নারী ওয়ানডে ক্রিকেটে দলীয় সর্বোচ্চ ৫ ইনিংস

১৯৭৩ সালে শুরু হওয়া নারী আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেট বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নারীরাও পুরুষ ক্রিকেটারদের সাথে তাল মিলিয়ে বোলারদের তুলোধুনো করছেন। বরং পুরুষ ক্রিকেটারদের চেয়ে নারী ক্রিকেটাররাই রেকর্ডের দিক থেকে বেশ এগিয়ে।

পুরুষ ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাস ডাবল সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছে একবিংশ শতাব্দীতে। অথচ বিংশ শতাব্দীতেই নারী ওয়ানডে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক বেলিন্ডা ক্লার্ক। এমনকি ওয়ানডে ক্রিকেটে দলীয় সর্বোচ্চ ৪৯১ রানের স্কোরটিও নারীদের। যেখানে পুরুষ ক্রিকেটে দলীয় সর্বোচ্চ স্কোর ৪৮১ রান। আজকের অনুচ্ছেদটিতে আলোচনা করব নারী ক্রিকেট ইতিহাসের দলীয় সর্বোচ্চ পাঁচটি ইনিংস সম্পর্কে।

৫. অস্ট্রেলিয়া (৪১২ রান)

১৯৯৭ সালে নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপের ১৮তম ম্যাচে ভারতের মিডল ইনকাম গ্রুপ গ্রাউন্ডে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হয় ডেনমার্ক নারী ক্রিকেট দল। টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন অস্ট্রেলিয়ার দলীয় অধিনায়ক বেলিন্ডা ক্লার্ক।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে উদ্বোধনী জুটিতে ব্যাট করতে নামেন দলীয় অধিনায়ক বেলিন্ডা ক্লার্ক ও লিসা এইট্টেই। উদ্বোধনী জুটিতেই তারা দুজন সংগ্রহ করেন ১৬৮ রান। ব্যক্তিগত ৬০ রানে লিসা এইট্টেই প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। এরপর উইকেটে আসেন ক্যারান রল্টন। তাকে নিয়ে আরেকটি শত রানের জুটি গড়েন বেলিন্ডা ক্লার্ক। এরই মাঝে ব্যক্তিগত সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ক্লার্ক। সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর আরো আক্রমণাত্মক হয়ে রান তুলতে থাকেন তিনি।

বেলিন্ডা ক্লার্ক; Source: Cricket Australia

ক্যারান রল্টন ৫২ বলে ব্যক্তিগত ৬৪ রানে আউট হলেও ক্লার্ক শেষ পর্যন্ত খেলতে থাকেন। পূর্ণ করেন ব্যক্তিগত ডাবল সেঞ্চুরি। যা ছিল নারী ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্যাট করতে নেমে শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে ১৫৫ বল মোকাবিলা করে ২২টি চারে করেন ২২৯ রান। তার অবদ্য ডাবল সেঞ্চুরির সুবাদে ৫০ ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়া নারী ক্রিকেট দলের মোট সংগ্রহ গিয়ে দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ৪১২ রান।

৪১৩ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ২৫.৫ ওভারে মাত্র ৪৯ রানেই অলআউট হয়ে যায় ডেনমার্ক নারী ক্রিকেট দল। ৩৬৩ রানের বিশাল জয় পায় অস্ট্রেলিয়া। এমনকি ঐ বিশ্বকাপ আসরেও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে অস্ট্রেলিয়া নারী ক্রিকেট দল।

৪. নিউজিল্যান্ড (৪১৮ রান)

২০১৮ সালে আয়ারল্যান্ডের দি ভিনেয়ার্ড ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে স্বাগতিক আয়ারল্যান্ডের মুখোমুখি হয় নিউজিল্যান্ড নারী ক্রিকেট দল। টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক অমি শ্যাটার্থওয়েট।

প্রথমে ব্যাট করতে নেমে নিউজিল্যান্ডের দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান সোফি ডিভাইন ও জেস ওয়াটকিন শুভসূচনা করেন। দলীয় ৭৪ রানের মাথায় ওয়াটকিন আউট হলে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামা ম্যাডি গ্রিনের সাথে বেশ ভালো একটি জুটি গড়েন ডিভাইন। তাদের মারকুটে ব্যাটিংয়ে ১৫ ওভারেই দলীয় স্কোর দাঁড়ায় ১ উইকেটে ১৪৯ রানে। এরপর মাত্র ৫৯ বলে ব্যক্তিগত সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন সোফি ডিভাইন। তবে সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি। ৬১ বল মোকাবিলা করে ১৩টি চার ও ৬টি ছয়ের সুবাদে ১০৮ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেন ডিভাইন। দলীয় স্কোর তখন ২ উইকেটে ১৬৭ রান।

সোফি ডিভাইন; Source: Sky Sports

এরপর গ্রিনও ব্যক্তিগত হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করে ক্যাচ আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। পরবর্তীতে আর বড় কোনো জুটি না গড়তে পারলেও নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক অমি শ্যাটার্থওয়েটের ৪৮ রান, বার্নাডাইন বেজুইডেনাউটের ৪৩ রান ও এনা পিটারসনের ৪৬ রানের মারকুটে ব্যাটিংয়ে বেশ ভালো একটি স্কোর দাঁড় করায় নিউজিল্যান্ড। ৪৯.৫ ওভারে সবকটি উইকেট হারিয়ে ৪১৮ রান সংগ্রহ করে নিউজিল্যান্ড নারী ক্রিকেট দল।

৪১৯ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ১১২ রানেই অলআউট হয়ে যায় আয়ারল্যান্ড নারী ক্রিকেট দল। ফলে ৩০৬ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে যায় আয়ারল্যান্ড।

৩. নিউজিল্যান্ড (৪৪০ রান)

২০১৮ সালে আয়ারল্যান্ডের ক্যাসল এভিনিউ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তিন ম্যাচ সিরিজের শেষ ম্যাচে স্বাগতিক আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামে নিউজিল্যান্ড নারী ক্রিকেট দল। টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক শুজি ব্যাটেস।

ব্যাট করতে নেমে নিউজিল্যান্ডের দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান অ্যামেলিয়া কের ও অমি শ্যাটার্থওয়েট শুভসূচনা করেন। আগ্রাসী ভূমিকায় বোলারদের তুলোধুনো করে অল্প সময়েই গড়েন শতরানের একটি জুটি। এরপর দলীয় ১১৩ রানে ক্যাচ আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান শ্যাটার্থওয়েট। আউট হওয়ার আগে ৪৫ বলে ৬১ রান সংগ্রহ করেন তিনি।

অ্যামেলিয়া কের; Source: Sky Sports

এরপর তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামা কাসপেরেকের সাথে ভালো একটি জুটি গড়তে থাকেন অ্যামিলিয়া কের। মাত্র ৭৭ বলেই ব্যক্তিগত সেঞ্চুরি পূর্ণ করে ফেলেন কের। সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর তিনি যেন আরও আগ্রাসী হয়ে রান তুলতে থাকেন। অপরপ্রান্তে থাকা কাসপেকেরও বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে রান তুলতে থাকেন। মাত্র ৩৬ ওভারেই দলীয় স্কোর গিয়ে দাঁড়ায় ১ উইকেটে ৩০৩ রান।

এরপর ৪৬ তম ওভারে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন কাসপেরেক। একই ওভারে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন কের। ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করতে অ্যামিলিয়া কের বল খেলেন মাত্র ১৩৪টি। এটি ছিল নারী ক্রিকেট ইতিহাসে দ্বিতীয় এবং দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরি। পরের ওভারে ব্যক্তিগত ১১৩ রানে কাসপেরেক আউট হলেও কের শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে দলকে রেকর্ড পরিমাণ সংগ্রহ এনে দেন। তার ১৪৫ বলে ৩১টি চার ও ২টি ছয়ের সুবাদে ২৩২ রানের অপরাজিত ইনিংসটি নারী ক্রিকেট ইতিহাসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান।

অ্যামিলিয়া কেরের ডাবল সেঞ্চুরির সুবাদে নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে নিউজিল্যান্ড নারী ক্রিকেট দলের সংগ্রহ গিয়ে দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ৪৪০ রান। বিশাল টার্গেট তাড়া করতে নেমে ৪৪ ওভারে ১৩৫ রানেই অলআউট হয়ে যায় আয়ারল্যান্ড নারী ক্রিকেট দল। হেরে যায় ৩০৫ রানের বিশাল ব্যবধানে।

২. নিউজিল্যান্ড (৪৫৫ রান)

১৯৯৭ সালে নিউজিল্যান্ডের ওভাল স্টেডিয়ামে দুই ম্যাচ সিরিজের শেষ ম্যাচে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হয় পাকিস্তান। টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তানের অধিনায়ক সাইজা খান।

ব্যাট করতে নেমে উদ্বোধনী দুই ব্যাটসম্যান শেলি ফ্রুইন ও ডেবিই হকলি ভালো একটি জুটি গড়েন। তবে দলীয় ৭৫ রানের মাথায় ফ্রুইন রান আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। এরপর তিন নম্বরে ব্যাট করতে আসা নিউজিল্যান্ডের দলীয় অধিনায়ক মাইয়া লুইস বেশ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে রান তুলতে থাকেন। হকলিকে সাথে নিয়ে গড়েন ১২০ রানের অসাধারণ একটি জুটি। দলীয় ১৯৫ রানের মাথায় হকলি বোল্ড আউট হন। ৬৮ বলে করেন ৮৮ রান। এরপর পরবর্তী ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে আসা ট্রুডি অ্যান্ডারসনকে সাথে নিয়ে আরেকটি ভালো জুটি গড়েন তিনি। এরই মাঝে ব্যক্তিগত সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক লুইস।

মাইয়া লুইস; Source: Maori Television

তবে সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর আর বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি মাইয়া লুইস। মাত্র ৭২ বলে ১০৫ রানের অসাধারণ একটি ইনিংস খেলে এলবিডাব্লিউয়ের ফাঁদে পড়ে আউট হন তিনি। দলীয় স্কোর তখন ৩ উইকেটে ২৭৫ রান।

চতুর্থ উইকেট জুটিতে ট্রুডি অ্যান্ডারসন ও ক্ল্যায়ার নিকোলসন আরেকটি ভালো জুটি গড়েন। অ্যান্ডারসন ব্যক্তিগত ৮৫ রানে আউট হলেও নিকোলসন শেষ পর্যন্ত উইকেটে টিকে থেকে ৫৩ বলে ৭৩ রানের এক ইনিংস খেলে দলকে বিশাল সংগ্রহ এনে দেন। ৫০ ওভার শেষে নিউজিল্যান্ড নারী ক্রিকেট দলের মোট সংগ্রহ দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ৪৫৫ রান। পাহাড় সমান টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ক্ল্যায়ার নিকোলসন ও ফ্রাইয়াের বোলিং তান্ডবে ২৩ ওভারে মাত্র ৪৭ রানেই গুটিয়ে যায় পাকিস্তান নারী ক্রিকেট দল। ফলে ৪০৮ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় পায় নিউজিল্যান্ড।

১. নিউজিল্যান্ড (৪৯১ রান)

২০১৮ সালে আয়ারল্যান্ডের ওয়াইএমসিএ ক্রিকেট ক্লাব স্টেডিয়ামে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হয় স্বাগতিক আয়ারল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড নারী ক্রিকেট দল। টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক শুজি ব্যাটেস।

ব্যাট করতে নেমে প্রথম থেকেই বেশ আগ্রাসী হয়ে রান তুলতে থাকেন নিউজিল্যান্ডের দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান শুজি ব্যাটস ও জেস ওয়াটকিন। মাত্র ১৭ ওভারেই গড়েন ১৫২ রানের জুটি এবং দুজনই পূর্ণ করেন হাফসেঞ্চুরি। এরপর দলীয় ১৭২ রানে প্রথম উইকেটের পতন হয় নিউজিল্যান্ডের। জেস ওয়াটকিন আউট হন ব্যক্তিগত ৬২ রানে। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ম্যাডি গ্রিনকে নিয়ে আরেকটি অনবদ্য জুটি গড়েন ব্যাটেস।

শুজি ব্যাটেস; Source: Rooter

এরই মাঝে মাত্র ৭১ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন শুজি ব্যাটেস। সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর তিনি যেন আরো বেশি আগ্রাহী হয়ে ওঠেন। পরের ৫০ রান পূর্ণ করতে খরচ করেন মাত্র ২২ বল। আউট হওয়ার আগে ৯৪ বলে ২৪টি চার ও ২টি ছয়ে ১৫১ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেন তিনি। দলীয় স্কোর তখন ৩০ ওভার শেষে ২ উইকেটে ২৮৮ রান।

পরের কাজটুকু করেন ম্যাডি গ্রিন ও অ্যমিলিয়া কের। গ্রিনের ৭৭ বলে ১২২ রানের অসাধারণ এক ইনিংস এবং কেরের মাত্র ৪৫ বলে ৮১ রানের অপরাজিত ইনিংস নিউজিল্যান্ড নারী ক্রিকেট দলের বিশ্ব রেকর্ড গড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতএব নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ গিয়ে দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ৪৯১ রান। শুধু নারী ক্রিকেটেই নয়, পুরুষ আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসেও এত রানের রেকর্ড রচিত হয়নি।

এই রেকর্ড পরিমাণ টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ১৪৪ রানেই গুটিয়ে যায় আয়ারল্যান্ড নারী ক্রিকেট দলের ইনিংস। এতে করে ৩৪৭ রানের রেকর্ড পরিমাণ ব্যবধানে জয়ী হয় নিউজিল্যান্ড নারী ক্রিকেট দল।

Featured Image Source: ESPNcricinfo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *