন্তু ফাইনালে প্রতিবেশী রাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে শিরোপা খোয়ায় তারা। কিউইরা কোনো বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও একটি অনন্য রেকর্ডের মালিক তারা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে কিউইরা সর্বোচ্চ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড গড়েছে। এখন পর্যন্ত তারা মোট ৬২টিটি বিশ্বকাপ ম্যাচ জিতেছে। তাদের পরেই অবস্থান করছে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়া জয় পেয়েছে মোট ৪৮টি ম্যাচে।

২৩৭ রান করে মাঠ ছাড়ছেন মার্টিন গাপটিল; Image Source: ICC

মোট ১১ বিশ্বকাপের মধ্যে ৭টিতে অংশগ্রহণ করেছে কিউইরা। বিশ্বকাপের বেশ কিছু ব্যক্তিগত রেকর্ডের মালিক নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা। ১৯৯২ বিশ্বকাপে মার্টিন ক্রো রেকর্ড ১১৪ গড়ে ব্যাটিং করে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট এর পুরস্কার জিতে নেন। তার উত্তরসূরি মার্টিন গাপটিল ২০১৫ বিশ্বকাপে ২৩৭ রানের দানবীয় এক ইনিংস খেলেন। সেই সাথে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ৫৪৭ রান সংগ্রহ করেন। বোলারদের মধ্যে বামহাতি বলার জিওফ অ‍্যালট এবং ট্রেন্ট বোল্ট ‘৯৯ ও ২০১৫ বিশ্বকাপে যথাক্রমে ২০ ও ২৩ টি করে উইকেট নিয়েছেন।

টাই হওয়া ম‍্যাচের সংখ্যা চার

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত মোট চারটি ম্যাচ টাই হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ম্যাচেই জড়িয়ে রয়েছে ‘চোকার’ দক্ষিণ আফ্রিকার নাম। এবং এই দুই ম্যাচে টাই করার কারণে তাদেরকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। প্রথমবারের মতো ম্যাচ টাই হয় ১৯৯৯ বিশ্বকাপে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে অ্যালান ডোনাল্ডের ভুল সিদ্ধান্তে কপাল পোড়ে প্রোটিয়াদের। পরের বিশ্বকাপে মার্ক বাউচার এক রান নিতে অস্বীকার করার পরপরই বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টি আইনে ম্যাচ টাই হলে বিদায় নিতে হয় দক্ষিণ আফ্রিকাকে। দুইটি ম্যাচেই বিপরীত প্রান্তে ব্যাটসম্যান হিসেবে ল্যান্স ক্লুজনার। অপর দুটি ম্যাচ টাই করেছে ভারত ও ইংল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ড।

সর্বাধিক শিরোপা জয়ী খেলোয়াড়

অ্যাডাম গিলক্রিস্ট তার ক্যারিয়ারে তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন (১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭)। তিনটি আসরেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে শিরোপা জয়ের হ্যাটট্রিক করেছে অস্ট্রেলিয়া। গিলক্রিস্টের পাশাপাশি রিকি পন্টিং ও গ্লেন ম্যাকগ্রাও এই রেকর্ডের অংশীদার। তবে গিলক্রিস্ট একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ১৫টির বেশি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন। এর মধ্যে মাত্র দুইটি ম্যাচে হেরেছেন। এদিকে তার সতীর্থ ম্যাথু হেইডেন, ব্রাড হগ এবং অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচেই হার দেখেননি।

অ্যাডাম গিলক্রিস্ট; Image Source: Getty Images

অস্ট্রেলিয়ার দুর্দান্ত এই পারফরম্যান্সের কারণে অন্যান্য দলের কিংবদন্তি খেলোয়াড়রা শিরোপা জিততে ব্যর্থ হয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ব্রায়ান লারা, জ্যাক ক্যালিস ও স্টিভ টিকোলোর মতো তারকারা। তবে এই তিনজনের কেউই দলের হয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে পারেননি। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ছয়টি বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ডের মালিক শচীন টেন্ডুলকার ও জাভেদ মিঁয়াদাদ। তারা দুজনেই একবার করে বিশ্বকাপ জিতেছেন। ১৬ জন খেলোয়াড় পাঁচটি করে বিশ্বকাপ খেলেছেন। তার মধ্যে আট জন বিশ্বকাপ জিততে পারেননি।

চ্যাম্পিয়ন দল থেকে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি

মাত্র দুইটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন দল থেকে। ১৯৭৯ বিশ্বকাপে ক্যারিবিয়ান তারকা গর্ডন গ্রিনিজ আর ২০০৭ বিশ্বকাপে ম্যাথু হেইডেন এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। হেইডেন মোট ৬৫৯ রান করেন। কিন্তু তিনি ফাইনালে ছিলেন নিষ্প্রভ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনি মাত্র ৩৮ রান করে আউট হন। চলতি শতকের বাকি তিন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি। এবং তারা ফাইনালে ছিলেন একদম ফ্লপ। ২০০৩ সালের ফাইনালে টেন্ডুলকার মাত্র ৪ রান করেন। ২০১১ ও ২০১৫ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক দিলশান ও গাপটিল ফাইনালে বাজে পারফর্ম করেন এবং তাদের দলও পরাজিত হয়।

গর্ডন গ্রিনিজ; Image Source: Getty Images

এদিক থেকে বোলারদের পরিসংখ্যান একেবারেই ভিন্ন। ১১টি বিশ্বকাপের মধ্যে সাতবার চ্যাম্পিয়ন দলের বোলাররা সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হয়েছেন। ১১ আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি বোলারদের মধ্যে ৬ জনই বামহাতি পেসার। এদের মধ্যে রয়েছে ওয়াসিম আকরাম, জহির খান, মিচেল স্টার্ক ও ট্রেন্ট বোল্ট।

Featured Image: Getty Images

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *