গত ২০ বছরে ওডিআই ক্রিকেটের পরিবর্তনের পরিসংখ্যান

বর্তমানে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বিশ্ব মাতাচ্ছে যে খেলাগুলো তার মধ্যে অন্যতম ক্রিকেট। ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট টেস্ট, ওডিআই এবং টি টোয়েন্টির মধ্যে ওডিআই এখনো বেশ জনপ্রিয় ফরম্যাট। যদিও টি টোয়েন্টি ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা সর্বাধিক।

ওডিআই ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার কারণ হচ্ছে বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া এর নানারকম পরিবর্তন। আজকের দিনের ওডিআই ক্রিকেট গত কয়েক বছর আগে ঠিক এমন ছিল না। সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে এর নানা নিয়ম কানুন ও খেলার কলাকৌশল। চলুন জেনে নেওয়া যাক গত বিশ বছরে ওডিআই ক্রিকেটের কেমন পরিবর্তন হয়েছে।

ডিফেন্ড অর চেজ

ওডিআই ক্রিকেটে পরিবর্তনের কথা বলতে গেলে কেন্দ্রবিন্দুতে যে বিষয়টি থাকে সেটি হলো ডিফেন্ড অথবা চেজ। বিশেষ করে যখন দিন ও রাতের সমন্বয়ে ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হয় তখন এই বিষয়টিকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়। কেননা অনেকেই ধারণা করেন যে এই বিষয়টি অনেক সময় ম্যাচ জেতার জন্য অনেকটা সহায়ক হয়।

বিগত বছরগুলোতে ক্রিকেটের এই বিষয়টিতে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ১৯৯৬ সালের পর থেকে শুধু দিনের বেলায় যেসব ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে তার বেশিরভাগ ম্যাচেই দলীয় ক্যাপ্টেইনদের টসে জিতে ফিল্ডিং করার প্রবণতা বেশি ছিল। আর ধীরে ধীরে এই পরিসংখ্যান বাড়তে থাকে।

যেমন ১৯৯৬ সাল থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে শুধু দিনের বেলায় যেসব ম্যাচ হয়েছে সেগুলোর মধ্যে শতকরা ৫৩% ম্যাচে অধিনায়করা ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আবার ২০০৩ থেকে ২০০৬ সালে শতকরা ৫৫% ম্যাচেই ফিল্ডিং করা হয়। পরে ২০১৪ সালে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৭০% এ। ২০১৮ সালে তা কিছুটা কমে ৫৪% এ এসে পৌছে।

সালব্যাটিং ফার্স্টবোলিং ফার্স্ট
১৯৯৬-৯৮৪৭%৫৩%
১৯৯৯-২০০২৫১%৪৯%
২০০৩-০৬৪৫%৫৫%
২০০৭-১০৪৩%৫৭%
২০১১-১৪৩০%৭০%
২০১৫-১৮৪৬%৫৪%

শুধুমাত্র দিনের বেলা অনুষ্ঠিত ম্যাচের ক্ষেত্রে;

অপরদিকে দিন ও রাতের সমন্বয়ে যেসব ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে সেক্ষেত্রে হিসেবটা একটু উল্টো। যেখানে শুধু দিনে অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলোতে টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসংখ্যান ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছিল এক্ষেত্রে তা একটু কমে গেছে অর্থাৎ ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত বেড়ে গেছে।

এক্ষেত্রে দেখা যায় ১৯৯৬ – ৯৮ সালে টসে জিতে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে শতকরা প্রায় ৬৭% ম্যাচে। ২০০৩- ০৬ সালে এই পরিসংখ্যান বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮% এ। পরে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মধ্যে এ সংখ্যা একটু কমে যথাক্রমে ৬০% ও ৬২% এ পৌছেছে।

সালব্যাটিং ফার্স্টবোলিং ফার্স্ট
১৯৯৬-৯৮৬৭%৩৩%
১৯৯৯-২০০২৭৯%২১%
২০০৩-০৬৭৮%২২%
২০০৭-১০৭৩%২৭%
২০১১-১৪৬০%৪০%
২০১৫-১৮৬২%৩৮%

দিন ও রাতের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত ম্যাচের ক্ষেত্রে;

অধিনায়কদের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনের কারণটা অনেকটা যথার্থই ছিল। কেননা শুধু দিনের বেলা অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলোতে যে দল ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তার বেশিরভাগ ম্যাচে তারাই জয় পেয়েছে। অন্যদিকে দিন ও রাতের সমন্বয়ে যে ম্যাচগুলো হয়েছে সেক্ষেত্রে যারা ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাদের জয় পাওয়ার সংখ্যাই বেশি।

অনুষ্ঠিত ম্যাচের সংখ্যা

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম ওডিআই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালে। শুরুর দিকে তেমন একটা বেশি সংখ্যার ম্যাচ খেলতে দেখা যায়নি দেশগুলোকে। কিন্তু সময় যত অতিবাহিত হয়েছে খেলার প্রবণতাটাও যেন অনেক বেশি বেড়ে গেছে। আর সেই কারণেই বিগত বছরগুলোর তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে।

ওডিআই ক্রিকেটের শুরুর সময়ে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া মোটামুটিভাবে অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে ছিল। বাকি যে দেশগুলো রয়েছে তারা এই দুই দেশের প্রায় অর্ধসংখ্যক ম্যাচে অংশগ্রহণ করতো। ১৯৯৬-৯৮ সালে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া যথাক্রমে শতকরা ১৮ ও ১৯ ভাগ ওডিয়াই ম্যাচে অংশগ্রহণ করেছে।

ওডিআই ম্যাচ খেলার হার; image source: ESPNCricinfo

একই সময়ে বাকি দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা শতকরা ৯ ভাগ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১১ ভাগ, ভারত ৭ ভাগ ও পাকিস্তান ২ ভাগ ম্যাচে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনুষ্ঠিত একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোর বেশিরভাগই খেলছে সেই পিছিয়ে থাকা দেশগুলোই। তার সব থেকে বড় উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বাংলাদেশের কথা।

১৯৯৬ সালে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অভিষেকই হয়নি। কিন্তু সেই বাংলাদেশ ২০১৫-১৮ সালের মধ্যে খেলছে শতকরা ১৮ ভাগ ওডিআই ম্যাচ। বাংলাদেশের পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানের কথা না বললেই নয়। কেননা উইন্ডিজ ও পাকিস্তান অতীতের তুলনায় যথাক্রমে শতকরা ২৪ ও ২৬ ভাগ বেশি খেলছে শুধুমাত্র ওডিআই ম্যাচ। তাই এক্ষেত্রে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেশ পরিবর্তন ঘটেছে।

বাউন্ডারি এবং ওভার বাউন্ডারির সংখ্যা

ওডিআই ফরম্যাটের পরিবর্তনের রেশ রয়েছে প্রায় সব জায়গায়। আর সেখান থেকে পরিবর্তন ঘটেছে বাউন্ডারি ও ওভার বাউন্ডারি হাঁকানোর দিকেও। তবে ২০০০ সালের পর থেকে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই পরিবর্তন ছিল সবথেকে বেশি।

বাউন্ডারি হাঁকানোর হার; image source: thecricketmonthly.com

দেখা গেছে ২০০০ সালের কাছাকাছি সময় ব্যাটসম্যানরা প্রতি ম্যাচে বাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন ৩৫ এর কাছাকাছি এবং ওভার বাউন্ডারি ৫ টির কাছাকাছি। কিন্ত এই সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৭ সালের মধ্যে বেড়ে দাঁড়ায় ম্যাচপ্রতি বাউন্ডারি ৬৫টি এবং ওভার বাউন্ডারি ১৫টির কাছাকাছি। তবে এই সংখ্যা পরবর্তী সময়ে আবারো হ্রাস পেয়ে যথাক্রমে ৪৫ ও ১০ এর আশেপাশে চলে এসেছে।

বোলিং পরিবর্তন

ওডিআই ক্রিকেটে শুধু বাউন্ডারি হাঁকানোতেই পরিবর্তন ঘটেনি, ঘটেছে বোলিং লাইন আপেও। শুরুতে ম্যাচের প্রথম দশ ওভারে স্পিন বোলাররা তেমন একটা সুযোগ পেতেন না। ২০০৩ সালের কাছাকাছি সময়ের ম্যাচগুলোতে নতুন বল হাতে একজন স্পিনার প্রথম ১০ ওভারে গড়ে বল করতেন ১.৪টি। কিন্তু বর্তমানে এই সংখ্যা ১৪টিতে।

আইসিসি ওয়ার্ল্ড কাপে শীর্ষ বোলারদের তালিকা; image source: ESPNCricinfo

স্পিনাররা শুধু বেশি সংখ্যক বল করাতেই থেমে নেই। তারা স্পিনের জাদুতে আদায় করে নিচ্ছে নিত্য নতুন সব রেকর্ড। আইসিসি ওয়ার্ল্ড কাপে শীর্ষ বোলারদের মধ্যে স্পিনারদের রেকর্ডই বেশি। ১৯৯৯ বিশ্বকাপ থেকে ২০১৫ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ৫টির মধ্যে তিনটিতেই সেরা বোলারদের শীর্ষে রয়েছে স্পিন বোলাররা।

ব্যাটিং লাইন আপে পরিবর্তন

পরিবর্তনের ধারায় গত বিশ বছরে পরিবর্তিত হয়েছে ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং লাইনও। ১৯৯৬ সালের দিকে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানরা যে স্ট্রাইক রেটে রান তুলতেন তাদের থেকে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানরা বেশ পিছিয়ে ছিল। কিন্তু বর্তমানে উভয় ধরণের ব্যাটসম্যানদের রান তোলার ক্ষেত্রে স্ট্রাইকরেট অনেকটা কাছাকাছি এবং তা আগের তুলানায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যাটসম্যানদের স্ট্রাইক রেটের পরিবর্তন; image source: thecricketmonthly.com

১৯৯৬-৯৮ সালের মধ্যে দ্রুত রান সংগ্রহকারী ব্যাটসম্যানদের স্ট্রাইক রেট ছিল গড়ে ৮০.৫৮ এবং সাধারণ ব্যাটসম্যানদের ছিল ৭৩.৮৯। কিন্তু ২০১৫-১৮ সালের মধ্যে সেই স্ট্রাইক রেট এসে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৯৭.৩৮ এবং ৯২.১৮ তে। আর এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে বিশেষ করে উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে।

Feature image source: thoughtco.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *