বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রান দেওয়া পাঁচজন বোলার

ক্রিকেট মানেই বোলার ও ব্যাটসম্যানদের মধ্যে একধরনের যুদ্ধ। যেখানে এক পক্ষের অস্ত্র ব্যাট আর অন্য পক্ষের অস্ত্র হচ্ছে বল। ব্যাটসম্যানরা তাদের অস্ত্র ব্যাট দিয়ে বোলারদের করা বলকে পিটিয়ে বাউন্ডারি ছাড়া করতে তৎপর থাকেন অপরদিকে বোলারেরা তাদের বল দিয়ে উইকেট ভেঙ্গে দিয়ে ব্যাটসম্যানদের মাঠ ছাড়া করার চেষ্টায় থাকেন। আর সেটা যদি হয় ক্রিকেটে শ্রেষ্ঠত্ব লড়াইয়ের আসর তাহলে তো সেই প্রতিযোগিতাটি হয়ে উঠে আরো জাকজঁমক পূর্ণ।

বিশ্বকাপ ট্রফি; Image Source: skysports

ইংল্যান্ডে চলছে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ১২তম আসর। ইংলিশ কন্ডিশনে সাধারণত ব্যাটসম্যানদের দাপটই থাকে সবসময়। বোলাদের তুলোধুনো করে ছাড়েন ব্যাটসম্যানরা। যা চলতি আসরেই দেখা মিলছে এবং সর্বশেষ আফগানিস্তান বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচেও বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা বোলার রশিদ খানকেও ছাড় দেয়নি স্বাগতিক দলের ব্যাটসম্যানরা। ওয়ানডে ক্রিকেটে রশিদ খানের ইকোনমি রেট যেখানে ৪.০৯ সেখানে এই ম্যাচে ৯ ওভার বল করে ১২.২২ ইকোনমি রেটে ১১০ রান দিয়েছেন তিনি। তাহলে আসুন দেখে নিই, বিশ্বকাপ ক্রিকেট ইতিহাসে এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশি রান খরচ করা পাঁচজন বোলারের তালিকা।

অশান্ত ডিমেল (৯৭ রান)

অশান্ত লাকদাসা ফ্রান্সিস ডিমেল, আশির দশকে শ্রীলঙ্কা দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। তিনি ছিলেন দলের নির্ভরযোগ্য একজন মিডিয়াম-ফাস্ট বোলার। এমনকি বর্তমানে শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে এখনও ক্রিকেটের সাথেই আছেন তিনি।

প্রধান নির্বাচকের দায়িত্বে অশান্ত ডিমেল; Image Source: Daily News

ক্যারিয়ারের শেষ দিকে অঅর্থাৎ ১৯৮৭ সালে বিশ্বকাপের সপ্তম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হয় অশান্ত ডিমেলের শ্রীলঙ্কা। টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিন্ধান্ত নেয় শ্রীলঙ্কা। ব্যাট করতে নেমে প্রথমেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে তৃতীয় উইকেট জুটিতে দলের জন্য বেশ বড় সংগ্রহ এনে দেন ডেসমন্ড হেইন্স ও স্যার ভিভ রিচার্ডসন। ম্যাচটিতে অশান্ত ডিমেলকে বেশ শাসন করেছেন এই দুই ব্যাটসম্যান। ১০ ওভার বল করে ৯.৭০ ইকোনমি রেটে ৯৭ রান দিয়েছিলেন ডিমেল। সাথে ভিভ রিচার্ডসনের উইকেটটিও শিকার করেছিলেন তিনি।

ম্যাচটিতে ভিভ রিচার্ডসন ও ডেসমন্ড হেইন্সের জোড়া সেঞ্চুরিতে ৫০ ওভার শেষে ৩৬০ রানের বিশাল স্কোর গড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জবাবে ৫০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৬৯ রান করতে সক্ষম হয় শ্রীলঙ্কা। ফলে ১৯১ রানের বড় ব্যবধানে হেরে যায় অশান্ত ডিমেলের দল।

দৌলত জাদরান (১০১ রান)

আফগানিস্তান দলের বর্তমানে অন্যতম সেরা ফাস্ট-মিডিয়াম বোলার দৌলত জাদরান। চলতি বিশ্বকাপেও বেশ ভালো বল করছেন তিনি। তবে গত বিশ্বকাপ অথাৎ ২০১৫ সালে বিশ্বকাপের ২৬তম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা তাকে তুলোধুনো করেছিল। শুধু তার বলেই না, সেদিন আফগানিস্তানের প্রতিটি বোলারের উপরই নির্মম শাসন চালিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানরা।

দৌলত জাদরান; Image Source: Samachar Nama

ম্যাচটিতে টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় আফগানিস্তান। ব্যাট করতে নেমে প্রথমে উইকেট হারালেও দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ আফগান বোলারদের প্রতি আগ্রাসী হয়ে ব্যাটিং করেন। গড়েন ২৬০ রানের অসাধারণ জুটি। এরপর গ্লেন ম্যাক্সওয়েল খেলেন ৩৯ বলে ৮৮ রানের ধ্বংসাত্মক ইনিংস। ওয়ার্নার করেন ১৭৮ রান। এই সুবাদে ৫০ ওভার শেষে ৪১৭ রানের বিশাল স্কোর গড়ে অস্ট্রেলিয়া।

দৌলত জাদরান ১০ ওভার বল করে ১০.১০ ইকোনমি রেটে ১০১ রান দেন এবং ২টি উইকেট তুলে নেন। যা বিশ্বকাপ ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রান খরচ করা বোলারদের তালিকায় শীর্ষ চারে জায়গা করে দিয়েছে জাদরানকে। পরে ব্যাট করতে নেমে ১৪২ রানেই গুটিয়ে যায় আফগান ব্যাটসম্যানরা। হেরে যায় রেকর্ড পরিমাণ ২৭৫ রানে।

জেসন হোল্ডার (১০৪ রান)

ওয়েস্ট ইন্ডিজের দলীয় অধিনায়ক জেসন হোল্ডার বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম সেরা বোলিং অলরাউন্ডার। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে তাকেও ছাড় দেয়নি দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানরা৷

বিশ্বকাপের ১৯তম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে জেসন হোল্ডারের বোলিং তোপে বেশ চাপে পড়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রথম স্পেলে ৫ ওভারে মাত্র ৯ রান দিয়ে ১ উইকেট তুলে নেন হোল্ডার।

জেসন হোল্ডার; Image Source: Daily Telegraph

তবে ৩০তম ওভারে এবি ডি ভিলিয়ার্স ও রাইলি রুশো উইকেটে এসেই পরের ওভার থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোলারদের উপর ব্যাটিং তাণ্ডব চালায়। দ্বিতীয় স্পেলে এসে ২০ রান দেন জেসন হোল্ডার৷ এবং তৃতীয় স্পেলে এসে যথাক্রমে ১১, ৩৪ ও ৩০ রান দেন তিনি। সবমিলিয়ে ১০ ওভারে ২ ওভার মেইডেন নিয়ে ১০.৪ ইকোনমি রেটে ১০৪ রান দেন হোল্ডার। যা বিশ্বকাপ ক্রিকেট ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ।

ম্যাচটিতে ডি ভিলিয়ার্সের ৬৬ বলে ১৬২ রান ও রাইলি রুশোর ৬১ রানের ধ্বংসাত্মক ইনিংসের সুবাদে ৪০৮ রান সংগ্রহ করে দক্ষিণ আফ্রিকা। ব্যাটিং ব্যর্থতায় ২৫৭ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ৷

মার্টিন স্নেডেন (১০৫ রান)

আশির দশকে নিউজিল্যান্ড দলের অন্যতম মিডিয়াম-ফাস্ট বোলার ছিলেন মার্টিন স্নেডেন৷ ১৯৮৩ সালের তৃতীয় বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয় স্নেডেনের দল নিউজিল্যান্ড।

মার্টিন স্নেডেন; Image Source: Cricket Country

টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নামে ইংল্যান্ড। অ্যালেন লাম্বের সেঞ্চুরির উপর ভর করে নির্ধারিত ৬০ ওভারে ৩২২ রান সংগ্রহ করে তারা। সেই সময়কার একদিনের ক্রিকেটে প্রতিটি দল ৬০ ওভার করে ব্যাটিং করতো এবং প্রতিটি বোলার সর্বোচ্চ ১২ ওভার করে বল করতে পারতেন। 
মার্টিন স্নেডেন ১২ ওভার বল করে ১ ওভার মেডেন ও ২টি উইকেট নিয়ে ৮.৭৫ ইকোনমি রেটে ১০৫ রান দেন। যা বিশ্বকাপ ক্রিকেট ইতিহাসে এক ইনিংসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

বিশাল টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ২১৬ রানেই গুটিয়ে যায় স্নেডেনের দল। ফলে ১০৬ রানের হার নিয়ে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল নিউজিল্যান্ডের।

রশিদ খান (১১০ রান)

বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা স্পিনার বোলার হলেন রশিদ খান। দলের হয়ে তার পারফরম্যান্স যেমন নজরকাড়া, ঠিক তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফ্রাঞ্চাইজি লিগ গুলোতেও বেশ দাপটের সাথে বিচরণ করে আসছেন রশিদ খান।

তবে চলতি বিশ্বকাপের ২৪তম ম্যাচে ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের কাছে কোনো পাত্তাই পাননি রশিদ খান। প্রথম ও দ্বিতীয় স্পেলে যথাক্রমে ৯ ও ২০ রান দেন তিনি। এরপর তৃতীয় স্পেলে ২ ওভারে ২৫ রান দেন। এরপর শুরু হয় জো রুট ও এউইন মরগানের ব্যাটিং তান্ডব। চতুর্থ স্পেলে বল করতে এসে ৪৩ ও ৪৫তম ওভারে ৪২(২১+২১) রান দেন তিনি। শেষে ৪৯তম ওভারে ১৪ রান খরচ করেন তিনি। সবমিলিয়ে ৯ ওভার বল করে ১২.২২ ইকোনমি রেটে ১১০ রান দেন রশিদ খান। যা বিশ্বকাপ ক্রিকেট ইতিহাসে এক ইনিংসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল রানের তালিকায় শীর্ষে।

রশিদ খান; Image Source: India Today

এউইন মরগানের ৭১ বলে ১৪৮ রানের সুবাদে ৩৯৭ রানের পাহাড় সমান স্কোর গড়ে ইংল্যান্ড। বিশাল টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ২৪৭ রান করতে সক্ষম হয় আফগানিস্তান। হেরে যায় ১৫০ রানে।

Featured Image Source: Twitter

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *