ফ্রেডরিক ডি সারাম এবং মহাদেব সাথেশিবাম: ব্যাটিং জিনিয়াস থেকে কারাবন্দী হওয়ার গল্প

ফ্রেডরিক ডি সারাম এবং মহাদেব সাথেশিবামের বয়সের পার্থক্য মাত্র তিন বছর। শ্রীলঙ্কার টেস্ট ক্রিকেট পূর্ব যুগে তারা দুজন ছিলেন ব্যাটিং গ্রেট। ডি সারাম এবং সাথেশিবাম দুজনেই শ্রীলঙ্কার জাতীয় ক্রিকেট দল ও সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শ্রীলঙ্কা টেস্ট ক্রিকেটের মর্যাদা পাওয়ার আগে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছে। ডি সারাম তার ক্যারিয়ারে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন ৪০টি। স্বল্প সংখ্যক ম্যাচ খেলেই তিনি ৬টি সেঞ্চুরি ও ১৩টি হাফসেঞ্চুরিসহ মোট ২৭৮৯ রান করেছেন। অপরদিকে সাথেশিবাম তার ক্যারিয়ারে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন ১১টি। তিন সেঞ্চুরি ও তিন হাফ সেঞ্চুরিতে তিনি মোট ৭৫৩ রান করেছেন।

ডি সারাম এবং সাথেশিবামের ব্যাটিং প্রতিভা ছিল সন্দেহাতীত। কিন্তু এরপরও এই দুই লঙ্কান ক্রিকেটারের নাম ক্রিকেট ভক্তদের কাছে একেবারে অচেনা। বড় বড় তারকার নামের আড়ালে তাদের দুজনের নাম ঢাকা পড়ছে। অথচ ডি সারাম ও সাথেশিবাম ছিলেন তাদের সময়ের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার। তবে তাদের নামের পাশে জড়িয়ে রয়েছে জেল খাটার কলঙ্ক। ভিন্ন ভিন্ন দুটি ঘটনায় ডি সারাম ও সাথেশিবাম কলম্বোর ওয়েলিকেদা জেলখানায় বন্দী ছিলেন। তবে একজন নির্দোষ প্রমাণিত হলেও অপরজন দোষী সাব্যস্ত হন।

ডি সারামের ক্রিকেট ও জেলবন্দী হওয়ার গল্প

ডি সারাম তার বন্ধু ও ভক্তদের কাছে ডেরিক নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। তার জন্ম শ্রীলঙ্কার বার্ঘার নামক এক উপজাতি পরিবারে। তাদের পরিবারের প্রায় সবাই খেলাধুলার সাথে জড়িত ছিলেন। ডি সারামের চাচা ডিএল সারাম লঙ্কান দ্বীপের প্রথম ক্রিকেট তারকা ছিলেন। এবং তার চার ভাইয়ের মধ্যে আরো এক ভাই সিংহল ক্রিকেট দলে জায়গা করে নেন। ক্রিকেটের পাশাপাশি সারাম পরিবার টেনিস ও গলফে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। এর আগে শ্রীলঙ্কা এই দুই খেলায় ব্রিটিশদের একক আধিপত্য ছিল।

ডি সারাম; Image Source: Chandi Chanmugam

গত শতকের প্রথম থেকেই শ্রীলঙ্কার আইন পেশায় বার্ঘার উপজাতিদের একক আধিপত্য ছিল। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য ১৯৩০ সালে আইন পড়ার জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ডি সারাম। কিন্তু তিনি প্রথম দুই বছরে মাত্র একটি শুনানিতে অংশ নেন। পড়াশোনায় গাফিলতি করলেও ক্রিকেট মাঠ ও টেনিস কোর্টে নিজেকে পরিচিত করে তোলেন সারাম। টেনিসে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ‘ব্লু’ পদক পান। যে সকল শিক্ষার্থে খেলাধুলায় ভালো করতেন তাদের এই পদক দেওয়া হতো। তিনি ‘ব্লু’ পদক পাওয়ার পরও ব্রিটেনের টেনিস দলগুলোতে উপেক্ষিত ছিলেন।

এরপর ডি সারাম তার ক্রিকেট প্রতিভা প্রদর্শন করেন। ব্যাট হাতে পাঁচ ম্যাচে ৬৮.৪২ গড়ে ৪৭৯ রান করেন তিনি। এই পারফরম্যান্সের পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলে ডাক পান। এবং ১৯৩৪ সালে গ্লৌচেস্টারশায়ারের বিপক্ষে ডি সারামের রাজসিক অভিষেক হয়। বিপক্ষ দলের পেস আক্রমণের বিপক্ষে তিনি ৩ ঘন্টায় ১৭৬ রানের ইনিংস খেলেন। এর আড়াই সপ্তাহ পর অজিদের আমন্ত্রণ জানায় অক্সফোর্ড ক্রিকেট দল। ডি সারাম তার দলের ২১৬ রানের মধ্যে ১২৮ রান একাই করেন। এর মধ্যে ৯৬ রানই আসে বাউন্ডারি থেকে। তার হাতে সবচেয়ে বেশি মার খান অজি তারকা ক্ল্যারি গ্রিমেট। এবং ডি সারাম প্রথম সিংহলিজ ‘ব্লু’ হিসেবে ৫০.৮৬ ব্যাটিং গড় নিয়ে মৌসুম শেষ করেন।

ডি সারাম; Image Source: cricketique.wordpress.com

এরপর ডি সারামকে মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) এর পক্ষ থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। একই সাথে তাকে জানানো হয় তিনি আর কখনো নিজ দেশের হয়ে খেলতে পারবেন না। ডি সারাম তখন এমসিসির হয়ে না খেলার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও তখন তার দেশ ক্রিকেট বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত কোনো দল নয়। ১৯৩৭ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এবং মৌসুমের বাকি সময়ে তিনি বোম্বে পেন্টাঙ্গুলারে খেলেন। সে বছর ডি সারাম চ্যাম্পিয়ন মুসলিম দলের বিপক্ষে ৫০ এবং অপরাজিত ১২২ রানের দুইটি ইনিংস খেলেন। সেই মৌসুমে পেন্টাঙ্গুলারে একমাত্র তিনিই সেঞ্চুরি করেন।

কিন্তু তার ২৭তম জন্মদিনের আগ মুহূর্তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এবং তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার থমকে যায়। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত তিনি কোনো ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে পারেননি। তখন তার বয়স প্রায় ৩৪ বছরের কাছাকাছি। অনেকে এই বয়সে খেলাধুলা থেকে অবসর নেন। কিন্তু ডি সারাম সেই দলের অন্তর্ভুক্ত নন। ১৯৪৯ সালে তিনি সিংহল ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হন এবং টানা পাঁচ বছর জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেন। পাশাপাশি তিনি সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবেরও অধিনায়কত্ব করেন।

১৯৫৬ সালে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হন এস ডব্লিউ আর ডি বন্দরনায়েক। তিনি ক্ষমতায় আসার পরপরই সিংহলিজ ভাষা ও ভাষাভাষীদের গুরুত্ব প্রদান করতে সচেষ্ট হন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দুই মাসের মাথায় তিনি আইন করে সিংহলিজকে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি দেন। এতে করে খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষেরা ক্ষুব্ধ হন। এর ফলে শ্রীলঙ্কায় জাতিগত দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। বন্দরনায়েকের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী হন তার স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক। তিনিও তার স্বামীর কাজকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে চলমান রাখেন।

Image Source: cricketique.wordpress.com

সিংহলিজকে রাষ্ট্রীয় ভাষা ঘোষণা করার পর সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হন ইংরেজি ভাষাভাষী খ্রিস্টানরা। তাদের মধ্যে যারা সেনাবাহিনীতে ছিলেন তাদের একটি অংশ রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শ্রীমাভো বন্দরনায়েককে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করেন। এর নেতৃত্বে ছিলেন ডি সারাম। তিনি তখন সেনাবাহিনীতে কর্নেল হিসেবে নিয়োজিত। কিন্তু তাদের অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা আগেই ফাঁস হয়। এবং ডি সারাম আটক হন। পরবর্তীতে বিচারের মাধ্যমে তিনিসহ ১১ জনকে ১০ বছর করে জেল দেওয়া হয়। তবে সাজা আরো বাড়তে পারতো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোনো অভ্যুত্থান না হওয়ায় তাদের ১০ বছর সাজা দেওয়া হয়।

মহাদেব সাথেশিবামের ক্রিকেট ও জেলবন্দী হওয়ার গল্প

ডি সারাম যখন নিজের নাম কামিয়েছেন, মহাদেব সাথেশিবাম তখনো স্কুল পড়ুয়া এক বালক। কিন্তু তখন থেকেই তিনি তার ব্যাটিং কারিশমা দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন। তিনি যখন সিল্কের শার্ট, গলায় রুমাল এবং মাথায় ক্যাপ পরে মাঠে নামতেন, দর্শক সারিতে নারী ভক্তরা তার নাম ধরে গলা ফাটাতেন। সাথেশিবাম ক্রীড়া জগতের অল্প কয়েকজন মানুষের মধ্যে একজন, যারা কিনা নিজেকে তার খেলার ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছেন।

ডি সারাম এবং সাথেথিবাম (ব্যাট হাতে); Image Source: BR Heyn’s

সাথেশিবাম অল্পদিনেই তারকাখ্যাতি পেলেও খুব সহজে জাতীয় দলে প্রবেশ করতে পারেননি। ১৯৩৬ সালে এমসিসি শ্রীলঙ্কা সফরে আসে। কিন্তু সেই সিরিজে সাথেশিবাম উপেক্ষিত থাকেন। যদিও তিনি সেই সময়ের সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটসম্যান ছিলেন। তবে তার বাদ পড়ার পেছনে অন্য একটি কারণ ছিল। তিনি প্রচুর মদপান করতেন। আর এই কারণে তাকে দলে রাখা হয়নি। যদিও সাথেশিবাম মনে করতেন মদপানের জন্য ক্রিকেটের কোনো ক্ষতি হয়না। একটা গুজব ছিল যে তিনি মদপান করার কারণে ক্যাচ ফেলে দিতেন এবং বাউন্ডারি আটকাতে ব্যর্থ হতেন। তবে এটা সত্য যে সাথেশিবাম ফিল্ডিংয়ের চেয়ে ব্যাট করতে বেশি ভালোবাসতেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তিনি ক্যারিয়ারের শুরুতে খুব বেশি খেলতে পারেননি। তবে ১৯৪৪ সালে তিনি তার অগ্রজ ডি সারামের পথ অনুসরণ করে বোম্বে পেন্টাঙ্গুলার খেলেন। সাথেশিবাম হিন্দু ছিলেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার মুসলিমদের বিপক্ষে অভিষেক হয়। এবং তিনি প্রথম ম্যাচেই ১০১ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেন। পাশাপাশি বিজয় হাজারের সাথে বড় জুটি বাঁধেন। ১৯৪৫ সালের মার্চে কলম্বোতে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরু হয়। তখন সাথেশিবামের বয়স ৩০। সফরত ভারতের লালা অমরনাথ ও ভিনো মানকাদকে দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করে ১১১ রানের ইনিংস খেলেন। এটি ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস।

মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর সাথেশিবাম (মাঝে); Image Source: thinkworth.wordpress.com

সাথেশিবাম ও ডি সারাম যখন একসাথে খেলতেন, তখন তাদের মধ্যে বেশ কয়েকবার দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। একবার তো ডি সারাম রাগ করে অবসরই নিয়ে বসেন। সময়টা ১৯৪৮ সালের মার্চ। কলম্বো সফরে আসে ডন ব্র্যাডম্যানের অস্ট্রেলিয়া। তখন দলের অধিনায়ক বাছাই করার জন্য ভোটের আয়োজন করে লঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড। সিনিয়র হিসেবে ডি সারামই এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু দক্ষতার দিক থেকে সাথেশিবামই অধিনায়ক হওয়ার যোগ্য ছিলেন। সে কারণে তার পক্ষেই ভোট পড়ে বেশি। এতে বেশ রাগান্বিত হন ডি সারাম। এবং পরবর্তী সিরিজগুলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। তবে অধিকাংশ সময়ই দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে সারাম অধিনায়ক হিসেবেই দলে ফেরেন। এবং সাথেশিবাম তার অধীনেই বিনয়ের সাথে খেলেন।

মহাদেব সাথেশিবামের জীবনে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে স্ত্রীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ১৯৫১ সালের ৭ অক্টোবর তার স্ত্রী আনন্দান খুন হন। তার লাশ বাড়ির গ্যারেজে পাওয়া যায়। পুলিশ এই খুনের জন্য সরাসরি সাথেশিবামকে আটক করে। এটা স্বাভাবিক স্ত্রী খুন হলে সবার আগে স্বামীর উপরেই দোষটা আসে। এছাড়া সাথেশিবামের সাথে তার স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক ভালো ছিল না। ফলে সন্দেহের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়।

ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে সাথেশিবাম; Image Source: cricketique.wordpress.com

তবে আরো একজন সন্দেহভাজন ছিলেন। সাথেশিবামের বাড়ির কাজের লোক উইলিয়াম খুনের পরপরই নিখোঁজ হন। খুনের এক সপ্তাহ পর তার খোঁজ মিললে তিনিও সাথেশিবামের উপর দোষ চাপান। তাকে খুনের কাজে তার মালিক বাধ্য করেছে বলে জানান। তখন তিনি সন্দেহভাজন থেকে প্রধান সাক্ষীতে পরিণত হন। কিন্তু কোর্টে তিনি ভুলভাল সাক্ষী দেন।

সাথেশিবামের পক্ষে দাঁড়ান তার গাড়ী চালক। তিনি আদালতকে জানান, সাথেশিবাম বাড়ি ছাড়ার পর তার স্ত্রী খুন হন। কারণ তিনি যখন সাথেশিবামকে নিয়ে বের হন তখন তার স্ত্রী দরজায় দাঁড়িয়ে বিদায় জানান। এদিকে ফরেনসিক রিপোর্টও সেটাই বলে। ফরেনসিক টেস্ট করেন বিশ্ববিখ্যাত সিডনি স্মিথ। পরবর্তীতে আদালত মাত্র ৬৪ মিনিটে সাথেশিবামকে খালাস দেন। কিন্তু এর মধ্যে কেটে গেছে ২০টি মাস। এরপর সাথেশিবাম শ্রীলঙ্কা ছেড়ে প্রথমে সিঙ্গাপুর। পরে মালয়শিয়া পাড়ি জমান। এবং সেখানকার জাতীয় ক্রিকেট দলের হয়ে খেলেন।

Featured Image Source: BR Heyn’s

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *