ফিরে দেখা ১৯৭৫ বিশ্বকাপ: একদিনের ক্রিকেটে ক্যারিবিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের সূচনা

বর্তমান সময়ের ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। আট জাতির অংশগ্রহণে ইংল্যান্ডের পাঁচটি শহরের ছয়টি ভেন্যুতে ৭ই জুন থেকে ২১শে জুন পর্যন্ত খেলা চলে। তবে সে বার টুর্নামেন্টের নামে বেশ পরিবর্তন ছিল, প্রুডেন্সিয়াল অ্যাসারেন্স কোম্পানি স্পন্সর করায় ‘ক্রিকেট বিশ্বকাপের‘ পরিবর্তে ‘প্রুডেন্সিয়াল কাপ’ নামে পরিচিতি লাভ করে আসরটি।

Image source: zoetakingthefield

১৯৭৫ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের মধ্যে ছিল অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা ও পূর্ব আফ্রিকা। টেস্ট ক্রিকেটের ঐতিহ্য বহন করে সাদা পোশাক আর লাল বলে খেলা হয়। টুর্নামেন্টের সব কয়টি ম্যাচই দিনে অনুষ্ঠিত হয় আর প্রতিটি ইনিংসের দৈর্ঘ্য ছিল ৬০ ওভার।
চলুন জেনে নেওয়া যাক বিশ্বকাপের প্রথম আসর সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য।

চ্যাম্পিয়ন

ওয়েস্ট ইন্ডিজ

আট জাতি নিয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কোন ম্যাচে হার ছাড়াই ফাইনাল নিশ্চিত করে তারা। ফাইনালেও জয় তুলে নিতে ভুল করেনি উইন্ডিজরা। প্রথম আসরেই রেকর্ড সংখ্যক পাঁচ ম্যাচে পাঁচ জয় নিয়ে বিশ্বসেরা দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ক্যারিবিয়ানরা। সেই সাথে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দলের খেতাব অর্জন করে।

গ্রুপ পর্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবস্থান ছিল গ্রুপ ‘বি’ তে অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সাথে। গ্রুপ পর্বের প্রথমে ম্যাচে শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হয় তাঁরা। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে উইন্ডিজদের আক্রমণাত্নক বোলিংয়ে ৮৬ রানে গুটিয়ে যায় তাঁদের ইনিংস। ওই ম্যাচে ৯ উইকেটে বিশাল ব্যবধানের জয় দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করে তারা।

Image source: ICC

গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তানের মুখোমুখি হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ম্যাচটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়। ২৬৬ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে নয় উইকেট হারিয়ে পরাজয়ের শঙ্কা জাগে উইন্ডিজ শিবিরে। ডেরেক মারের অপরাজিত ৬১ রানের দুর্দান্ত ইনিংসে দুই বল বাকি থাকতে নানা নাটকীয়তায় জয় তুলে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৭ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে জয় পায় ক্যারিবিয়ানরা।

গ্রুপ পর্ব শেষে ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে সেমি ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হয় তারা। ম্যচটিতে আগে ব্যাট করেতে নামা কিউই ব্যাটসম্যানদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন উইন্ডিজ বোলাররা। বিশেষ করে বার্নার্ড জুলিয়েন, তিনি ১২ ওভার বল করে মাত্র ২৭ রান দিয়ে একাই শিকার করেন চার উইকেট। সব কয়টি উইকেট হারিয়ে ১৫৮ রানের পুঁজি পায় কিউইরা। জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে আলভিন কালিচরণের ৭২ রানের ইনিংসের উপর ভর করে ৫ উইকেটে জয় তুলে নেয় তারা।

বিশ্বসেরা হওয়ার লড়াইয়ে ফাইনালে উইন্ডিজদের প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে দুর্দান্ত শুরু এনে দেন উইন্ডিজ ব্যাটসম্যানরা। ইনিংস শেষে তাদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮ উইকেট হারিয়ে ২৯১। এর মধ্যে ক্লাইভ লয়েড সর্বোচ্চ ৮৫ বলে ১০২ রান করেন। জবাবে ব্যাট করতে নেমে অজি ব্যাটসম্যানরাও দুর্দান্ত ব্যাটিং করতে থাকেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ১৭ রানের ব্যবধানে হারতে হয় অজিদের। সেই সাথে বিশ্বকাপের প্রথম আসরেই শিরোপা জয়ের স্বাদ গ্রহন করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী

গ্লেন টার্নার(৩৩৩ রান)

নিউজিল্যান্ড দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান ছিলেন গ্লেন টার্নার। বিশ্বকাপের প্রথম আসরে তার ব্যাটিং দৃঢ়তায় সেমিফাইনাল পর্যন্ত খেলতে পারে কিউইরা। সেমিফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে যায় তার দল। টুর্নামেন্টের প্রথম থেকেই তিনি ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ছিলেন। চার ম্যাচ খেলে দুইটিতেই শতক হাঁকান। সে আসরের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রান ও শতক হাঁকানোর রেকর্ডও গড়েন।

Image source: ICC

টার্নার টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে পূর্ব আফ্রিকার বিপক্ষে করেন অপরাজিত ১৭১ রান, যা ছিল আসরের কোন ব্যাটসম্যানের পক্ষে করা সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রান। দ্বিতীয় শতকটির দেখা পান গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে। সে ম্যাচেও অপরাজিত থেকে করেন ১১৪ রান। আর সেমি ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে করেন ৩৬ রান। তাঁর মোট রানের ৫০ ভাগই এসেছিলো পূর্ব আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচটিতে।

সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ও সেরা বোলিং ফিগার

গ্যারি গিলমোর(১১ উইকেট)

গ্যারি গিলমোরের ওডিআই ক্যারিয়ার ততোটা দীর্ঘ ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মাত্র ৫টি ওডিআই খেলেন এই অলরাউন্ডার। অল্পদিনের এই ক্যারিয়ারের মধ্যে সুযোগ পান বিশ্বকাপের প্রথম আসরে অংশগ্রহণ করার। মাত্র দুই ম্যাচ খেলে গড়েন অনন্য এক রেকর্ড। দুই ম্যাচে ১১ উইকেট নিয়ে ওই আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করে নেন তিনি এবং আসরের বোলিং ফিগারটিও রয়েছে তার দখলে।

Image source: ICC

গিলমোর বিশ্বকাপে অভিষিক্ত হন সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। আর অভিষেক ম্যাচে অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্স দিয়ে জয়ের নায়ক বনে যান। তার দুর্দান্ত বোলিংয়ে মাত্র ৯৩ রানে গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ডের ইনিংস। তিনি ১২ ওভার বল করে নেন ছয়টি উইকেট, যা ছিল ওই আসরের সেরা বোলিং ফিগার। আর ব্যাট হাতে অপরাজিত থেকে করেন ২৮ রান।

সেমিফাইনালে জয়ের পর ফাইনালে তাঁরা ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হয়। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে তার দল জিততে না পারলেও তিনি বল হাতে গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। ১২ ওভার বল করে ৪৮ রান দিয়ে নেন পাঁচ উইকেট।

দলীয় সর্বোচ্চ রানের ইনিংস

ইংল্যান্ড(৩৩৪/৪)

১৯৭৫ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই ভারতের বিপক্ষে আসরের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি খেলে ইংল্যান্ড। ৬০ ওভারের ম্যাচটিতে ৪ উইকেট হারিয়ে ৩৩৪ রান সংগ্রহ করে তাঁরা। ম্যাচটিতে তাঁদের পক্ষে সর্বোচ্চ রান করেন ডেনিস অ্যামিস। তিনি ১৪৭ বলে ১৩৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন।

Image source: ICC

তাছাড়া অধিনায়ক মাইক ডেনিসের ৩৭, কিথ ফ্লেচারের ৬৮ ও ক্রিস ওল্ডের অপরাজিত ৫১ রান তাঁদের বড় সংগ্রহ এনে দেয়। রেকর্ডটি শুধু বিশ্বকাপের জন্য ছিল না, বিশ্বকাপের পর আট বছর পর্যন্ত এটিই ছিল একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য সর্বোচ্চ দলীয় দলীয় রান।

Featured Image: ICC

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *