বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়দের যত কীর্তি

১৯৭৫ সালে ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হলেও তখন অংশগ্রহণ করতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। তাদের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ বিশ্বকাপে। এর আগে বর্ণবৈষম্যর কারণে ২১ বছর ক্রিকেটে নিষিদ্ধ ছিল প্রোটিয়ারা। ২১ বছর পর আইসিসি আবার তাদের ক্রিকেটে ফেরার অনুমতি দিলে বিশ্বকাপের পঞ্চম আসর থেকে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায় দক্ষিণ আফ্রিকা।

Image Source: Espncricinfo

নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ থেকেই দুর্দান্ত খেলে আসছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ শিরোপা জিততে না পারলেও সেমিফাইনাল পর্যন্ত খেলেছে একাধিকবান। বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার সাফল্যের পেছনে থাকা কয়েকজন খেলোয়াড়ের অসাধারণ ভূমিকা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী

এবি ডি ভিলিয়ার্স(১২০৭ রান)

এবি ডি ভিলিয়ার্স তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে তিনটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৭, ২০১১ ও ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে মাঠ নামেন। প্রতিটি আসরে তিনি দুর্দান্ত ব্যাটিং করে মাঠ কাঁপিয়েছেন, ভেঙ্গেছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অনেক রেকর্ড। প্রোটিয়াদের ব্যাটিং লাইন আপের মূল ভরসা হিসেবে তাকে দেখা হতো।

Image Source: Yahoo

তিন বিশ্বকাপে চারটি শতক আর ছয়টি অর্ধশতক রয়েছে ডি ভিলিয়ার্সের। সব মিলিয়ে করেছেন ১২০৭ রান, যাতে তার গড় রান রেট ছিল ৬৩.৫২। তিনি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রান সংগ্রহকারী।

ডি ভিলিয়ার্স তাঁর প্রথম বিশ্বকাপ শতকটি করেন ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ম্যাচটিতে ওপেনিংয়ে ব্যাট করতে নেমে ১৩০ বলে করেন ১৪৬ রান। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় শতকটিও পূর্ণ করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২০১১ বিশ্বকাপে। সে ম্যাচে করেন অপরাজিত ১০৭ রান। তৃতীয় শতকটিও তিনি ২০১১ বিশ্বকাপেই করেন। তবে সেবার আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে নয়, প্রতিপক্ষ দল ছিল আয়ারল্যান্ড। আইরিশদের বিপক্ষে করেন ৯৮ বলে ১৩৪ রান।

বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে আগের দুই দেখায় দুই বারই শতক পূর্ণ করেছিলেন ডি ভিলিয়ার্স। ২০১৫ বিশ্বকাপে তৃতীয় বারের দেখায়ও সে সুযোগটি হাত ছাড়া করেননি তিনি। ঐ ম্যাচে শুধু শতকই হাঁকাননি, করেছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অনন্য এক রেকর্ড। বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্রুততম দেড়শত রানের ইনিংস খেলেন। ম্যাচটিতে ৬৬ বলে ১৭ চার আর ৮ ছয়ে ১৬২ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি।

সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি

অ্যালান ডোনাল্ড(৩৮ উইকেট)

দক্ষিণ আফ্রিকান এই ডান হাতি ফাস্ট বোলার ১৯৯২, ১৯৯৬, ১৯৯৯ ও ২০০৩ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেন। চার আসরে ৩৮ উইকেট শিকার করে প্রোটিয়া বোলারদের মধ্যে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ও সফল বোলার তিনি। ১৯৯২ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অভিষিক্ত হন ডোনাল্ড।

Image Source: ICC

সেই ম্যাচে দুর্দান্ত বোলিং করে ৩৪ রান দিয়ে নেন ৩টি উইকেট। এছাড়া ওই আসরে তার আরেকটি দুর্দান্ত বোলিং ফিগার ছিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। লঙ্কানদের বিপক্ষে ৪২ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট। অভিষেক বিশ্বকাপে মোট নয় ম্যাচে অংশগ্রহণ করে ১৩ উইকেট শিকার করেন তিনি। ওই আসরে সাফল্যময়ী বোলিং দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা দলের নিয়মিত খেলোয়াড় হিসেবে জায়গা করে নেন ডোনাল্ড।

১৯৯৬ বিশ্বকাপেও দলে ছিলেন ডোনাল্ড। প্রথম ম্যাচেই খেলতে নেমে আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুর্দান্ত বোলিং করে ২১ রানে শিকার করেন তিন উইকেট। যা ছিল তাঁর ওই আসরের সেরা বোলিং ফিগার। তাছাড়া নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও তিন উইকেট শিকার করেন তিনি। ওই আসরে পাঁচ ম্যাচ খেলে মোট আট উইকেট শিকার করেন ডোনাল্ড। 

১৯৯৯ বিশ্বকাপ ছিল ডোনাল্ডের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সোনালী সময়। সেই আসরে নয় ম্যাচ খেলে ১৬টি উইকেট শিকার করেন। যাতে তাঁর গড় ছিল ২০.৩১। ‘৯৯ এর বিশ্বকাপে ডোনাল্ডের সেরা বোলিং ফিগার ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ম্যাচটিতে আট ওভার বল করে ১৭ রান দিয়ে নিয়েছিলেন চার উইকেট। তাছাড়া অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও চার উইকেট নেন তিনি।

২০০৩ বিশ্বকাপ ছিল তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। তবে প্রথম বিশ্বকাপের মতো সুখকর ছিলোনা শেষ বিশ্বকাপের স্মৃতি। ওই আসরে চার ম্যাচ খেলে মাত্র এক উইকেট শিকার করেন তিনি এবং ওই আসরে তার দল গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়ে যায়।

এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী

গ্যারি কার্স্টেন(আরব আমিরাতের বিপক্ষে অপরাজিত ১৮৮ রান)

গ্যারি কার্স্টেন ছিলেন প্রোটিয়াদের মধ্যে প্রথম খেলোয়াড় যিনি বিশ্বকাপ মঞ্চে  শতক পূর্ণ করেন। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে আরব আমিরাতের বিপক্ষে শতকটি করেন তিনি। শতকের পাশাপাশি ওই ম্যাচে তিনি আরেকটি রেকর্ড করেন। তবে সেটি শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য নয়, রেকর্ডটি ছিল পুরো বিশ্বকাপ ইতিহাসের জন্য।

Image Source: ICC

ম্যাচটিতে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংস খেলেন তিনি। ইনিংসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ৫০ ওভার খেলে ১৩ চার আর ৪ ছক্কায় অপরাজিত ১৮৮ রান করেন। তাঁর এই রেকর্ড ২০১৫ বিশ্বকাপ পর্যন্ত বহাল ছিল।

২০১৫ বিশ্বকাপে কার্স্টেনের রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন রেকর্ডের জন্ম দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাটসম্যান ক্রিস গেইল। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১০ চার আর ১৬ ছয়ের ২১৫ রানে বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে নতুন রেকর্ডের জন্ম দেন তিনি। যা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে করা সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস।

সেরা বোলিং ফিগার

অ্যান্ড্রু হল(৫/১৮)

২০০৭ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা সেমিফাইনালে খেলার পিছনে বল হাতে গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন অ্যান্ড্রু হল। সেমিফাইনালে উঠার লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিতে জয় অত্যাবশ্যক ছিল প্রোটিয়াদের জন্য। আর এই গুরত্বপূর্ণ ম্যাচটিতে হল একাই বিধ্বস্ত করেন ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইন আপ। ডানহাতি এই ফাস্ট বোলারের গতি ও সুইংয়ের কাছে সেদিন পরাস্থ হয়েছিলো ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা।

Image Source: ICC

দ্বিতীয় স্পেলে বল করতে এসে মাত্র আট বল করে নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। সব মিলিয়ে পুরো ইনিংসে ১০ ওভার বল করে ১৮ রান দিয়ে ৫ উইকেট নেন হল। পল কলিংউড, অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ, পল নিক্সান, সাজিদ মাহমুদ ও জেমস অ্যান্ডারসন তার শিকার হন। তার অসাধারণ বোলিংয়ে মাত্র ১৫৪ রানে গুটিয়ে যায় ইংলিশদের ইনিংস।

বিশ্বকাপে অ্যান্ড্রু হলের এই অসাধারণ বোলিং ফিগার আজও কোন প্রোটিয়া বোলার স্পর্শ করতে পারেননি। ভাঙ্গতে পারেননি তার এই রেকর্ড। প্রোটিয়াদের হয়ে তিনিই এখনো এক ইনিংসে কম খরচে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি বোলার।

Featured Image: ICC

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *