আইপিএলের রেকর্ড গড়া পাঁচটি ব্যাটিং বিপর্যয়ের গল্প

আইপিএলের চলতি আসরে ক্রিকেট ভক্তরা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নাটকীয় ম্যাচ দেখেছে গত সোমবার। দিল্লি ক্যাপিটালস বনাম কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের মধ্যকার ম্যাচটির শেষ মুহূর্তের ঘটনাগুলো ছিল একেবারেই অবিশ্বাস্য। মোহালিতে ১৬৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ১৬ ওভার ৩ বলে দিল্লির সংগ্রহ ছিল ১৪৪ রান। তারা তখনই জয়ের সুবাতাস পাচ্ছিল। কিন্তু এরপরই তাদের ব্যাটিং স্তম্ভ বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ে। আট রান তুলতেই তারা হারিয়ে বসে সাতটি উইকেট। এর মধ্যে তারা বল মোকাবেলা করেছে মাত্র ১৭টি। ইংল্যান্ডের তরুণ পেসার স্যাম কারেন মাত্র ২.২ ওভার বল করে ১১ রান দিয়ে হ্যাটট্রিকসহ চার উইকেট তুলে নেন। ফলে ১৪ রানের নাটকীয় এক জয় তুলে নেয় প্রীতি জিনতার পাঞ্জাব।

উইকেট নেওয়ার পর স্যাম কারেনকে ঘিরে উল্লাস; Image Source: foxsports.com.au

তবে আইপিএলে এবারই এমন ব্যাটিং বিপর্যয় ঘটেনি। এর আগে অসংখ্য বার এমন ঘটনার জন্ম দিয়েছে ভারতের এই ঘরোয়া টি টোয়েন্টি লিগ। আইপিএলের মতো জনপ্রিয় টুর্নামেন্টে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়রা খেলে থাকেন। ফলে প্রত্যেক দলেই এমন কিছু খেলোয়াড় থাকেন যারা প্রায় একাই ম্যাচের ফল পরিবর্তন করে দিতে পারেন। ঠিক তেমন ঘটনাই ঘটেছে দিল্লি বনাম পাঞ্জাবের ম্যাচে। আজ আইপিএলের এমন কিছু নাটকীয় ম্যাচ নিয়েই আমাদের আয়োজন।

ডেকান চার্জার্স বনাম দিল্লি ডেয়ারডেভিলস, ১২ রানে ৬ উইকেট

২০০৯ সালে ডারবানে ডেকান চার্জার্সের মুখোমুখি হয় দিল্লি ডেয়ারডেভিলস। দিল্লির দেওয়া ১৭৪ রানের জবাবে খেলতে নেমে ডেকানের অজি তারকা অ্যাডাম গিলক্রিস্ট প্রথম ওভারেই আশিষ নেহরাকে চার বলে টানা চার হাঁকান। প্রতিপক্ষের বোলারদের উপর তাণ্ডব চালিয়ে মাত্র ২৪ বলেই অর্ধ শতক তুলে নেন গিলক্রিস্ট। এরপর তার স্বদেশী অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস ডেকানকে জয়ের বন্দরের দিকে নিয়ে যেতে থাকেন।

আশিষ নেহরা; Image Source: BCCI

শেষ তিন ওভারে জয়ের জন্য ডেকানের প্রয়োজন ছিল মাত্র ২৫ রান। হাতে তখনো ছয় উইকেট। সেই সময় বোলিংয়ে আসেন রজত ভাটিয়া। ১৮তম ওভারে তিনি সাইমন্ডস এবং ডোয়াইন ব্রাভোকে ফেরান। পরের ওভারে বেনুগোপাল রাওকে উইকেটরক্ষক দীনেশ কার্তিকের ক্যাচে পরিণত করেন নেহরা। আর আরপি সিং রান আউট হয়ে ফিরে যান। শেষ ওভারে আবারো বোলিংয়ে আসেন ভাটিয়া। এবার তিনি প্রজ্ঞান ওঝা এবং শোয়েব আহমেদকে ফিরিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন। সাইমন্ডস যখন আউট হন তখন ডেকানের সংগ্রহ ছিল ১৫০ রান। আর ১১ রান তুলতেই সবগুলো উইকেট হারায় আইপিএলের সাবেক এই দল।

রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু বনাম রাজস্থান রয়্যালস, ৭ রানে ৬ উইকেট

২০১০ সালে ঘরের মাঠে রাজস্থান রয়্যালসকে আতিথ্য দেয় রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। সেই মৌসুমে বেঙ্গালুরুর বোলিং লাইনআপে ছিলেন ডেল স্টেইন, জ্যাক ক্যালিস ও বিনয় কুমারদের মতো পেসার। ফলে ব্যাটসম্যান উপর চাপ অনেক কম ছিল। তার প্রমাণ দেওয়ার জন্যই সম্ভবত রাজস্থানের বিপক্ষে ম্যাচটিকে বেঙ্গালুরুর বোলাররা।

প্রবীন কুমার; Image Source: cricwizz.com

১৬.২ ওভারে রাজস্থানের সংগ্রহ ছিল চার উইকেটে ৮৫ রান। সেখান থেকে ৯২ রানে অলআউট হয়ে যায় তারা। বেঙ্গালুরুর পক্ষে হ্যাটট্রিক করেন প্রবীন কুমার। তিনি চার ওভারে ১৮ রান দিয়ে চার উইকেট তুলে নেন। অন্যদিকে ৩.৫ ওভার বল করে মাত্র নয় রানের বিনিময়ে তিন উইকেট নেন অনিল কুম্বলে। জবাবে কোনো উইকেট না হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছায় বেঙ্গালুরু।

পুনে ওয়ারিয়র্স বনাম সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ, ৭ রানে ৬ উইকেট

২০১৩ মৌসুমে আইপিএলের ২২তম ম্যাচে পুনের মহারাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় পুনে ওয়ারিয়র্স ও সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ। টসে হেরে প্রথমে ব্যাট করে মাত্র ১১৯ রানের সংগ্রহ পায় সানরাইজার্স। জয়ের জন্য স্বাগতিক পুনের জন্য লক্ষ্যটা একেবারেই কম ছিল। কিন্তু অমিত মিশ্রর ঘূর্ণিতে তাদের ইনিংস লক্ষ্যের খুব কাছে গিয়ে থেমে যায়।

অমিত মিশ্র; Image Source: IPL

১৬.৫ ওভারে পুনের সংগ্রহ ছিল ১০১ রান। হাতে তখনো ছয়টি উইকেট। কিন্তু ১৭তম ওভারের শেষ বলে ডেল স্টেইনের বলে মিচেল মার্শ আউট হওয়ার পরই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে পুনের ইনিংস। ১০১ রানের পর থেকে মাত্র সাত রান তুলতেই তারা ছয় উইকেট হারায়। হ্যাটট্রিক করেন অমিত মিশ্র। ফলে ১১ রানের জয় পায় সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ।

রাজস্থান রয়্যালস বনাম মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, ২৯ রানে ৮ উইকেট

২০০৮ সালে নিজেদের ঘরের মাঠে রাজস্থান রয়্যালসকে আতিথ্য দেয় মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স। সেই মৌসুমের শুরু থেকেই রাজস্থান উড়ন্ত ফর্মে ছিল। টানা পাঁচ ম্যাচ জিতে তখন তারা পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে। কিন্তু মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিপক্ষে তারা চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়।

টসে হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে রাজস্থানের শুরুটা একেবারেই ভালো হয়নি। ২১ রানে দুই উইকেট হারানোর পর দলের হাল ধরেন শেন ওয়াটসন ও স্বপ্নীল আশনদকার। তারা দুইজন মিলে স্কোরবোর্ডে ৩৪ বলে ৫৩ রান যোগ করেন। নবম ওভারে ওয়াটসনকে আউট করেন ডোয়াইন ব্রাভো। এরপরই রাজস্থানের ইনিংসে বিপর্যয় নেমে আসে। আশিষ নেহরার বোলিং তোপের মুখে ১০৩ রানেই গুটিয়ে যায় রাজস্থান। মাত্র ২৯ রান তুলতেই হারায় আট উইকেট। পরবর্তীতে সাত উইকেটে ম্যাচটি জিতে নেয় মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স।

ডেকান চার্জার্স বনাম রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু, ১ রানে ৫ উইকেট

২০০৮ সালে ডেকান চার্জার্স তাদের ঘরের মাঠ রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর মুখোমুখি হয়। টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় ডেকান। দুই ওপেনার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট এবং হার্শেল গিবস দুর্দান্ত শুরু এনে দেন। তারা দুইজন মিলে ১০১ রানের জুটি গড়েন। এরপর মিডল অর্ডারের ব্যাটসম্যানরা দলকে সম্মানজনক সংগ্রহের দিকে নিয়ে যান।

অ্যাডাম গিলক্রিস্ট; Image Source: sportskeeda.com

১৮.১ বল শেষে ডেকানের সংগ্রহ ছিল পাঁচ উইকেটে ১৬৪ রান। কিন্তু এরপরই তাদের ব্যাটসম্যানদের মাথায় উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার ভূত চেপে বসে। মাত্র এক রান তুলতেই তারা বাকি পাঁচ উইকেট হারিয়ে বসে। ফলে ১৬৫ রানেই তাদের ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে। বেঙ্গালুরুর পক্ষে সর্বোচ্চ তিন উইকেট নেন বিনয় কুমার। ম্যাচটি পাঁচ উইকেটে জিতে নেয় রাহুল দ্রাবিড়ের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স

Featured Image: espncricinfo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *