ফিরে দেখা: ১৯৭৯ বিশ্বকাপ

প্রথম বিশ্বকাপের চার বছর পর ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ডে আয়োজন করা হয় বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসর। প্রথম আসরের সকল নিয়মকানুন অনুসারেই চলে দ্বিতীয় আসরের খেলা। স্পন্সরশিপের কারণে এবারও ক্রিকেট বিশ্বকাপের পরিবর্তে প্রুডেন্সিয়াল কাপ নামে পরিচিতি লাভ করে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল; Image Source: Icc

১৯৭৯ সালের ৯ই জুন থেকে ২৩ই জুন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ৬টি স্টেডিয়ামে সবগুলো ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো ছিল- ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান শ্রীলঙ্কা, কানাডা ও ভারত। আট দেশকে দুইটি গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হয়। রাউন্ড রবিন ও নক আউট পদ্ধতিতে খেলা হয়। চলুন, ১৯৭৯ বিশ্বকাপ সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

চ্যাম্পিয়ন

ওয়েস্ট ইন্ডিজ

বিশ্বকাপের প্রথম আসরে শিরোপা জয়ের পর দ্বিতীয় আসরেও শিরোপা নিজেদের করে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। গ্রুপ পর্ব ও সেমি ফাইনালে অপরাজিত থেকে ফাইনালে উঠে তারা। সেখানেও অপরাজিত থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করে উইন্ডিজ। গ্রহণ করে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ।

Image Source: Icc

১৯৭৯ বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘বি’তে ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবস্থান। যেখানে তাদের সঙ্গী ছিল নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও ভারত। গ্রুপ পর্বে নিউজিল্যান্ড ও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দুইটি মাঠে গড়ালেও বৃষ্টি বাঁধায় পরিত্যক্ত হয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি। মাঠে গড়ানো দুই ম্যাচের দুইটিতেই জয় পায় তারা। প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে ৯ উইকেটে এবং শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩২ রানের ব্যবধানে জয় লাভ করে উইন্ডিজ।

সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান। ফাইনালে উঠার লড়াইয়ের ম্যাচটিতে টসে হেরে ব্যাট করতে হয় উইন্ডিজদের। গর্ডন গ্রীনিজ, ভিভ রিচার্ডস, ডেসমন্ড হেইন্স ও ক্লাইভ লয়েডের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ২৯৩ রানের বিশাল সংগ্রহ পায় তারা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে উইন্ডিজ বোলারদের অসাধারণ বোলিংয়ে ২৫০ রানে থেমে যায় পাকিস্তানের ইনিংস। ৪৩ রানের জয়ে ফাইনালে উঠে ক্যারিবিয়ানরা ।

ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রতিপক্ষ ছিল স্বাগতিক দেশ ইংল্যান্ড। যারা টুর্নামেন্টের প্রথম থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত অপরাজিত ছিল। ম্যাচটিতে ইংলিশরা টসে জিতে ফিল্ডিং করার স্বিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাটিংয়ে নেমে রিচার্ডসের অপরাজিত ১৩৮ রান ও কলিস কিংয়ের ৮৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংসে ২৮৬ রানের পুঁজি পায় উইন্ডিজরা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ক্যারিবিয়দের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ১৯৪ রানে গুটিয়ে যায় ইংলিশদের ইনিংস। সেই সাথে দ্বিতীয় বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের।

সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী

গর্ডন গ্রিনিজ(২৫৩ রান)

১৯৭৯ বিশ্বকাপ জয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন গর্ডন গ্রিনিজ। গ্রুপ পর্বের ম্যাচ থেকে ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচে তিনি দলে ছিলেন এবং ওপেনার হিসেবে ব্যাট করেছেন। বলতে গেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফাইনাল পর্যন্ত খেলার পেছনে ব্যাট হাতে তার অবদানই বেশি ছিল। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে দখল করে নেন ১৯৭৯ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারীর খেতাব।

Image Source: ESPNCricinfo

গর্ডন গ্রিনিজ ওই আসরে গ্রুপ পর্বে দুই ম্যাচ, সেমিফাইনাল ও ফাইনালসহ মোট চার ম্যাচে ব্যাট করেন। চার ম্যাচে এক শতক আর দুই অর্ধ শতকে করেন টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ ২৫৩ রান। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই তিনি ওই আসরের একমাত্র শতকটি পূর্ণ করেন। ম্যাচটিতে তাঁদের প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। গ্রিনিজ ১৭৩ বলে ৯ চার আর ১ ছয়ে অপরাজিত থেকে ১০৬ রান করেন।

Image Source: ESPNCricinfo

দুই অর্ধ শতকের একটি করেন গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আরেকটি করেন সেমি ফাইনালে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৫ বলে ৩ চার আর ১ ছয়ে করেন ৬৫ রান। আর ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে পাকিস্তানে বিপক্ষে ১০৭ বলে ৫ চার আর ১ ছয়ে করেন ৭৩ রান। গ্রুপ পর্ব ও সেমিফাইনালে দুর্দান্ত খেলে আসা গর্ডন ফাইনালে আলো ছড়াতে পারেননি। মাত্র ৯ রান করে রান আউটের শিকার হন তিনি।

সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি

মাইক হেনড্রিক(১০ উইকেট)

১৯৭৫ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ছিলেন ইংল্যান্ড দলের অন্যতম ডানহাতি ফাস্ট বোলার মাইক হেনড্রিক। তাঁর অসাধারণ বোলিং সহায়তায় আসরে ইংলিশরা ফাইনাল পর্যন্ত খেলতে সক্ষম হয়। পুরো টুর্নামেন্টে ইংলিশদের হয়ে তিনি পাঁচ ম্যাচ খেলেন। যাতে মোট ১০ উইকেট শিকার করে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির খেতাব অর্জন করেন।

Image Source: gettyimages

হেনড্রিক তাঁর বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেন গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে বল হাতে অজি ব্যাটসম্যানদের বেশ চাপে রাখতে পারলেও কোন উইকেট আদায় করতে পারেন তিনি। ফলে ১২ ওভার বল করে ২৪ রান দিয়ে বিনা উইকেটে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাকে। অজিদের বিপক্ষে উইকেট শূন্য থাকলেও পরবর্তী ম্যাচে কানাডার বিপক্ষে ৮ ওভার বল করে মাত্র ৫ রান দিয়ে নেন ১ উইকেট।

হেনড্রিকের টুর্নামেন্ট সেরা বোলিং ফিগার ছিল গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে। সে ম্যাচেও তার ওভারে তেমন রান নিতে পারেননি কোন ব্যাটসম্যান। ১২ ওভার বল করে ১৫ রান দিয়ে তুলে নেন ৪ উইকেট। সেমিফাইনালেও তিনি বল হাতে গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিতে ১২ ওভার বল করে ৫৫ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট।

Image Source: gettyimages

গ্রুপ পর্ব ও সেমিফাইনাল বাধা টপকে ইংলিশরা ফাইনলে উঠার পেছনে বল হাত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন মাইক হেনড্রিক। অসাধারণ বোলিংয়ে গ্রুপ পর্ব ও সেমিফাইনালের সব কয়টি ম্যাচে অপরাজিত থাকে তার দল। ফাইনালেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করেন তিনি। ১২ ওভার বল করে ৫০ রান দিয়ে নেন ২ উইকেট। কিন্তু ফাইনালে তার দল ক্যারিবিয়ানদের কাছে হেরে যায়।

সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান

ভিভ রিচার্ডস(অপরাজিত ১৩৮ রান)

টুর্নামেন্টের প্রথম থেকে অসাধারণ ব্যাটিং করে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া গর্ডন গ্রিনিজ যখন ফাইনালে ব্যাট হাতে ব্যর্থ হন, তখন দলের প্রয়োজনে অসাধারণ একটি ইনিংস খেলেন রিচার্ডস। আর এই অসাধারণ ইনিংসে গড়েন ওই আসরের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড। এনে দেন দলকে জয়ের জন্য বিশাল সংগ্রহ।

Image Source: Icc

ম্যাচটিতে ১৫৭ বল মোকাবেলা করে ১১ চার আর ৩ ছয়ে অপরাজিত থেকে ১৩৮ রান করেন রিচার্ডস। তার এই অসাধারণ ব্যাটিংয়ে ২৮৬ রানের বিশাল টার্গেট পায় ইংল্যান্ড। পুরো টুর্নামেন্টে চার ম্যাচ খেলে ২১৭ রান করেন তিনি। যা ওই আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান ছিল।

সেরা বোলিং ফিগার

অ্যালান হার্স্ট(২১/৫)

Image Source: Icc

অ্যালান হার্স্ট ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ডানহাতি ফাস্ট বোলার। কানাডার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে তিনি আসরের সেরা বোলিং করেন। হার্স্ট ১০ ওভার বল করে ২১ রান খরচে নেন ৫ উইকেট। তার অসাধারণ বোলিংয়ে মাত্র ১০৫ রানে গুটিয়ে যায় কানাডার ইনিংস।

Features Image: ICC

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *