ফিরে দেখা ১৯৯২ বিশ্বকাপ: রঙ্গিন জার্সির বিশ্বকাপ

১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হয় ক্রিকেট বিশ্বকাপের পঞ্চম আসর। ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের কারণে আসরটি ‘বেনসন এন্ড হেজেস বিশ্বকাপ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

Image Source: ICC

১৯৯২ বিশ্বকাপে প্রথম বারের মতো সকল দল সাদা পোশাক ছেড়ে রঙ্গিন পোশাকে খেলতে নামে এবং পুরো টুর্নামেন্ট লাল বলের পরিবর্তে সাদা বলে পরিচালিত হয়। তাছাড়া প্রথম বারের মতো বিশ্বকাপে দিবা-রাত্রি ম্যাচের আয়োজন করা হয়। তবে আসরের আলোচিত বিষয় ছিল বর্ণবাদী বৈষম্যর কারণে ২১ বছর পর ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত হওয়া দক্ষিণ আফ্রিকা দল পুনরায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার মর্যাদা পাওয়া।

১৯৯২ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা দলের সংখ্যা ছিল ৯টি। পুরো টুর্নামেন্ট রাউন্ড রবিন ও নক আউট পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়। যাতে গ্রুপ পর্বে প্রতি দল বাকি দলগুলোর সাথে একটি করে ম্যাচ খেলে। অস্ট্রেলিয়ার ১১টি স্টেডিয়াম ও নিউজিল্যান্ডের ৭টি স্টেডিয়ামে মোট ৩৯টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। চলুন জেনে নেওয়া যাক কার হাতে উঠেছিল ১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ের ট্রফি আর কারা ছিলেন টুর্নামেন্টের সেরাদের কাতারে।

চ্যাম্পিয়ন

পাকিস্তান

১৯৯২ বিশ্বকাপ আসরে প্রথমবারের মতো ইমরান খানের অধিনায়কত্বে  ফাইনাল খেলার সুযোগ পায় পাকিস্তান। গ্রুপ পর্ব শেষে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকা নিউজিল্যান্ডকে সেমিফাইনালে পরাজিত করে ফাইনাল খেলার যোগ্যতা অর্জন করে তারা। আর এই প্রথম সুযোগেই বাজিমাত করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ট্রফি নিজেদের করে নেয় পাকিস্তান।

Image Source: ICC

বিশ্বকাপ মিশনের শুরুটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বিশাল ব্যবধানের হার দিয়ে শুরু হয় পাকিস্তানের। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে জিম্বাবুয়েকে ৫৩ রানে হারিয়ে আসরের প্রথম জয়ের দেখা পায় ইমরান খানের দল। এক জয় আর এক পরাজয় নিয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় ম্যাচ খেলতে নামে পাকিস্তান। প্রথমে ব্যাট করে মাত্র ৭৪ রানে গুটিয়ে যায় তাদের ইনিংস। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বৃষ্টি বাধায় পরিত্যক্ত হয় সে ম্যাচ। আর এক এক করে পয়েন্ট ভাগ করে দেওয়া হয় দুই দলকে।

চতুর্থ ও পঞ্চম টানা এই দুই ম্যাচ ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার শঙ্কা জাগে পাকিস্তান শিবিরে। বিশ্বকাপে টিকে থাকতে হলে গ্রুপ পর্বের বাকি তিন ম্যাচই জয়ের বিকল্প ছিল না তাদের। প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডের মতো কঠিন দল। কিন্তু তাদের পাত্তা না দিয়ে টানা তিন জয় তুলে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল চূড়ান্ত করে নেয় পাকিস্তান।

সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল আসরের অন্যতম শক্তিশালী দল  নিউজিল্যান্ড। যারা গ্রুপ পর্বের ৮ খেলার ৭টি তে জয় লাভ করেছিল। কিন্তু কিউইদের পাত্তা না দিয়ে ৪ উইকেটে জয় তুলে নেয় পাকিস্তান। সেই সাথে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠে তারা।

Image Source: ICC

ফাইনালটি অনুষ্ঠিত হয় অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে। প্রতিপক্ষ দল ছিল ইংল্যান্ড। যারা সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে। কিন্তু দ্বিতীয় বারের মতো ফাইনালে উঠেও বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি ইংলিশদের। ২২ রানে হেরে দ্বিতীয় বারের মতো রানার্স আপের খেতাব অর্জন করে তারা। আর প্রথম বারের মতো ফাইনাল খেলে বিজয়ী হয়ে বিশ্বসেরার মুকুট নিজেদের করে নেয় পাকিস্তান। 

সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি

ওয়াসিম আকরাম(১৮ উইকেট)

পাকিস্তানের ১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ের পিছনে বল হাতে গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন ওয়াসিম আকরাম। বলা যায় তিনিই ছিলেন পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয়ের মূল কাণ্ডারি। ওই আসরের ফাইনালে ব্যাট ও বল হাতে তার অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্সে জয়ের পথ সহজ হয়ে যায় পাকিস্তানিদের জন্য।

Image Source: ICC

টুর্নামেন্টের প্রথম থেকে ফাইনাল পর্যন্ত মোট ১০ ম্যাচ খেলে ১৮ উইকেট শিকার করেন আকরাম। যা ছিল ওই আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির রেকর্ড। তিনি গ্রুপ পর্বে আটটি ম্যাচ খেলে ১৩ উইকেট শিকার করেন। গ্রুপ পর্বের খেলায় ওয়েস্ট উইন্ডিজ ও ভারতের বিপক্ষে কোনো উইকেট না পেলেও বাকি দলগুলোর বিপক্ষে তিনি উইকেট নেন।

গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে উঠার বাঁচা মারার ম্যাচে তিনি দুর্দান্ত বোলিং করেন। কিউই টপ অর্ডারের অন্যতম সেরা দুই ব্যাটসম্যান মার্টিন ক্রো ও অ্যান্ড্রু জোন্সকে ইনিংস বড় করার আগেই সাজঘরে ফিরিয়ে দেন তিনি। তাছাড়া লারসেন এবং মরিসনও তার শিকার হন। আকরাম ৯ ওভার ২ বল করে ৩২ রানের বিনিময়ে ৪ উইকেট শিকার করেন। তার অসাধারণ বোলিংয়ে ১৬৬ রানে গুটিয়ে যায় কিউইদের ইনিংস।

এছাড়া ওয়াসিম আকরাম গ্রুপ পর্বের খেলায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩টি উইকেট, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২টি করে উইকেট এবং ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নেন ১টি করে উইকেট নেন। সেমিফাইনালে কিউইদের সাথে দ্বিতীয়বারের দেখায় ৪০ রান দিয়ে ২ উইকেট শিকার করেন তিনি।

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি দুর্দান্ত বোলিং করে ৩ উইকেট শিকার করেন এবং ওই ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরষ্কার পান।

সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী ও ম্যান দ্যা টুর্নামেন্ট

মার্টিন ক্রো(৪৫৬ রান)

১৯৯২ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় শীর্ষ স্থানে ছিলেন মার্টিন ক্রো। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত ৯ ম্যাচ খেলে চারটি অর্ধশতক আর এক শতকে ৪৫৬ রান করেন তিনি। যাতে তার গড় রান ছিল ১১৪। এই অসাধারণ ব্যাটিংয়ের জন্য ১৯৯২ বিশ্বকাপে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের পুরষ্কার পান তিনি।

Image Source: ICC

ক্রো তার একমাত্র শতকটি পূর্ণ করেন গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ১৩৪ বল খেলে ১১ চারে শতকটি পূর্ণ করেন তিনি। আসরের প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত খেললেও পরবর্তী দুই ম্যাচে শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ভালো করতে পারেননি ক্রো। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫ রান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে করেন ৩ রান। তবে টানা দুই ম্যাচের ব্যর্থতা কাটিয়ে চতুর্থ ও পঞ্চম ম্যাচে পর পর দুইটি অর্ধশতক করে রানে ফেরার ইঙ্গিত দেন তিনি।

চতুর্থ ম্যাচে প্রথম অর্ধশতকটি আসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ওই ম্যাচে ৪৩ বলে ৮ চার আর ২ ছয়ে অপরাজিত থেকে ৭৩ রানের এক ঝড়ো ইনিংস খেলেন ক্রো। আর পরবর্তী অর্ধশতকটি আসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ওই ম্যাচেও অপরাজিত থেকে ৮১ বলে ১২ চারে ৮১ রান করেন তিনি। পরবর্তী ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে অর্ধশতক করতে না পারলেও ২৮ বলে ৩ চার আর ১ ছয়ে ২৬ রান করেন।

আসরের তৃতীয় অর্ধশতকটি পূর্ণ করেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সপ্তম ম্যাচে। সে ম্যাচে ৮১ বল খেলে ৪ চারে ৭৩ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। গ্রুপ পর্বের অষ্টম ও শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনি ভালো করতে পারেননি মাত্র ৩ রান করে আউট হয়ে যান।

১৯৯২ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড সেমিফাইনাল পর্যন্ত খেলার পিছনে অধিনায়ক হিসেবে এবং ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ছিলেন ক্রো। গ্রুপ পর্বে অসাধারণ ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি সেমি ফাইনালেও অসাধারণ ব্যাটিং নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন তিনি। ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে ক্রো পাকিস্তানের বিপক্ষে ৮৩ বলে ৭ চার আর ৩ ছয়ে ৯১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেললেও দলকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেননি।

Featured image: ICC

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *