পুরুষদের চেয়ে কী নারী ক্রিকেট অধিক সুন্দর?

বর্তমান সময়ে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও ক্রিকেট মাঠ মাতাচ্ছেন। অনেকের কাছেই মনে হতে পারে নারী ক্রিকেটের যাত্রা হয়তো কয়েক দশকের। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নারী ক্রিকেটের শত বছরের অধিক পুরনো ইতিহাস রয়েছে। প্রথম নারী ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ১৭৪৫ সালে। সাদা পোশাকে ব্রেমলি ও হ্যাম্বলডন নামক দুইটি দলের মধ্য দিয়ে এই ইতিহাস রচিত হয়। এর প্রায় ১৫০ বছর পরে প্রথম নারী ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৮৭ সালে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে প্রতিষ্ঠিত সেই ক্লাবের নাম ছিল হোয়াইট হিথার ক্লাব। এর তিন বছর পরে অরিজিনাল ইংলিশ লেডি ক্রিকেটারস নামে আরো একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়।

হোয়াইট হিথার ক্লাবের নারী ক্রিকেটাররা; Image Source: Twitter

অস্ট্রেলিয়ায় ১৮৯৪ সালে নারীদের ক্রিকেট লিগ চালু হয়। সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার পোর্ট এলিজাবেথে পাইওনিয়ার ক্রিকেট ক্লাব নামে একটি প্রমিলা ক্রিকেট ক্লাব ছিল। ১৯৫৮ সালে আন্তর্জাতিক নারী ক্রিকেট কাউন্সিল প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৫ সালে এই সংস্থাটি আন্তজার্তিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)’র সাথে একীভূত হয়। বর্তমানে পুরুষদের জন্য যে সকল টুর্নামেন্ট আইসিসি আয়োজন করে, ঠিক একই ধরনের টুর্নামেন্ট নারীদেরও রয়েছে।

পুরুষদের তুলনায় নারী ক্রিকেটে এখনো অর্থ, যশ, খ্যাতি তুলনামূলক কম। একজন পুরুষ ক্রিকেটার যে পরিমাণ ম্যাচ ফি পান, তার চেয়ে কয়েক গুণ কম পান একজন নারী ক্রিকেটার। এরপরও নারীরা তাদের সবটুকু উজাড় করে দিচ্ছেন ক্রিকেটকে ভালোবেসে। উপমহাদেশে একজন নারীর পক্ষে অ্যাথলেট হওয়া এখনো বেশ কঠিন। ক্রিকেটার হওয়ার জন্য অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয় একজন নারীকে। আর সেই কারণে নারী ক্রিকেটাররা সবসময়ই তাদের ক্যারিয়ারকে রাখতে চান বিতর্কের ঊর্ধ্বে।

দক্ষিণ আফ্রিকা নারী ক্রিকেট দল; Image Source: Getty Images

এই যেমন অস্ট্রেলিয়ার কথাই ধরা যাক। গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়ে বল টেম্পারিং করে বসলেন ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথের মতো খেলোয়াড়। এর জন্য অজি ক্রিকেটকে বড় লজ্জায় পড়তে হয়েছে। কলঙ্কিত হয়েছে তাদের ক্রিকেটীয় অর্জন। সেদিক থেকে অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেট দল পুরোপুরি ভিন্ন। পুরুষদের মতো অজিদের নারী দলও সবকিছুর বিনিময়ে জয় পেতে চান। তবে তারা সবটুকুই ক্রিকেটের পরিশুদ্ধ নিয়মের মধ্যে থেকে করেন। অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেট দলকে স্বচ্ছ ক্রিকেটের সার্টিফিকেট দিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। এর অর্থ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেটাররা পুরুষদের চেয়েও সৎ।

২০১৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আইসিসি কোড অব কনডাক্ট ভাঙার জন্য ডিমেরিট পয়েন্ট চালু করে। সেই সময় থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিলের ১ তারিখ পর্যন্ত পুরুষদের ক্রিকেটে ১৪৫ বার কোড অব কনডাক্ট ভাঙা হয়েছে। এর মধ্যে ১২৪ বারই ছিল লেভেল ওয়ানের। আর লেভেল টু ছিল ১৮ বার এবং লেভেল থ্রি ছিল ৩ বার। একই সময় নারী ক্রিকেটে কোড অব কনডাক্ট ভাঙার ঘটনা ঘটেছে মাত্র ১৮ বার। এর সবগুলোই ছিল লেভেন ওয়ানের। এই ১৮টি ঘটনার মধ্যে ২টির জন্য দায়ী দলের পুরুষ স্টাফরা। পুরুষদের ক্রিকেটে প্রতি ৭.৬ ম্যাচে একটি করে কোড অব কনডাক্ট ভাঙার ঘটনা ঘটে। বিপরীতে নারী ক্রিকেটে ঘটছে প্রতি ২৫ ম্যাচে।

তাহলে কী নারী ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই?

কোড অব কনডাক্ট ভাঙার পরিসংখ্যান দেখে মনে হতে পারে নারী ক্রিকেটে কোনো উত্তেজনা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও লড়াকু মানসিকতা নেই। কিন্তু এটি পুরোপুরি ভুল ধারণা। পুরুষদের মতোই নারী ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্লেজিং ও চতুরতা রয়েছে। নারী ক্রিকেটে স্লেজিং নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক রয়েছে। ২০১৭ সালে অ্যাশেজের আগে অজি ক্রিকেটার এলিসা হিলি ইংলিশ নারী ক্রিকেটারদের উদ্দেশ্য করে একটি বাজে মন্তব্য করেন। তার সেই মন্তব্য নিয়ে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

নারীদের বিগ ব্যাশে দুই অজি ক্রিকেটার; Image Source: Getty Images

১৯৯৮ সালে নারীদের অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়ানরা ইংলিশ ক্রিকেটারদের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য পিচের মধ্যে একটি ক্যান্ডি কোম্পানির লোগো অঙ্কন করে। এছাড়া ম্যাচ বাঁচানোর জন্য ভারতের নারী ক্রিকেটারদের সময় নষ্ট করার ঘটনাও রয়েছে। নারী ক্রিকেটের বিভিন্ন ঘটনা সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ হয়না। যার ফলে অনেক ঘটনা আড়ালে পড়ে যায়। তবে পুরুষদের মতো নারী ক্রিকেটাররা সবসময়ই চেষ্টা করেন দলকে জেতানোর জন্য। আর তাদের এই মানসিকতার জন্যই ধীরে ধীরে জমজমাট হয়ে উঠছে নারী ক্রিকেট।

সৌহার্দপূর্ণ নারী ক্রিকেট

প্রথম সারির ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোর পুরুষদের পাশাপাশি নারী ক্রিকেট দলও রয়েছে। তবে সব দেশেই নারী ক্রিকেট এখনো প্রতিষ্ঠিত নয় এবং নারী ক্রিকেটকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার মতোও নয়। এমনকি ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশেও নয়। আর এ কারণেই নারী ক্রিকেটাররা চান না ক্রিকেটের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার পর একটি ম্যাচ বা একটি জয়ের জন্য নিজের নামকে বিতর্কিত করতে। ক্রিকেট তাদের জীবনের এক ক্ষুদ্র অংশ। কিন্তু সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ নিজেকে সৎ রাখা।

ভবিষ্যতের নারী ক্রিকেটারদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন বর্তমানের তারকারা; Image Source: Getty Images

অনেক প্রতিষ্ঠিত নারী ক্রিকেটার এখনো ফুলটাইম জব করেন। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররাও। অজি ক্রিকেটার লিসা স্টলেকার বলেন,

আমাদের সবারই ফুলটাইম জব আছে। তাই অন্যদের মতো আমাদের অনেক বেশি সময় নেই। আমাদের অনেক কিছু করতে হয়। প্রতিটি সিরিজ আমাদের কাছে একটি সফর। কিন্তু খুবই ভেবেচিন্তে আমাদের খেলতে হয় এবং চাকরি ও খেলার মধ্যে সমন্বয় করতে হয়।

পুরুষ ক্রিকেটারদের মতো নারীরা সারাবছর খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারেন না। এই কারণে তারা যখন কোনো সিরিজ খেলতে যান তখন বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের শত্রুর চেয়ে বন্ধু ভাবেন অধিক। খেলার মাঠে তারা কাউকে ছেড়ে কথা না বললেও মাঠের বাইরে তারা ঘনিষ্ঠভাবে মেশার চেষ্টা করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মিগনন ডু প্রিজ বলেন,

আমরা সবার প্রথমে ভালো মানুষ হতে চাই। তারপর ভালো ক্রিকেটার। আমাদের বড় পরিচয় ক্রিকেটার। কিন্তু এর চেয়ে বড় বিষয় হলো আমরা নারী, আমাদের বন্ধু ও পরিবার রয়েছে। ক্রিকেট আমাদের জীবনের অংশ। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে নয়।

নারী ক্রিকেটারদের জীবনে পরিবারের গুরুত্ব

ছেলেদের ক্রিকেটের চেয়ে মেয়েদের ক্রিকেটে পরিবারের গুরুত্ব অনেক বেশি। অধিকাংশ নারী ক্রিকেটারের প্রথম কোচের দায়িত্ব পালন করেন বাবা। এর বড় উদাহরণ এলিসি পেরি ও স্মৃতি মান্ধানার বাবা।

স্মৃতি মান্ধানা; Image Source: Getty Images

ক্রিকেট মোটামুটি ব্যয়বহুল খেলা। ক্রিকেটের সরঞ্জাম কেনার জন্য বেশ অর্থের প্রয়োজন। ছেলেরা বিভিন্ন লিগ খেলার মাধ্যমে সেই অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু মেয়েদের পুরোপুরি তার পরিবারের উপর নির্ভর করতে হয়। এক্ষেত্রে পরিবার থেকে সাহায্য না করলে অনেক মেয়েরই ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে যায়। বর্তমানে নারীদের পেশাদার ক্রিকেট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ঘরোয়া লিগ থেকে শুরু করে ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক টি টোয়েন্টি লিগ চালু হয়েছে, যার ফলে মেয়েরাও এখন ক্রিকেটকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়া শুরু করেছে। এবং এক্ষেত্রে পরিবার থেকে আগের চেয়ে বেশি সমর্থন মিলছে।

নারী ক্রিকেট কী পুরুষ ক্রিকেটের চেয়ে সুন্দর?

পুরুষদের চেয়ে নারী ক্রিকেট সুন্দর, এই বিষয়টি অনেকেই মেনে নিতে রাজি নন। এর মধ্যে রয়েছেন ক্রিকেট ঐতিহাসিক রাফ নিকোলসন। তার মতে,

কিছু ক্ষেত্রে নারী ক্রিকেট পুরুষদের চেয়েও সুন্দর। কিন্তু এক্ষেত্রে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি ক্রিকেটের জন্য ক্ষতিকর। কেননা মাঠের ক্রিকেটে নারী ও পুরুষের মধ্যে এখন খুব বেশি পার্থক্য নেই। মূলত আমরা পুরুষদের চেয়ে নারীদের থেকে ভালো কিছু আশা করি। কিন্তু আমাদের উচিৎ উভয়ের কাছে থেকে সমান প্রত্যাশা করা।

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জনপ্রিয়তার দিক থেকে নারী ক্রিকেট এখনো বেশ পিছিয়ে। তবে নারীদের ক্রিকেট সংস্কৃতি সত্যিকার অর্থেই পুরুষদের চেয়ে সুন্দর। সেই দিক থেকে নারী ক্রিকেটকে পুরুষদের চেয়ে সুন্দর বলা যেতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে কেউ কারো চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

Featured Image Source: Getty Images

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *