ফিরে দেখা ২০১১ বিশ্বকাপ

ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ২০১১ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপের দশম আসর অনুষ্ঠিত হয়। এই আসরে প্রথমবারের মতো আয়োজকের ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও উদ্বোধনী ম্যাচ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। ১৪ জাতির অংশগ্রহণে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত তিন দেশের ১৩টি স্টেডিয়ামে খেলা চলে।

ফাইনালের টসে দুই দলের অধিনায়ক; Image Source: espncricinfo

অংশগ্রহণ করা ১৪ দলকে দুই গ্রুপে ভাগ করা হয়। গ্রুপ ‘এ’ তে রাখা হয় পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, কানাডা ও কেনিয়াকে আর গ্রুপ ‘বি’ তে রাখা হয় দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডকে। গ্রুপ পর্বের খেলাগুলো রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী পর্বগুলো অনুষ্ঠিত হয় নক আউট পদ্ধতিতে। ফাইনাল খেলে স্বাগতিক দুই দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কা।

চ্যাম্পিয়ন

ভারত

২০১১ বিশ্বকাপে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে এশিয়ানরা। টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়, সেরা বোলার, সেরা ব্যাটসম্যান এমনকি চ্যাম্পিয়নের তকমাটাও তাদের দখলে থাকে। আসরের ফাইনালে উঠে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দুই ক্রিকেট পরাশক্তি ভারত ও শ্রীলঙ্কা। ২৭ বছরের অপেক্ষার পর ফাইনালে লঙ্কানদের হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ গ্রহণ করে ভারতীয়রা।

জয়ের পূর্বমুহূর্তে ধোনির অসাধারণ শট; Image Source: espncricinfo

গ্রুপ পর্বের ৬ ম্যাচের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হার ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ড্র ছাড়া বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে চার জয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে ভারত। কোয়ার্টার ফাইনালে এসে তাদের মুখোমুখি হয় অস্ট্রেলিয়া। সেমিফাইনালে উঠার লড়াইয়ে অজিদের ৫ উইকেটে হারায় তারা। সেমিফাইনালে এসে ভারতের মুখোমুখি হয় তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান। তাদের বিপক্ষেও জয় পায় ভারত।

জয় উদযাপন করছেন ধোনি ও যুবরাজ সিং; Image Source: espncricinfo

ফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হয় শ্রীলঙ্কা। মুম্বাইয়ে টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন লঙ্কান অধিনায়ক কুমার সাঙ্গাকারা। মাহেলা জয়াবর্ধনের দুর্দান্ত শতকে ২৭৪ রান সংগ্রহ করে তারা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে গম্ভীরের ৯৭ ও ধোনির ৯১ রানের উপর ভর করে মাত্র ৪ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পোঁছে যায় মহেন্দ্র সিং ধোনির দল। ফলে ৬ উইকেটের বিশাল ব্যবধানের জয়ে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা নিজেদের করে নেয় ভারতীয়রা।   

ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট

যুবরাজ সিং(১৫ উইকেট এবং ৩৬২ রান)

ভারত ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে ব্যাট ও বল হাতে গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন অলরাউন্ডার যুবরাজ সিং। বল হাতে ১৫ উইকেটের পাশাপাশি ব্যাট হাতে ৩৬২ রান করে আসরের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তিনি। আসরের তার সেরা বোলিং ফিগার ছিল গ্রুপ পর্বে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে, ম্যাচটিতে ৩১ রান দিয়ে ৫ উইকেট শিকার করেন। তাছাড়া গ্রুপ পর্বে নেদারল্যান্ড ও উইন্ডিজদের বিপক্ষে নেন দুইটি করে উইকেট। কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া, সেমিফাইনালে পাকিস্তান ও ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও দুইটি করে উইকেট শিকার করেন তিনি।   

যুবরাজ সিং; Image Source: espncricinfo

ব্যাট হাতে একটি শতকের পাশাপাশি চারটি অর্ধশতক রয়েছে তার। যুবরাজ সিং তার একমাত্র শতকটি পূর্ণ করেন গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ম্যাচটিতে ১২৩ বলে ১১৩ রান করেন তিনি। গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৮ রানে আউট হয়ে গেলেও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৫০ ও নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে ৫১ রানে অপরাজিত থাকেন। কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও ৫৭ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। তবে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ততোটা ভালো করতে পারেননি যুবরাজ সিং।

সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি বোলার

শহীদ আফ্রিদি(২১ উইকেট) ও জহির খান(২১ উইকেট)

২০১১ বিশ্বকাপে যৌথভাবে ২১ উইকেট শিকার করে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির তালিকায় শীর্ষস্থান দখলের লড়াই চালান পাকিস্তানের স্পিন বোলার শহীদ আফ্রিদি ও ভারতীয় পেস বোলার জহির খান। তবে লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত শীর্ষস্থান দখল করে নেন জহির খান থেকে এক ম্যাচ কম খেলা আফ্রিদি। টুর্নামেন্টের প্রথম থেকে সেমি ফাইনাল পর্যন্ত ৮ ম্যাচ খেলে ২১ উইকেট শিকার করেন তিনি এবং জহির খান ফাইনাল পর্যন্ত ৯ ম্যাচ খেলে শিকার করেন ২১ উইকেট।

আফ্রিদি; Image Source: espncricinfo

আসরের প্রথম ম্যাচে কেনিয়ার বিপক্ষে মাত্র ১৬ রান দিয়ে ৫ উইকেট শিকার করে দুর্দান্তভাবে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেন আফ্রিদি। আসরে তার ৫ উইকেট শিকারের বোলিং ফিগার ছিল ২টি এবং ৪টি করে উইকেট শিকার করেন দুই ইনিংসে। গ্রুপ পর্বে কেনিয়া এবং কানাডার বিপক্ষে ৫টি করে উইকেট নেন এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নেন ৪ উইকেট। তাছাড়া নিউজিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নেন ১টি করে উইকেট। কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩০ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিলেও সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে কোন উইকেট পাননি তিনি।

জহির খান; Image Source: espncricinfo

আফ্রিদির মতো জহির খানের শুরুটা দুর্দান্ত ভাবে না হলেও ধারাবাহিক বোলিংয়ে নিয়মিত উইকেট তুলে নেন তিনি। পুরো আসরে ৯ ইনিংসের ৪ ইনিংসেই ৩টি করে উইকেট শিকার করেন যার সব গুলো ছিল গ্রুপ পর্বের ম্যাচে। ম্যাচ গুলোতে প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তাছাড়া গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই উইকেট এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নেন এক উইকেট। কোয়ার্টার ফাইনালে অজিদের বিপক্ষে দুই উইকেট, সেমি ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই উইকেট এবং ফাইনালেও দুই উইকেট শিকার করেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে।

সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী

তিলকরত্নে দিলশান(৫০০ রান)

২০১১ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় প্রথম স্থান দখল করে নেন শ্রীলঙ্কান টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান তিলকরত্নে দিলশান। টুর্নামেন্টের প্রথম থেকে ফাইনাল  পর্যন্ত ৯ ইনিংস ব্যাট করে ৫০০ রান সংগ্রহ করেন তিনি। আসরে দুইটি শতকের পাশাপাশি দুইটি অর্ধ শতকও পূর্ণ করেন। তিনি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ১৪৪ রানের ইনিংসটি খেলেন।

তিলকরত্নে দিলশান; Image Source: espncricinfo

অন্য শতকটি করেন কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ম্যাচটিতে ১১৫ বলে অপরাজিত থেকে ১০৮ রান করেন দিলশান। তাছাড়া গ্রুপ পর্বে কানাডার বিপক্ষে ৫০, পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪১, কেনিয়ার বিপক্ষে ৪৪, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩ রান করেন। সেমিফাইনালে কিউইদের বিপক্ষে ৭৩ ও ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ৩৩ রান করেন।

Feature Image: espncricinfo

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *