ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের ব্যর্থতা ও সফলতা সমূহ (দ্বিতীয় পর্ব)

গতকাল বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের স্মরণীয় একটি দিন ছিল। যা ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের জন্য বেশ আত্মবিশ্বাস যোগাবে। মূলত ইংল্যান্ড বিশ্বকাপকে সামনে রেখেই প্রস্তুতি হিসেবে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে যায় বাংলাদেশ। অবশেষে দীর্ষ ১০ বছরে ৬টি ফাইনালে হারের পর বহু প্রতিক্ষার ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন পূরণ হয় বাংলাদেশের। আসুন দেখে নেয়া যাক, সর্বশেষ ছয়টি ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের ব্যর্থতা ও সফলতা সমূহ-

কিটপ্লাই কাপ, ২০০৮

২০০৮ সালে কিটপ্লাই কাপ খেলতে বাংলাদেশে আসে ভারত ও পাকিস্তান। সিরিজের প্রত্যেকটি ম্যাচ মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়।

বৃষ্টি বিঘ্নিত উদ্বোধনী ম্যাচটি ৪০ ওভারে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে সবকটি উইকেট হারিয়ে ২৩৩ রান সংগ্রহ করে পাকিস্তান। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ৪০ ওভার শেষে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৬৩ রান করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। ৭০ রানের বড় জয় পায় পাকিস্তান। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতের ৩৩০ রানের জবাবে পাকিস্তান মাত্র ১৯০ রানেই গুটিয়ে যায়। ফলে ১৪০ রানের বড় জয় পায় ভারত।

ভারতীয় ক্রিকেট দল; Source: News18.com

এরপর সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে ব্যাট করতে নেমে রকিবুল হাসানের ৮৯ রানের উপর ভর করে ২২২ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। জবাবে ব্যাট করতে নেমে গৌতম গম্ভীরের সেঞ্চুরি ও বীরেন্দর শেবাগের হাফসেঞ্চুরিতে ৭ উইকেটের সহজ জয় পায় ভারত। এরপর ফাইনালে ভারতকে ২৫ রানে হারিয়ে সিরিজে চ্যাম্পিয়ন হয় পাকিস্তান।

ট্রাই-নেশন টুর্নামেন্ট, ২০০৯

২০০৯ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ট্রাই-নেশন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে জিম্বাবুয়ে, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ। ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হয় মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে।

সিরিজের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। সাকিব আল হাসান ও নাঈম ইসলামের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ২০৫ রান করতে সক্ষম হয় জিম্বাবুয়ে। সহজ টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে প্রথম থেকেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ১৬৭ রানেই গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। এরপর সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে মাত্র ১৪৭ রানে গুটিয়ে দিয়ে ব্যাট করতে নেমে সাকিব আল হাসানের ৯২ রানের উপর ভর করে ৫ উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের উল্লাস; Source: Cricket World

এ জয়ের সুবাদে নেট রান রেটে এগিয়ে থেকে ফাইনালে মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ১৫২ রানেই গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস। সহজ টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে শ্রীলঙ্কাও ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে যায়। মাত্র ৬ রানেই ৫টি উইকেটের পতন তাদের। তবে কুমার সাঙ্গাকারা এক প্রান্ত আগলে রেখে খেলতে থাকেন। অবশেষে ম্যাচটি ২ উইকেট হাতে রেখে জিতে যায় শ্রীলঙ্কা। ফলে জয়ের খুব কাছে গিয়েও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি বাংলাদেশ।

ট্রাই-নেশন টুর্নামেন্ট, ২০১০

২০১০ সালে বাংলাদেশে ট্রাই-নেশন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ। সিরিজের সবগুলো ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়ে মিরপুর শেরে বাংলা ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে।

Source: The Indian Express

সিরিজের উদ্বোধনী ম্যাচে মোহাম্মদ আশরাফুলের ৭৫ রানের অনবদ্য ইনিংসের উপর ভর করে ২৬০ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। জবাবে ব্যাট করতে নেমে তিলকারত্নে দিলশানের সেঞ্চুরির উপর ভর করে ৭ উইকেটের সহজ জয় পায় শ্রীলঙ্কা। এরপর সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে তামিম ইকবাল, ইমরুল কায়েস ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাফসেঞ্চুরিতে ২৯৬ রানের বিশাল স্কোর গড়ে বাংলাদেশ। তাতেও হার এড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। এমএস ধোনির সেঞ্চুরি ও বিরাট কোহলির ৯১ রানের সুবাদে ৬ উইকেটের জয় ছিনিয়ে নেয় ভারত।

এরপর সিরিজের চতুর্থ ম্যাচেও প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ২৪৯ রানের লড়াকু স্কোর গড়েও জয়ের মুখ দেখনি বাংলাদেশ। উপুল থারাঙ্গা ও মাহেলা জয়াবর্ধনের জোড়া সেঞ্চুরিতে ৯ উইকেটের বিশাল জয় পায় শ্রীলঙ্কা। এমনিকে সিরিজে নিজেদের শেষ ম্যাচে এসেও ভারতের সাথে কোনো পাত্তাই মেলেনি বাংলাদেশের।

পুরো সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা যথেষ্ট রান সংগ্রহ করলেও বোলারদের ব্যর্থতায় দেশের মাটিতে একেবারে শূন্য হাতে ভারত ও শ্রীলঙ্কার ফাইনাল ম্যাচে দর্শক হয়ে গ্যালারিতে বসে থাকতে হয়। ফাইনালে ভারতকে ৪ উইকেটে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় শ্রীলঙ্কা।

আয়ারল্যান্ড ট্রাই-নেশন সিরিজ, ২০১৭

২০১৭ সালে আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত “আয়ারল্যান্ড ট্রাই-নেশন সিরিজ’- এ অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ, নিউজিল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড। সিরিজের প্রত্যেকটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরের দি ভিলেজ স্টেডিয়ামে।

বাংলাদেশ বনাম আয়ারল্যান্ডের ম্যাচের মধ্য দিয়ে সিরিজের উদ্বোধন হয়। তবে দুঃখজনকভাবে ম্যাচের মাঝপথে প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হওয়ার কারণে ম্যাচটি পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয়।

এরপর সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে সৌম্য সরকার, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাফসেঞ্চুরির উপর ভর করে ২৫৭ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। জবাবে টম লাথাম ও জেমস নীসামের হাফসেঞ্চুরির সুবাদে ৪ উইকেট হাতে রেখে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।

সাকিবকে আউট করার পর নিউজিল্যান্ডের উল্লাস; Source: The Indian Express

সিরিজে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৮ উইকেটে সহজ পায় বাংলাদেশ। এরপর সিরিজের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের দেওয়া ২৭১ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে প্রথমে উইকেট হারালেও তামিম ইকবাল ও সাব্বির রহমানের হাফসেঞ্চুরি এবং ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহর অসাধারণ ব্যাটিংয়ে ৫ উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশ।

তবুও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। চার ম্যাচে তিন জয় নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় নিউজিল্যান্ড এবং দুই ম্যাচে জয় নিয়ে রানার্স আপ হয়ে দেশে ফিরে টাইগার বাহিনী।

বাংলাদেশ ট্রাই-নেশন সিরিজ, ২০১৮

গতবছর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ট্রাই-নেশন সিরিজে অংশগ্রহণকারী তিনটি দল ছিল শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুয়ে ও স্বাগতিক বাংলাদেশ। সিরিজের প্রত্যেকটি ম্যাচই ঢাকার মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়।

উদ্বোধনী ম্যাচে সাকিব আল হাসানের অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্সে ৮ উইকেটের বড় জয় পায় বাংলাদেশ। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে অপ্রত্যাশিত ভাবে জিম্বাবুয়ের কাছে ১২ রানের হারার পর তৃতীয় ম্যাচে বাংলাদেশের সাথেও ১৬৩ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে যায় শ্রীলঙ্কা। সেই ম্যাচেও সাকিব আল হাসান ব্যাট হাতে ৬৭ এবং বল হাতে ৩টি উইকেট শিকার করে ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন। এরপরের ম্যাচে জিম্বাবুয়ের সাথে জিতলেও শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার সাথে ১০ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে হেরে যায় বাংলাদেশ।

মুশফিকুর রহিম; Source: DNA India

তবে বাংলাদেশ তিন ম্যাচে জয় নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে এবং শ্রীলঙ্কা দুই ম্যাচে জয় নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের দুই নম্বরে থেকে ফাইনালে উঠে দুই দল। ফাইনার ম্যাচে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ২২১ রানেই গুটিয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। অপরদিকে বাংলাদেশও ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে যায়। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ৭৬ রান ব্যতীত আর কোনো ব্যাটসম্যানই তেমন সুবিধা করতে পারেনি। ফলে মাত্র ১৪২ রানে অলআউট হয়ে ৭৯ রানের হার নিয়ে সিরিজ শেষ হয় বাংলাদেশের। চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফিরে যায় শ্রীলঙ্কা।

আয়ারল্যান্ড ট্রাই-নেশন সিরিজ, ২০১৯

ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হিসেবে আয়ারল্যান্ডে ট্রাই-ন্যাশন সিরিজে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আয়ারল্যান্ড।

সিরিজের উদ্বোধনী ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের সাথে বিশাল ব্যবধানে জেতার পর দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশকে ২৬২ রানের টার্গেট দেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জবাবে বাংলাদেশের টপ অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যান তামিম, সৌম্য ও সাকিবের হাফ-সেঞ্চুরির সুবাদে সহজ জয় পায় বাংলাদেশ।

এরপর সিরিজের তৃতীয় ম্যাচটি বৃষ্টি বিঘ্নিত কারণে পরিত্যক্ত হয়। সিরিজের পঞ্চম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আবারো সহজ জয় পায় বাংলাদেশ, নিশ্চিত হয় ফাইনাল। এরপর সিরিজের ষষ্ঠ ম্যাচে নিয়ম রক্ষার্থে আয়ারল্যান্ডের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। আয়ারল্যান্ডের দেওয়া ২৯৫ রানের বিশাল স্কোর তাড়া করতে নেমেও হেসেখেলে জয়ী হয় বাংলাদেশ।

ট্রফি হাতে মাশরাফি; Source: Hindustan Times

ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথমে ব্যাট করতে নেমে দ্রুত রান তুলতে থাকে। তবে বৃষ্টির কারণে চার ঘন্টা খেলা বন্ধ থাকলে মোট ২৪ ওভারে ব্যাট করার সুযোগ পায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। নির্ধারিত ওভারে ১৫২ রান সংগ্রহ করলেও বৃষ্টি জনিত কারণে ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে ২১০ রানের টার্গেট পায় বাংলাদেশ। কম ওভারে বিশাল টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে সৌম্য সরকারের ৬৬ ও শেষে মোসাদ্দেক হোসেনের ৫২ রানের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ৫ উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশ। অতএব প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন পূরণ হয় টাইগার বাহিনীর।

Featured Image Source: DNA India

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *