শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে হট ফেবারিট ইংল্যান্ডকে নাস্তানাবুদ করলো শ্রীলঙ্কা

এবারের বিশ্বকাপের সব অঘটন গুলো যেন মনে হয় বিশ্বকাপের হট ফেবারিট ও স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই ঘটে চলছে৷ বিশ্বকাপের আগে হোয়াইটওয়াস করা পাকিস্তানের সাথে বিশ্বকাপে অপ্রত্যাশিত হার ও গতকাল শ্রীলঙ্কার সাথে হারের পর হট ফেবারিট ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালে খেলার পরিসংখ্যান অনেকটা কঠিনই বলা চলে। অপরদিকে এই ম্যাচ জেতার পর শ্রীলঙ্কার সেমিফাইনালে খেলার আশা এখনো অটুট থাকলো।

Image Source: InsideSport

গতকাল বিশ্বকাপে নিজেদের ষষ্ঠ ম্যাচে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে জোফরা আর্চার ও মার্ক উডের বোলিং তোপে মাত্র ২৩২ রান করতে সক্ষম হয় শ্রীলঙ্কা। লো স্কোরিং ম্যাচে ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরাও লাসিথ মালিঙ্গার গতি ও ডি সিলভার ঘূর্ণিতে কুপোকাত হয়ে যায়। গুটিয়ে যায় ২১২ রানে, যা চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম একটি অঘটন হিসেবে ধরা যায়।

ম্যাচ বিবরণী

গতকাল বিশ্বকাপের ২৭তম ম্যাচে ইংল্যান্ডের হেডিংলি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে হট ফেবারিট ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয় অফফর্মে থাকা শ্রীলঙ্কা। টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক দিমুথ করুনারত্নে। শ্রীলঙ্কার পক্ষে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে আসেন করুনারত্নে ও কুশল পেরেরা। এবং বোলিং আক্রমণে আসেন ক্রিস ওকস।

ব্যাট করতে নেমে প্রথমেই বিপর্যয়ে পড়ে যায় শ্রীলঙ্কা। দ্বিতীয় নম্বর ওভারেই জোফরা আর্চার তাদের উদ্বোধনী জুটিতে আঘাত হানেন৷ উইকেটরক্ষক জস বাটলারের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরে যান করুনারত্নে। এরপরের ওভারেই আরেক উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান পেরেরাকে ফেরান ক্রিস ওকস।

উইকেট নেওয়ার পর উল্লাসে জোফরা আর্চার; Image Source: India.com

দলীয় ৩ রানে দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে বেশ চাপে পড়ে যায় শ্রীলঙ্কা। এরপর আভিস্কা ফার্নান্দো ও কুশল মেন্ডিস। সেই চাপ সামলে ভালো একটি জুটি গড়তে থাকেন তারা। প্রথম পাওয়ারপ্লে শেষে তাদের স্কোর দাঁড়ায় ২ উইকেটে ৪৮ রান।

তবে সে জুটিকে বেশিদূর গড়াতে দেননি মার্ক উড৷ ১৩তম ওভারে উডের বাউন্স বল আপার-কাট শট খেলতে গিয়ে আদিল রশিদের হাতে ক্যাচ দেন ফার্নান্দো। ৩৯ বল মোকাবিলা করে ৬টি চার ও ২টি ছয়ের সুবাদে ৪৯ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেন তিনি।

এরপর উইকেটে আসেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস। তাকে নিয়ে আরেকটি ভালো জুটি গড়তে থাকেন মেন্ডিস। তবে সে জুটিটি ভেঙ্গে যায় আদিল রশিদের করা ৩০তম ওভারে। এউইন মরগানের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরেন মেন্ডিস। ৬৮ বল খেলে ২টি চারে ৪৬ রান করেন তিনি। এর ঠিক পরের বলেই সদ্য উইকেটে আসা জিভান মেন্ডিস আদিল রশিদের হাতেই ক্যাচ দিয়ে শূন্যরানে আউট হন। দলীয় স্কোর তখন ৫ উইকেটে ১৩৩ রান।

এরপর সদ্য উইকেটে আসা ডি সিলভাকে নিয়ে উইকেট টিকিয়ে রেখে ধীর গতিতে রান তুলতে থাকেন ম্যাথুস। এরই মাঝে ৮৪ বলে ব্যক্তিগত ৩৮তম এবং এই বিশ্বকাপের প্রথম হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করের ম্যাথুস। তবে তৃতীয় পাওয়ারপ্লেতে জোফরা আর্চারের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন ডি সিলভা। ৪৭ বল খেলে ২৯ রান করেন তিনি।

অ্যাঞ্জেলো মেথুস; Image Source: cricket365.com

এরপর উইকেটের এক প্রান্তে ম্যাথুস রান তুলতে থাকলেও অন্য প্রান্তের ব্যাটসম্যানরা যাওয়া-আশার মধ্যে ছিলেন। ৪৬তম ওভারে জোফরা আর্চারের তৃতীয় শিকার হন থিসারা পেরেরা ও পরের ওভারে মার্ক উডের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন উদানা। এবং ৪৯তম ওভারে উডের তৃতীয় শিকারে পরিণত সাজঘরে ফিরেন লাসিথ মালিঙ্গা। অবশেষে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ২৩২ রান করতে সক্ষম হয় শ্রীলঙ্কা৷ ম্যাথুস ১১৫ বলে ৫টি চার ও ১টি ছয়ে ৮৫ রানে অপরাজিত থাকেন।

ইংল্যান্ডের পক্ষে মার্ক উড ৪০ রান দিয়ে ৩টি উইকেট তুলে নেন। এছাড়াও আর্চার ৩টি, রশিদ ২টি ও ওকস ১টি উইকেট তুলে নেন।

সহজ টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ওভারেই উইকেট হারায় ইংল্যান্ড। মালিঙ্গার দ্বিতীয় বলেই এলবিডব্লুর ফাঁদে পড়েন জনি বেয়ারস্টো। রিভিউয়ের আবেদন করেও লাভ হয়নি, শূন্যরানেই সাজঘরে ফিরে যান বেয়ারস্টো।

লাসিথ মালিঙ্গা; Image Source: Hindustan Times

দ্বিতীয় জুটিতে উইকেটে আসেন জো রুট। সে জুটিটিও বেশিদূর গড়াতে দেননি মালিঙ্গা। সপ্তম ওভারে স্লিপে থাকা কুশল মেন্ডিসের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরেন জেমস ভিন্স। এরপর উইকেটে আসেন ইংল্যান্ডের দলীয় অধিনায়ক এউইন মরগান। জো রুটকে সাথে নিয়ে বেশ ধীরগতিতে রান তুলতে থাকেন তিনি।

সে জুটিতে আঘাত হানেন উদানা। নিজের বলে নিজেই ক্যাচ নিয়ে এউইন মরগানকে আউট করেন তিনি। ৩৫ বল খেলে ২টি চারে ২১ রান করে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান মরগান। দলীয় স্কোর তখন ৩ উইকেটে ৭৩ রান।

এউইন মরগান; Image Source: News18.com

চতুর্থ উইকেট জুটিতে ক্রিজে আসেন বেন স্টোকস। তাকে নিয়ে আরেকটি জুটি গড়তে থাকেন জো রুট। তবে সে জুটিটি ভেঙ্গে দিয়ে দলের জন্য ব্রেকথ্রু এনে দেন মালিঙ্গা। উইকেটরক্ষক কুশল পেরেরার হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরেন রুট। আউট হওয়ার আগে ৮৯ বলে ৩টি চারের সুবাদে ৫৭ রান করেন তিনি। এক প্রান্তে বেন স্টোকস উইকেট কামড়ে রান তুলতে থাকলেও অপর প্রান্তে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়তে থাকে৷

৩৩তম ওভারে মালিঙ্গার চতুর্থ শিকারে পরিণত হন জস বাটলার। এলবিডব্লুর ফাঁদে পড়ে ১০ রানেই সাজঘরে ফিরেন তিনি। দলীয় স্কোর তখন ৫ উইকেটে ১৪৪ রান। এরপর ৩৯তম ওভারে ডি সিলভার বলে উদানার হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন মঈন আলী। পরের ওভারে স্টোকস ব্যক্তিগত ১৭তম হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করেন।

তবে ডি সিলভার ৪১তম ওভারটিই ম্যাচের রূপ বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ওভারের প্রথম বলে উইকেটরক্ষক পেরেরার হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন ক্রিস ওকস। এরপর সদ্য উইকেটে আসা আদিল রশিদ ওভারের পঞ্চম বলে একই লেন্থের বলে একই ভাবে উইকেটের পিছনে থাকা পেরেরার হাতে ক্যাচ তুলে দেন। ইংল্যান্ডের স্কোর তখন ৮ উইকেটে ১৭৮ রান।

ডি সিলভা; Image Source: Willow.tv

এরপর ৪৪তম ওভারে উদানার বলে পেরেরার হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন আর্চার। ইংল্যান্ডের প্রয়োজন তখন ৩৮ বলে ৪৭ রান। উইকেটে তখন বেন স্টোকস ও মার্ক উড। ঠিক পরের ওভারেই মালিঙ্গার বলে ডিপ মিড-উইকেটে ক্যাচ তুলে দিলে কুশল মেন্ডিস তা তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হন। 
নতুন জীবন ফিরে পেয়ে পরের ওভারে ইসুরু উদানার বলে দুইটি অসাধারণ ছয়ে ১৫ রান তুললে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন গিয়ে দাঁড়ায় ২৪ বল থেকে ৩০ রান। পরের ওভারে নুয়ান প্রদীপের পর পর দুই বলে দুটি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে চাপ কিছুটা কমিয়ে আনলেও ওভারের শেষ বলে উইকেটরক্ষক পেরেরার হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন মার্ক উড। এতে সবকটি উইকেট হারিয়ে ২১২ রানে গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ড। শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ২০ রানের জয় পায় শ্রীলঙ্কা।

১০ ওভার বল করে ৪৩ রান দিয়ে ৪টি উইকেট শিকার করে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন লাসিথ মালিঙ্গা।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

শ্রীলঙ্কা- ২৩২/৯ (৫০ ওভার)

ম্যাথুস ৮৫, মেন্ডিস ৪৭

উড ৩/৪০, আর্চার ৩/৫২

ইংল্যান্ড- ২১২/১০ (৪৭ ওভার)

স্টোকস ৮২, রুট ৫৭

মালিঙ্কা ৪/৪৩, সিলভা ৩/৩২

Featured Image Source: News18.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *