ফিরে দেখা ২০০৭ বিশ্বকাপ

২০০৭ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপের নবম আসর ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত হয়। ১৬ জাতির অংশগ্রহণে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৮টি স্টেডিয়ামে ১৩ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত। আসরটি রাউন্ড রবিন ও নক আউট পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণ করা ১৬ দলকে ৪টি গ্রুপে ভাগ করা হয় এবং প্রত্যেক গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই দল করে সুপার এইটে খেলে। তাদের থেকে চার দলকে নিয়ে সেমি ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় এবং দুই দলকে নিয়ে ফাইনাল।

গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে জয়ের পর মুশফিক ও আশরাফুল ; Image Source: espncricinfo

২০০৭ বিশ্বকাপ ছিল নানা রকম চমক ও রেকর্ডে ভরপুর। গ্রুপ পর্বে অন্যতম জনপ্রিয় দুই দল ১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ী পাকিস্তান এবং ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয়ী ভারত শিরোপা লড়াই থেকে ছিটকে যায়। চমক দিয়ে গ্রুপ পর্বের বাধা পেরিয়ে সুপার এইট নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ড। তাছাড়া ১৯৯৯ বিশ্বকাপ থেকে ২০০৭ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ২৯ ম্যাচ খেলে কোন হার ছাড়া টানা তিন বারের বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড করে অস্ট্রেলিয়া।

চলুন জেনে নেওয়া যাক ২০০৭ বিশ্বকাপ সম্পর্কে আরও অজানা কিছু তথ্য।

চ্যাম্পিয়ন

অস্ট্রেলিয়া

১৯৯৯ ও ২০০৩ বিশ্বকাপের পর টানা তৃতীয়বারের মতো ২০০৭ বিশ্বকাপেও চ্যাম্পিয়ন হয় অস্ট্রেলিয়া। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর বিশ্বকাপ ক্রিকেট ইতিহাসের দ্বিতীয় দল হিসেবে টানা তিন বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার অনন্য এক রেকর্ড করে অজিরা। উইন্ডিজ টানা তিন বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়তে ব্যর্থ হলেও সে সুযোগ হাত ছাড়া করেনি তারা। ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে একমাত্র দল হিসেবে টানা তিনবার শিরোপা জয়ের অনন্য এক রেকর্ডের জন্ম দেয় অস্ট্রেলিয়া।

২০০৭ বিশ্বকাপে এক মাত্র দল হিসেবে গ্রুপ পর্ব, সুপার এইট রাউন্ড ও  সেমিফাইনালে কোনো ম্যাচে হার ছাড়াই ফাইনাল নিশ্চিত করে অস্ট্রেলিয়া। গ্রুপ পর্বে তারা স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারায় এবং সুপার এইটে শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে অপরাজিত থেকে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে। ফাইনালে উঠার লড়িয়ে অজিদের মুখোমুখি হয় গ্রুপ পর্ব ও সুপার এইটে হারানো দক্ষিণ আফ্রিকা।

জ্যাক ক্যালিস; Image Source: espncricinfo

ম্যাচটিতে আগে ব্যাট করে মাত্র ১৪৯ রানে অলআউট হয়ে যায় প্রোটিয়ারা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৩ উইকেট হারিয়ে সহজ হয় তুলে নেয় অস্ট্রেলিয়া। সে জয়ে টানা তিনবারের মতো ফাইনালে উঠে যায় তারা। ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন অজি অধিনায়ক রিকি পন্টিং। বৃষ্টি বাধায় ম্যাচটিকে ৫০ ওভার থেকে কমিয়ে ৩৮ ওভারে আনা হয়। ব্যাটিংয়ে নেমে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও ম্যাথু হেইডেনের দুর্দান্ত শুরুতে বিশাল সংগ্রহের পথে এগিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।

ফাইনালে শ্রীলঙ্কার ইনিংসে বৃষ্টি বাধা; Image Source: espncricinfo

মাত্র ২২ ওভার ২ বলে উদ্বোধনী জুটিতে দুই জন মিলে স্কোর বোর্ডে যোগ করেন ১৭২ রান। ইনিংস শেষে গিলক্রিস্টের ১০৪ বলে ১৪৯ রানের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ৪ উইকেট হারিয়ে ২৮১ রানের সংগ্রহ দাঁড়ায় অজিদের। জবাবে ব্যাট করতে নামা লঙ্কানদের ইনিংসে আবারও বৃষ্টি হানা দেয়। ফলে ২ ওভার কমিয়ে ম্যাচ আনা হয় ৩৬ ওভারে। লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৬৯ রানের। বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের ধারাবাহিকতায় জয়ের স্বপ্ন দেখলেও মিডল অর্ডারের ব্যর্থতায় হার এড়াতে পারেনি লঙ্কানরা।

চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া দল; Image Source: espncricinfo

৩৬ ওভার শেষে তাদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮ উইকেট হারিয়ে ২১৫ রান। ফলে ডি/এল মেথডে ৫৩ রানের জয় পায় অস্ট্রেলিয়া।

সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী

ম্যাথু হেইডেন(৬৫৯ রান)

২০০৭ বিশ্বকাপ জয়ী অস্ট্রেলিয়া দলের ব্যাটিং লাইনআপের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সদস্য ছিলেন ম্যাথু হেইডেন। প্রতিটি ম্যাচে অসাধারণ ব্যাটিং করে দলকে জয় এবং বিশাল সংগ্রহ এনে দিতে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১০ ইনিংস ব্যাট করে ৩টি শতক ও ১টি অর্ধ শতক পূর্ণ করেন হেইডেন। প্রতি ইনিংসে দ্রুত রান তোলার জন্য সেবার বেশ নাম কামিয়েছিলেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শতকের পর হেইডেন; Image Source: espncricinfo

হেইডেন তার ৩টি শতকের ১টি করেন গ্রুপ পর্বের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। ম্যাচটিতে ৬৮ বলের ঝড়ো ইনিংসে ১০১ রান করেন। আসরের এক মাত্র অর্ধ শতকটিও পূর্ণ করেন গ্রুপ পর্বের ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। বাকি ২টি শতকই পূর্ণ করেন সুপার এইটে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। সে আসরে তার সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি ছিল উইন্ডিজদের বিপক্ষে। ম্যাচটিতে ১৪ চার আর ৪ ছয়ে ১৪৩ বলে ১৫৮ রান করেন তিনি।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শতকের পর হেইডেন; Image Source: espncricinfo

আসরের তৃতীয় শতকটি পূর্ণ করেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। হেইডেন ১০ ইনিংসের কেবল মাত্র নেদারল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা বিপক্ষে ৪০ রানের কম করেন। বাকি সব ম্যাচে তার রান ছিল ৪০ এর উপরে। ১০ ইনিংস ব্যাট করে মোট ৬৫৯ রান সংগ্রহ করেন তিনি। যা তাকে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় শীর্ষ স্থান দখলে সাহায্য করে।

সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ও টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়

গ্লেন ম্যাকগ্রা(২৬ উইকেট)

বিশ্বকাপ ইতিহাসের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি বোলার হিসেবে এক নম্বরে রয়েছেন ২০০৭ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেট শিকার করা গ্লেন ম্যাকগ্রা। এখনও বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা কোনো বোলার তার রেকর্ডটি ভাঙ্গতে পারেননি। টুর্নামেন্টের প্রথম থেকে ফাইনাল পর্যন্ত প্রতি ম্যাচে উইকেট শিকার করেছিলেন তিনি। অজি এই ফাস্ট বোলার সে আসরে ৬টি ইনিংসে ৩টি করে উইকেট নিয়ে এক অনন্য রেকর্ড করেন।

বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচের পর ম্যাকগ্রা; Image Source: espncricinfo

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১৪ রানে ৩ উইকেট শিকার করে দুর্দান্ত ভাবে বিশ্বকাপ শুরু করেন ম্যাকগ্রা। তাছাড়া গ্রুপ পর্বে নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে ২টি ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নেন ১টি উইকেট। সুপার এইটে এসে প্রথম চার ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রতি ম্যাচে টানা ৩টি করে উইকেট শিকার করেন তিনি। বাকি দুই ম্যাচে শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নেন ২টি করে উইকেট।

সেমিফাইনালে ম্যাকগ্রা; Image Source: espncricinfo

সেমি ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আবারও দুর্দান্ত বোলিং করেন ম্যাকগ্রা। মাত্র ১৮ রান দিয়ে ৩ উইকেট শিকার করেন। তার অসাধারণ বোলিংয়ে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ম্যাচটিতে জয় পেয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায় অজিরা। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে দুর্দান্ত বোলিং করে আসা ম্যাকগ্রা ফাইনালে এসে দলের জয়ে ততোটা অবদান রাখতে পারেননি। ৩১ রান দিয়ে মাত্র ১ উইকেট শিকার করেন তিনি। ম্যাকগ্রা ওই আসরে ১১ ম্যাচে মোট ২৬টি উইকেট শিকার করেন এবং পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে অসাধারণ বোলিং করে সে বার আসরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কার জিতেন।

Feature Image: espncricinfo

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *