চলতি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড কেন ফেবারিট এবং তাদের রুখতে পারবে কারা?

শুরু হয়ে গেছে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ আসর ক্রিকেট বিশ্বকাপ। এটি একদিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপের ১২তম আসর। এবারের আসরে অংশগ্রহণ করছে আইসিসির পূর্ণাঙ্গ দশটি সদস্য দেশ। রাউন্ড রবিন লিগ ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ। তাই এবারের লড়াইটা হবে বেশ হাড্ডাহাড্ডি, তাতে কারো মনে সন্দেহ থাকার কথা নয়। প্রতিটি দলই তাদের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়েই প্রতিপক্ষের সাথে লড়বে। যে দলটি ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে পারবে সে দলই শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরিধান করবে।

তবে ক্রিকেট পাড়ার সকল ক্রিকেট বোদ্ধাদের আলোচনা/সমালোচনায় চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে ফেবারিট দলের তকমাটি স্বাগতিক ইংল্যান্ডেরই। ফেবারিটের তালিকায় অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে ভারত, অস্ট্রেলিয়া এমনকি অনেক ক্রিকেট বোদ্ধাদের মতে বাংলাদেশও এবার চমক দেখাতে পারে। কিন্তু ঘুরে ফিরে সবার নজর কেনই বা ইংল্যান্ডের দিকে যাচ্ছে? অথচ গত বিশ্বকাপে দলটি গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে গিয়েছিল।

গত বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সাথে ইংল্যান্ড; Image Source: Sydney Morning Herald

২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর থেকে ইংল্যান্ড তাদের দলে এনেছে আমূল পরিবর্তন। যেই পরিবর্তনের সুবাদে বর্তমানে ইংল্যান্ড ওডিআইতে বিশ্বের এক নম্বরে অবস্থান করছে এবং বিশ্বকাপেও ফেবারিট দল হিসেবে শীর্ষে রয়েছে স্বাগতিক এই দলটি। ইংল্যান্ড কি চলতি বিশ্বকাপে সত্যিই ফেবারিট? তারা কেনই বা সকলের কাছে সেরা দল হিসেবে বিবেচ্য হচ্ছে? বা এই বিশ্বকাপে তাদের কী কী ভুল হবার সম্ভাবনা রয়েছে? বা কোন দল তাদেরকে রুখে দেবার সামর্থ্য রাখে?

বিশ্বের এক নম্বর, তাই সবচেয়ে ফেবারিট?

বর্তমান আইসিসি ওডিআই র‍্যাংকিং শীর্ষে থাকা ইংল্যান্ড শুধু কথায় নয় বরং সকল পরিসংখ্যানে অন্যান্য দলের থেকে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে । ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর থেকে চলতি বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত তারা যতগুলো ম্যাচ খেলেছে তার মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ অথাৎ ৭০.৭% ম্যাচ তারা জিতে নিয়েছে। যেখানে ভারত ৬৫.৯% ও দক্ষিণ আফ্রিকা ৬৪.৪% ম্যাচে জয়লাভ করে।

শতকরা হিসেবে ম্যাচ জয়ের পরিসংখ্যান; Image Source: BBC

তাই নিশ্চিত ভাবেই স্বাগতিক দল হিসেবে ইংল্যান্ডকে অন্যতম ফেবারিট দল হিসেবে গণ্য করা যায়। তবে এর আগেও তারা চারবার তাদের মাটিতে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আয়োজন করে কিন্তু বরাবরই তারা ব্যর্থ হয় বিশ্বকাপ ছোঁয়ার স্বপ্ন পূরণে।

ইংল্যান্ডের আগ্রাসন ও উদ্ভাবন

২০১১ সালের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল এবং ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড। যা তাদের জন্য সত্যিই বেমানান ছিল। মূলত তখনকার সময়ে ইংল্যান্ডের খেলার ধরন বর্তমানের আধুনিক ক্রিকেটের সাথে বেশ অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

সেই অবস্থা হতে দলকে ভালো একটি পর্যায়ে আনতে দলের বৈপ্লবিক একটি পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। যা ইংল্যান্ড টিম ম্যানেজমেন্ট বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিল। দলের পরিবর্তনের জন্য তারা তাদের ব্যাটিং ও বোলিং সেকশনে বেশকিছু বিশ্বমানের প্লেয়ারদেরও দল থেকে বাদ দিতে দ্বিধাবোধ করেনি। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অ্যান্ডারসন, ব্রড, বেল ও ট্রেডওয়েলের মতো খেলোয়াড়রা।

নতুন ভাবে দলকে সাজাতে নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যাটিংয়ে তারা হয়ে উঠে বেশ আক্রমণাত্মক এবং বোলিং শেকশনে আনে বৈচিত্র্য। যা গত চার বছরে তাদের মধ্যে নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর পরিবর্তন এনে দেয়। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর ইংল্যান্ড এতোটাই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেছে যে তাদের থেকে দ্রুত ও বেশি রান আর কোনো দলই করতে পারেনি।

ওভার প্রতি রান তোলার গড়; Image Source: BBC

গত বার বছরে ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা গড়ে প্রতি ওভারে ৬.২৯ রান তুলে যেখানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়া তুলে ৫.৭২ রান করে এবং তৃতীয় স্থানে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা তুলে ৫.৭১ রান করে।

শুধু কী তাই? গতবছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটে এক ইনিংসে দলীয় সর্বোচ্চ ৪৮১/৬ রানের রেকর্ড পরিমাণ স্কোরটিও ইংল্যান্ডের। এমনকি গত চার বছরে ওয়ানডে ক্রিকেটে একাধিকবার ৪০০+ রান করা একমাত্র দলও ইংল্যান্ড। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর পাঁচটি দলীয় সর্বোচ্চ স্কোরের চারটিই ইংল্যান্ডের দখলে।

বিশ্বের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ব্যাটসম্যান রয়েছে ইংলিশদের

ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে রান তোলার গতি বিবেচনায় শীর্ষ ১০জন ব্যাটসম্যানের মধ্যে ইংল্যান্ডের বর্তমান তিন ব্যাটসম্যান জশ বাটলার, জনি বেয়ারস্টো ও জেসন রয় অন্যতম। শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান গ্রেন ম্যাক্সওয়েলই জশ বাটলারের উপরে অবস্থান করেছেন। জশ বাটলারের স্ট্রাইক রেট ১১৯.৫৩ এবং গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ১২১.৯৫।

জশ বাটলার; Image Source: NDTV Sports

তবে ম্যাক্সওয়েলের থেকে বাটলার বরাবরই এগিয়ে থাকবে কারণ অজি তারকার সর্বমোট রান ও গড় রানের থেকে বাটলারের সর্বমোট রান ও গড় রান অনেক বেশি। এমনকি ওয়ানডে ক্যারিয়ারের বাটলারের ৮টি সেঞ্চুরির বিপরীতে ম্যাক্সওয়েলের সেঞ্চুরি মাত্র একটি। এবং ইংল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত সেঞ্চুরি করার তালিকাতেও বাটলার শীর্ষে।

বোলিংয়ে তাদের সফলতার প্রধান অস্ত্র স্পিন বোলিং

ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা তাদের কাজ যথাযথভাবেই করে চলছেন। পাশাপাশি তাদের বোলাররা প্রতিটি ম্যাচে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে প্রতিটি ম্যাচকে পরিপূর্ণতা দিচ্ছেন। বিশেষ করে দুই স্পিনার আদিল রশিদ ও মঈন আলী ইংল্যান্ডের বোলিংয়ের অন্যতম শক্তি। কারণ ২০১৫ সালের পর থেকে চলতি বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ১২৯ উইকেট শিকার করেছেন আদিল রশিদ। ১২৫ উইকেট নিয়ে তালিকার দুই নম্বরে রয়েছেন আফগানিস্তানের রশিদ খান।

আদিল রশিদ; Image Source: Getty Images

পেস অ্যাটাকে জোফরা আর্চার

বার্বাডোসে জন্মগ্রহণ করা ২৪ বছর বয়সী জোফরা আর্চার ইতোমধ্যেই বোলিংয়েও তার প্রতিভা দেখিয়েছেন। এ বছরের মার্চে ইংল্যান্ডের হয়ে অভিষেক হওয়া আর্চারকে ছাড়াই বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণা করেছিল ইংল্যান্ড। তবে বিশ্বকাপের আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে অসাধারণ বোলিংয়ের পর অবশেষে চূড়ান্ত স্কোয়াডে জায়গা করে নেন তিনি। এবং বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অসাধারণ বোলিং করেন আর্চার।

সময়ের সেরা অধিনায়ক এউইন মরগান

ইতোমধ্যেই ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা অধিনায়কের তকমা লাগিয়েছেন এই আইরিশম্যান। তার ব্যাটিং ও অসাধারণ অধিনায়কত্বেই ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল বর্তমানে সেরা সময় পার করছে।

সম্প্রতি বিবিসির এক পডকাস্টে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন বর্তমান অধিনায়ক মরগান সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন,

আমি তাকে একদিনের ক্রিকেটে সেরা অধিনায়ক হিসেবে বিবেচনা করি। সবাই তাকে অনেক সম্মান করে। অধিনায়ক হিসেবে মরগানকে দলের প্রতিটি প্লেয়ার নিরাপদ বোধ করে।

এউইন মরগান; Image Source: IndiaToday

ইংল্যান্ড ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়লাভ করে এউইন মরগানের অধিনায়কত্বেই। অধিনায়ক হিসেবে ১০২ ম্যাচ খেলে ৬২টি ম্যাচে জয়লাভ করেন মরগান। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা অ্যালিস্টার কুক ৬৯ ম্যাচে ৩৬টি ম্যাচে জয়লাভ করেন। এবং সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন ৬০ ম্যাচে অধিনায়কত্ব করে ৩২টি ম্যাচে জয়লাভ করেন। অতএব পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই উপলব্ধি করা যায়, অধিনায়ক হিসেবে মরগান কতোটা সফল।

কে অথবা কীভাবে থামানো যেতে পারে তাদের?

ভারতীয় অধিনায়ক বিরাট কোহলি, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সেরা ব্যাটসম্যান। গত বিশ্বকাপের পর থেকে একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে ৭৮.২৯ গড়ে ৪০০০ রান করেছেন তিনি। এবং তার সময়ে টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ৮৪টি ম্যাচে জয়লাভ করেছে ভারত, যেখানে কোহলির ব্যাটিং গড় ৯৫.২৪ রান। তাই ইংল্যান্ড যদি ভারতের বিপক্ষে বড় স্কোরও গড়ে, সে ম্যাচ কোহলিদের জন্য খুব বেশি কঠিন হবে না যদি কোহলির ব্যাট জ্বলে উঠে। মোটকথা, ইংল্যান্ডে আটকানোর মতো যথেষ্ট সামর্থ্য রয়েছে ভারতের। যদিও বিশ্বকাপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে বেশ বড় ধাক্কা খেয়েছে ইংল্যান্ড।

Featured Image Source: Sky Sports

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *