বহু ব্যর্থতার পর অবশেষে জয়ের দেখা পেল বাংলাদেশ

বিশ্বকাপ ব্যর্থতা, এরপর শ্রীলঙ্কায় ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইট ওয়াশের লজ্জা এবং সর্বশেষ অনভিজ্ঞ আফগানিস্তানের সাথে একমাত্র টেস্টে শোচনীয় হারে বেশ খারাপ দিন যাচ্ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। চারপাশ থেকে সমালোচনার তীর এসে পড়ছিল ক্রিকেট বোর্ডের প্রতি। সব আলোচনা-সমালোচনা শেষে অনেকদিন পর সেই কাঙ্ক্ষিত জয় পেল বাংলাদেশ।

Image result for bangladesh vs zimbabwe shakib out

Source: BettingTop10

ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচটি বৃষ্টি বিঘ্নিত হওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘণ্টা পর টসে নামে আম্পায়াররা। এবং ম্যাচটি ১৮ ওভারে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন তারা। ব্যাট করতে নেমে প্রথমে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়লেও রায়ান বার্লের ব্যাটিং তাণ্ডবে ১৪৫ রানের লড়াকু টার্গেট দেয় জিম্বাবুয়ে।

জবাবে বাংলাদেশও প্রথমেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে যায়। তবে দুই তরুণ ক্রিকেটার আফিফ হোসেনের ব্যাটিং তাণ্ডব এবং মোসাদ্দেক সৈকতের অসাধারণ ব্যাটিংয়ে জয়ের দেখা পায় বাংলাদেশ।

ম্যাচ বিবরণী

গতকাল মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে টি-টোয়েন্টি ফরমেটে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে। টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। জিম্বাবুয়ের হয়ে প্রথমে ব্যাট করতে নামেন দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ব্রেন্ডন টেলর ও হ্যামিল্টন মাসাকাদজা। এবং বোলিং আক্রমণে আসেন সাকিব আল হাসান।

ইনিংসের প্রথম বলেই বাউন্ডারি হাঁকিয়ে শুভ সূচনা করেন টেলর। কিন্তু পরের ওভারে তাইজুলের প্রথম বলেই বড় শট খেলতে গিয়ে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন টেলর। অতএব টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে নিজের প্রথম বলেই উইকেট শিকার করেন তাইজুল। এর আগে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ইতিহাসে আরো ১৫ জন এই রেকর্ডের কীর্তি গড়েন।

Image result for taijul first wicket

ক্যারিয়ারের প্রথম বলেই উইকেট তুলে নেন তাইজুল; Source: Risingbd

এরপর উইকেটে আসেন ক্রেগ আরভিন। তাকে নিয়ে বেশ ভালো একটি জুটি গড়তে থাকেন জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক হ্যামিল্টন মাসাকাদজা। পাওয়ারপ্লে শেষে তাদের সংগ্রহ গিয়ে দাঁড়ায় ১ উইকেটে ৪৮ রান। এরপর ম্যাচে প্রথমবারের মতো বোলিং আক্রমণে আনা হয় মোস্তাফিজুর রহমানকে। বোলিংয়ে এসেই দলকে ব্রেকথ্রু এনে দেন মুস্তাফিজ। মোসাদ্দেক হোসেনের হাতে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান আরভিন।

ঠিক পরের ওভারেই আগ্রাসী হয়ে রান তুলতে থাকা জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক মাসাকাদজাকেও সাব্বির রহমানের ক্যাচে পরিণত করেন সাইফুদ্দিন। ২৬ বল খেলে ৫টি চার ও ১টি ছয়ে ৩৪ রান করেন তিনি। অতএব পরপর দুই উইকেট হারিয়ে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে যায় জিম্বাবুয়ে। সে বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হন দলের অন্যতম ভরসার প্রতীক শেন উইলিয়ামস। নবম ওভারের প্রথম বলেই নিজের বলে নিজে ক্যাচ নিয়ে সাজঘরে ফেরান উইলিয়ামসকে। এতএব সর্বশেষ ৫ রান তুলতে গিয়ে চারটি উইকেট হারায় তারা।

Image result for shakib vs burl

সাকিবের ওভারে ৩০ রান তুলেন বার্ল; Source: Dhaka Tribune

বিপর্যয় যেন জিম্বাবুয়ের পিছু ছাড়ছিলই না। দশম ওভারে মুস্তাফিজের বলে দুই ব্যাটসম্যানের ভুল বোঝাবুঝিতে সাকিবের থ্রোতে রানআউট হন মারুমা। অতএব ১০ ওভার শেষে জিম্বাবুয়ের দলীয় স্কোর দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ৬৪ রান। এরপর উইকেটে থাকা দুই ব্যাটসম্যান রায়ান বার্ল ও টিনোতেনডা মুতোম্বজি বেশ ধীর গতিতে রান তুলতে থাকেন। সর্বশেষ ৩০ বলে কোনো বাউন্ডারি হাঁকাতে পারেনি এই দুই ব্যাটসম্যান। তবে ১৫ তম ওভার থেকে শুরু হয় এই দুই ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং তাণ্ডব। মুস্তাফিজের ওভারে ১ চার ও ১ ছয়ে তোলেন ১৪ রান।

Image result for bangladesh vs zimbabwe shakib out

রায়ান বার্ল; Source: The Daily Star

এরপর ১৬তম ওভারে বোলিং আক্রমণে আসেন সাকিব আল হাসান। তার বলে বিধ্বংসী হয়ে ব্যাটিং করেন রায়ান বার্ল। ওভারে ৩টি ছয় ও ৩টি চারে তোলেন ৩০ রান।  মাত্র ২৮ বলেই ক্যারিয়ারের প্রথম হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করেন বার্ল। এরপর ১৭তম ওভারে সাইফুদ্দিনের বলে ১১ রান এবং ১৮তম ওভারে মুস্তাফিজের বলে ৮ রান তোলেন দুই ব্যাটসম্যান। অতএব নির্ধারিত ১৮ ওভার শেষে জিম্বাবুয়ের স্কোর দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ১৪৪ রান। বার্ল ৩২ বল মোকাবিলা করে ৫টি চার ও ৪টি ছয়ে ৫৭ রানে অপরাজিত থাকেন। আরেক ব্যাটসম্যান মুতোম্বজি ২৬ বলে ১ চার ও ১ ছয়ে ২৭ রান করে অপরাজিত থাকেন।

বাংলাদেশের হয়ে মোসাদ্দেক, মুস্তাফিজ, সাইফুদ্দিন ও তাইজুল একটি করে উইকেট তুলে নেন।

১৪৫ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে উদ্বোধনী দুই ব্যাটসম্যান লিটন দাস ও সৌম্য সরকার শুভসূচনা করলেও বড় জুটি গড়তে পারেননি। তৃতীয় ওভারের শেষ বলে দলীয় ২৬ রানের মাথায় চাতারার বলে বোল্ড আউট হন লিটন দাস। ১৬ বল খেলে ১টি চার ও ১টি ছয়ে ১৯ রান করেন তিনি।

Related image

লিটন দাস ও সৌম্য সরকার; Source: Sportstar – The Hindu

পরের ওভারের প্রথম বলেই জার্ভিসের বলে ক্যাচ আউট হন সৌম্য সরকার। ঐ একই ওভারে সদ্য উইকেটে আসা মুশফিকুর রহিমও উইকেটরক্ষক টেলরের হাতে ক্যাচ দিয়ে শূন্যরানে সাজঘরে ফিরে যান। পরবর্তী ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে আসেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তাকে নিয়েও বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। পরের ওভারেই চাতারার বলে স্লিপে থাকা মাসাকাদজার হাতে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান সাকিব। দলীয় স্কোর তখন ৪ উইকেটে ২৯ রান। অতএব সর্বশেষ ৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়ে যায় বাংলাদেশ।

সেই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন উইকেটে থাকা দুই নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও সাব্বির  রহমান। তবে তারাও বেশিদূর এগোতে পারেননি। নবম ওভারের প্রথম বলে বার্লের বলে এলবিডব্লুর ফাঁদে পড়েন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। রিভিউয়ের আবেদন করলেও ব্যর্থ হন তিনি। ১৬ বল থেকে ১৪ রান করে সাজঘরে ফিরে যান রিয়াদ। পরের ওভারে মাদজিভার বলে বেশ ভালো একটি শট খেলেন সাব্বির। তবে বাউন্ডারি লাইনে এক অসাধারণ ক্যাচ তালুবন্দী করে সাব্বিরকে সাজঘরে ফেরান রায়ান বার্ল। বাংলাদেশের দলীয় স্কোর তখন ৬ উইকেটে ৬০ রান।

Image result for mosaddek hossain afif

আফিফ হোসেন ও মোসাদ্দেক হোসেনের ম্যাচজয়ী জুটি; Source: The Daily Star

পরবর্তী ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে আসেন আফিফ হোসেন। তাকে নিয়ে বেশ ভালো একটি জুটি গড়েন মোসাদ্দেক সৌকত। ইনিংসে ব্যক্তিগত প্রথম বল থেকেই আগ্রাসি ভঙ্গিতে ব্যাট চালাতে থাকেন আফিফ। ১১তম ওভারে আফিফের ২টি চার ও ১টি ছয়ে ১৫ রান এবং ১২তম ওভারে মোসাদ্দেকের ২টি ছয়ে ১৬ রান তুলে দলকে জয়ের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন এই দুই ব্যাটসম্যান। জয়ের জন্য তখন প্রয়োজন ৩৬ বল থেকে ৪৯ রান।

এরপর ১৬তম ওভারের শেষ দুই বলে দুইটি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ম্যাচটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনেন আফিফ ও মোসাদ্দেক। পরের ওভারে আফিফকে রান আউটের সুযোগ পেলেও ব্যর্থ হয় জিম্বাবুয়ে। এরই সাথে মাত্র ২৪ বলে ক্যারিয়ারের প্রথম হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করেন আফিফ হোসেন। শেষ ওভারে ৫ রান প্রয়োজন হলে প্রথম বলে দুই রান নিয়ে দ্বিতীয় বলে ক্যাচ আউট হন আফিফ।

আউট হওয়ার আগে ২৬ বল থেকে ৮টি চার ও ১টি ছয়ে ৫২ রান করেন তিনি। এরপর সাইফুদ্দিনের বাউন্ডারির সুবাদে দুই বল হাতে রেখেই ৩ উইকেটে জয় পায় বাংলাদেশ। মোসাদ্দেক সৈকত ২৪ বল থেকে ২টি ছয়ের সুবাদে ৩০ রানে অপরাজিত থাকেন। ম্যাচ জয়ী ৫২ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলায় ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন আফিফ হোসেন।

আফিফ হোসেন; Source: The Daily Star

জিম্বাবুয়ের পক্ষে মাদজিভা ২৫ রানে ২টি উইকেট তুলেন নেন। এছাড়াও জার্ভিস ও চাতারা ২টি করে এবং বার্ল একটি উইকেট শিকার করেন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

জিম্বাবুয়ে: ১৪৪/৫ (১৮ ওভার)

বার্ল ৫৭, মাসাকাদজা ৩৪

মোসাদ্দেক ১/১০, সাইফুদ্দিন ১/২৬

বাংলাদেশ: ১৪৮/৭ (১৭.৪ ওভার)

আফিফ ৫২, মোসাদ্দেক ৩০

মাদজিভা ২/২৫, জার্ভিস ২/৩১

Featured Image Source: DNA India

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *