লর্ডস দিয়ে ক্যারিয়ারের যাত্রা যাদের

যদি কোনো ক্রিকেটারকে প্রশ্ন করা হয় তার স্বপ্নের স্টেডিয়াম কোনটি? কোনো চিন্তা না করেই উত্তর দিয়ে বলবেন, লর্ডসের চেয়ে ভালো কোনোটি হতে পারে না। ক্রিকেট বিশ্বে এমন কোনো ক্রিকেটার নেই যিনি স্বপ্ন দেখেন না লর্ডসে ব্যাট কিংবা বল হাতে দাপিয়ে বেড়ানোর। ক্রিকেটের আতুড়ঘর বলা হয় লর্ডসকে।

Image Source: ESPNCricinfo

লর্ডসের নাম করা হয়েছে এর প্রতিষ্ঠাতা থমাস লর্ডের নামে। থমাস এবং তার দল তিনটি স্টেডিয়াম স্থাপন করেন। যার মধ্যে লর্ডস একটি এবং ১৮১৪ সাল থেকে এটিতে খেলা শুরু হয়। সব ক্রিকেটারের লর্ডস নিয়ে এত উদ্দীপনার অন্যতম কারণ হলো সেরা পারফরম্যান্স দিয়ে ঐতিহাসিক সে অনার্স বোর্ডে নিজের নাম খচিত করে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা।

চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন কিছু ক্রিকেটার সম্পর্কে যাদের ক্যারিয়ার শুরু হয়ে ছিল ঐতিহাসিক সে লর্ডসে।

কেভিন পিটারসন

২০০৫ সালের অ্যাশেজ সিরিজে দলে ডাক পেয়ে বেশ হৈচৈ ফেলেছিলেন কেভিন পিটারসন। কিন্তু কে জানত গ্রাহাম গুচ, ডেভিড গাওয়ারদের যোগ্য উত্তরসূরীদের একজন হতে চলছেন তিনি। হঠাৎ দলে ডাক পাওয়া পিটারসনকে নিয়ে মিডিয়া থেকে শুরু করে ক্রিকেট প্রেমীদের মধ্যে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু তখনকার ইংলিশ ক্যাপ্টেন মাইকেল ভন সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছেন লর্ডসে অ্যাশেজের প্রথম টেস্টেই দলে থাকবেন পিটারসন।

Image Source: ESPNCricinfo

প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলতে নেমে দুই ইনিংসেই ছিলেন দলের হয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহক। হাঁকান ব্যাক টু ব্যাক হাফসেঞ্চুরি। প্রথম ইনিংসে ২১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ধুকতে থাকা দলকে ৫৭ রানের মুল্যবান একটি ইনিংস উপহার দেন। দ্বিতীয় ইনিংসেও ম্যাকগ্রা, ওয়ার্নদের বোলিং তোপে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকা ইংলিশদের আরেকটি পঞ্চাশ রানের ইনিংস উপহার দেন। সে ইনিংসে ৬৪ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি। যদিও তার দল ২৩৯ রানের ব্যবধানে ম্যাচটি হেরে যায়।

Image Source: ESPNCricinfo

সে সিরিজে পিটারসন ১টি সেঞ্চুরি ও ৩টি হাফসেঞ্চুরিতে হাঁকান। যাতে ৪৭৩ রান করেন এবং সে সিরিজের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহক ছিলেন। ২০১২ সালে তার ব্যাটিং শৈলীতে ২৮ বছর পর ভারতের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয় লাভ করে ইংল্যান্ড। পিটারসন ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ৮,১৮১ রান করেন। টেস্টে তিনি ইংল্যান্ডের হয়ে পঞ্চম সর্বোচ্চ রান সংগ্রহক।

সৌরভ গাঙ্গুলি

১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ডে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে দলে জায়গা করে নেন সৌরভ গাঙ্গুলি। ম্যাচটিতে ব্যাট হাতে নেওয়ার আগে বল হাতে নিতে হয় তাকে। সেখানেও অভিষেক বোলার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে প্রথম ইনিংসে তুলে নেন ২ উইকেট। ব্যাট হাতে সুযোগ মেলে ৫৯ রানে ২ উইকেট হারিয়ে দল যখন রান খরায় ভুগছিল।

Image Source: ESPNCricinfo

৩ নম্বরে ব্যাট করতে নামা গাঙ্গুলির সাথে তখন মাঠে ছিলেন আরেক লিজেন্ড শচীন টেন্ডুলকার। দুই জনে মিলে গড়েন ৬৪ রানের জুটি। টেন্ডুলকার আউট হয়ে গেলেও হাল ছাড়েননি তিনি। ক্রিকেট প্রেমীদের অবাক করে তুলে নেন ক্যারিয়ারের প্রথম ইনিংসে প্রথম সেঞ্চুরি। ২০ চারে করা তার ১৩১ রানের উপর ভর করে বড় স্কোর পায় ভারত। যদিও ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ড্র হয়। তৃতীয় টেস্টের ১ম ইনিংসেও শতক পূর্ণ করেন তিনি।

স্টিভ স্মিথ

বর্তমান সময়ে টেস্টের সেরা ব্যাটসম্যান স্টিভ স্মিথের অভিষেকও হয়েছিল লর্ডসে। তবে ব্যাটসম্যান হিসেবে নয়, দলে তার জায়গা পাওয়ার কারণ ছিল আরেকটি। মূলত লেগ স্পিন বোলার হিসেবেই শেন ওয়ার্নের বদলি হিসেবে অজি স্কোয়াডে জায়গা পান তিনি। ২০১০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে তার অভিষেক হয়৷

Image Source: ESPNCricinfo

সিরিজের প্রথম ম্যাচে প্রথম ইনিংসে বল হাতে সুযোগ না পেলেও ব্যাট হাতে সুযোগ পেয়ে মাত্র ১ রান করেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে ১২ রানের পাশাপাশি ৩ উইকেট শিকার করেন। দ্বিতীয় টেস্টে প্রথম ইনিংসে ১০ রান করেন কিন্তু শেষ ইনিংসে ৭৭ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেন। ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে মাত্র ৫ ম্যাচ খেলেই দল থেকে বাদ পড়ে যান তিনি।

Image Source: ESPNCricinfo

২০১৩ সালে আবারও দলে ডাক পেলে তখন থেকে আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তারপর ২০১৪-১৫ মৌসুমে ভারতের সাথে চার ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রতি ম্যাচে শতক হাঁকান তিনি। ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে তার অবদান ছিল অতুলনীয়।

জেমস অ্যান্ডারসন

জেমস অ্যান্ডারসনকে বলা হয় সর্বকালের সেরা ফাস্ট বোলার। কালজয়ী এই ইংলিশ ফাস্ট বোলারের অভিষেকও লর্ডসে হয়েছিল। ২০০৩ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলেন তিনি। অভিষেক ম্যাচের প্রথম ইনিংসে তুলে নেন ৫ উইকেট। অ্যান্ডারসন তার ৩০০ তম ও ৫০০ তম উইকেটর মাইল ফলকও এই স্টেডিয়ামেই স্পর্শ করেন।

Image Source: ESPNCricinfo

অ্যান্ডারসন এখন পর্যন্ত লর্ডসে ২৩টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন। যাতে তার উইকেট সংখ্যা ১০৩টি। এখন পর্যন্ত লর্ডসের মাটিতে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক তিনি। তার পরের অবস্থানে রয়েছেন ২৩ ম্যাচে ৯৪ উইকেট শিকার করা স্টুয়ার্ট ব্রড। অ্যান্ডারসন তার টেস্ট ক্যারিয়ারে ১৪৯টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ৫৭৫টি উইকেট শিকার করেন। স্টুয়ার্ট ব্রড ও তার বোলিং জুটি ছিল বোলিং জগতের সেরা জুটি।

রাহুল দ্রাবিড়

১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের মধ্য দিয়ে ক্রিকেট জগতে দুই তারকার আগমন ঘটে। তাদের মধ্যে একজন হলেন সৌরভ গাঙ্গুলি, অন্যজন রাহুল দ্রাবিড়। ক্যারিয়ারের প্রথম ইনিংসে গাঙ্গুলি শতকের দেখা পেলেও নার্ভাস নাইন্টিনে এসে হার মানতে হয় দ্রাবিড়কে। শতক পূর্ণের ৫ রান দূরে থেকেই আউট হয়ে যান তিনি।

Image Source: ESPNCricinfo

২০০১ সালে নিজ দেশের মাটিতে তার ১৮০ রানের ইনিংসের উপর ভর করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় তুলে নিয়ে সিরিজ সমতায় ফেরে ভারত। তাছাড়া ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তার ২৩৩ রানের ইনিংসে এক ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় ভারত। দ্রাবিড় শুধু লর্ডসের অনার্স বোর্ডেই নাম লেখাননি, তার নাম জড়িয়ে আছে টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে।

Image Source: ESPNCricinfo

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *