বেন স্টোকসের ব্যাটেই রচিত হলো শতাব্দীর সেরা টেস্ট ম্যাচ

এই তো কিছুদিন আগেই বিশ্ব ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে শ্রেষ্ঠ পারফরম্যান্স দিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচের নায়ক হয়েছিলেন বেন স্টোকস। বিশ্বকাপ মঞ্চের পর আইসিসি ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সিরিজেও তার অসাধারণ পারফরম্যান্সে বিশ্ব ক্রিকেটপ্রেমীরা উপভোগ করল শতাব্দীর সেরা টেস্ট ম্যাচ।

মোট কথা, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ হয়ে তিনি একাই ম্যাচটি জিতিয়ে আইসিসি ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পাঁচ ম্যাচ সিরিজে ১-১ এ সমতায় ফেরালেন দলকে।

ম্যাচসেরা হয়েছেন বেন স্টকস; Source: Sky Sports

এর আগে সিরিজের প্রথম ম্যাচে হারার পর দ্বিতীয় ম্যাচ ড্র করে ইংল্যান্ড। সে ম্যাচটি ড্র করার পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল বেন স্টোকসের। পাঁচ ম্যাচ সিরিজে ১-০ তে পিছিয়ে থেকে তৃতীয় ম্যাচেও ব্যাটিং ব্যর্থতায় হারতে গিয়েও স্টোকসের অনবদ্য সেঞ্চুরির ওপর ভর করে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে এক উইকেট হাতে রেখে ম্যাচটি জিতে যায় ইংল্যান্ড। ম্যাচ সেরার পুরস্কারটিও হাতে ওঠে স্টোকসের।

ম্যাচ বিবরণী

গত ২২ আগস্ট ইংল্যান্ডের হেডিংলি ক্রিকেট গ্রাউন্ড স্টেডিয়ামে আইসিসি ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পাঁচ ম্যাচ সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে মাঠে নামে স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক জো রুট।

ব্যাট করতে নেমে প্রথমেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। দলীয় ১২ রানে মার্কার হ্যারিস এবং ২৫ রানে উসমান খাজা প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। এরপর তৃতীয় উইকেট জুটিতে ডেভিড ওয়ার্নার ও মার্নাস লাবুশেন শত রানের একটি জুটি গড়ে দলকে বিপর্যয় থেকে মুক্ত করেন। তবে দলীয় ১৩৬ রানের মাথায় দলকে ব্রেকথ্রু এনে দিয়ে ডেভিড ওয়ার্নারকে উইকেটরক্ষক জনি বেয়ারস্টোর ক্যাচে পরিণত করেন জোফরা আর্চার। আউট হওয়ার আগে ৬১ রান করেন ওয়ার্নার।

মার্নাস লাবুশেন; Source: Sporting News

এরপর আর কোনো ব্যাটসম্যানই যেন আর্চারের বোলিং তাণ্ডবে উইকেটে দাঁড়াতে পারেনি। মার্নাস লাবুশেন একপ্রান্ত আগলে রাখলেও অপরপ্রান্তের ব্যাটসম্যানরা আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। ট্রাভিস হেড, স্টুয়ার্ড ব্রডের বলে ও ম্যাথিউ ওয়েড জোফরা আর্চারের বলে বোল্ড আউট হন। দুজনই রানের খাতা খোলার আগেই প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। অস্ট্রেলিয়ার দলীয় স্কোর তখন ৫ উইকেটে ১৩৯ রান।

এরপর অস্ট্রেলিয়ার দলীয় অধিনায়ক টিম পেইন উইকেটের সেট ব্যাটসম্যান মার্নাস লাবুশেনকে নিয়ে বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। ক্রিস ওকসের বলে এলবিডাব্লিউয়ের ফাঁদে পড়ে ১১ রানেই সাজঘরে ফেরেন পেইন। ইংল্যান্ডের হয়ে পরের কাজটুকু করেন জোফরা আর্চার ও বেন স্টোকস। অস্ট্রেলিয়ার লেয়ার অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যান জেমস পেটিনসন, পেট কুমিন্স ও নাথান লায়নকে সাজঘরে ফেরান জোফরা আর্চার এবং লাবুশেনকে এলবিডাব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলেন বেন স্টোকস। আউট হওয়ার আগে ৭৪ রান করেন মার্নাস লাবুশেন। এতে দলীয় ১৭৯ রানেই প্রথম ইনিংস শেষ হয় অস্ট্রেলিয়ার।

জোফরা আর্চার; Source: DNA India

ইংল্যান্ডের হয়ে বল হাতে জোফরা আর্চার ৪৫ রান দিয়ে ৬টি উইকেট তুলে নেন, যা তার টেস্ট ক্যারিয়ারে সেরা বোলিং ফিগার। এছাড়াও স্টুয়ার্ট ব্রড ২টি, ক্রিস ওয়কস ও বেন স্টোকস ১টি করে উইকেট তুলে নেন।

প্রথম দিনে দ্বিতীয় সেশনে ব্যাটিংয়ে নেমে প্রথমেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের ব্যাটিং শিবিরে প্রথম আঘাত হানেন অস্ট্রেলিয়ার পেট কুমিন্স। দলীয় ১০ রানেই প্যাভিলিয়নে ফেরেন ররি বার্নস। এরপরের আঘাতটি হানেন জস হাজলেউড। শূন্য রানেই প্যাভিলিয়নে ফেরান ইংল্যান্ডের দলীয় অধিনায়ক জো রুটকে। এরপর আর কোনো ব্যাটসম্যানই উইকেটে দাঁড়াতে পারেনি।

পেট কুমিন্স ও হাজলেউডের বোলিং তাণ্ডবে দুমড়ে-মুচড়ে যায় ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপ। চার নম্বরে ব্যাট করতে নামা জো ডেনলি ব্যতীত আর কোনো ব্যাটসম্যানই দুই অংকের রান স্পর্শ করতে পারেনি। ডেনলির ব্যাট থেকে আসা ১২ রানই ছিল ইংল্যান্ড দলের একজন ব্যাটসমনের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ। অতএব মাত্র ২৭.৫ ওভারেই ৬৭ রানে প্রথম ইনিংস শেষ হয় ইংল্যান্ডের।

জস হাজলেউড; Source: Cricket Australia

অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে বল হাতে জস হাজলেউড ৩০ রানে ৫ উইকেট শিকার করেন। এছাড়াও পেট কুমিন্স ৩টি এবং জেমস পেটিনসন ২টি উইকেট তুলে নেন।

দ্বিতীয় দিনে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে অস্ট্রেলিয়া। এই ইংনিংসেও প্রথমেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। দলীয় ১০ রানে এবং ব্যক্তিগত শূন্য রানেই স্টুয়ার্ট ব্রডের এলবিডাব্লিউয়ের ফাঁদে পড়ে আউট হন ডেভিড ওয়ার্নার। এরপর দলীয় ৩৬ রানে দ্বিতীয় উইকেটের পতন হয় অস্ট্রেলিয়ার। জ্যাক লিচের বলে বোল্ড আউট হয়ে সাজঘরে ফেরেন মার্কার হ্যারিস। তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামা উসমান খাজাও দ্রুত প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলে আবারো দলের হাল ধরেন মার্নাস লাবুশেন। তিনি ট্রাভিস হেড ও ম্যাথিউ ওয়েডের সাথে ভালো দুটি জুটি গড়েন। এরপর অস্ট্রেলিয়ার দলীয় অধিনায়ক ব্যাট করতে এলে তাকে ডেনলির ক্যাচে পরিণত করেন ব্রড। অস্ট্রেলিয়ার দলীয় স্কোর তখন ৬ উইকেটে ১৬৪ রান।

তবে সপ্তম উইকেট জুটিতে পেটিনসনকে নিয়ে ভালো একটি জুটি গড়েন লাবুশেন। দ্বিতীয় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ১৭১ রান।

তৃতীয় দিনে মার্নাস লাবুশেন ও পেটিনসনের জুটিটি আর বেশিদূর গড়াতে দেননি আর্চার। জো রুটের হাতে ক্যাচ দিয়ে ২০ রান সংগ্রহ করে সাজঘরে ফিরে যান পেটিনসন। এরপর উইকেটের একপ্রান্ত আগলে রাখা লাবুশেন প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। আউট হওয়ার আগে ৮০ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেন তিনি। পরে শেষ পর্যন্ত ২৪৬ রানে থামে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস।

বল হাতেও অসাধারণ ছিলেন বেন স্টোকস; Source: The Telegraph

ইংল্যান্ডের হয়ে বল হাতে বেন স্টোকস ৫৬ রান দিয়ে ৩টি উইকেট শিকার করেন। এছাড়াও আর্চার ও ব্রড ২টি করে এবং ক্রিস ওকস ও লিচ ১টি করে উইকেট লাভ করেন।

৩৫৯ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ডও খুব দ্রুত উদ্বোধনী দুই ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে যায়। তবে তৃতীয় উইকেট জুটিতে জো রুট ও জো ডেনলি শত রানের অসাধারণ এক জুটি গড়েন। হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করে হাজলেউডের বলে ক্যাচ আউট হন ডেনলি। ইংল্যান্ডের দলীয় ১৫৬ রানে তৃতীয় দিনের খেলা শেষ হয়। তখনও প্রয়োজন আরো ২০৩ রান। হাতে ছিল ৭টি উইকেট।

তবে চতুর্থ দিনের শুরুতে জো রুট বেশিক্ষণ উইকেটে টিকতে পারেননি। ব্যক্তিগত ৭৭ রানে নাথান লায়নের বলে ডেভিড ওয়ার্নারের হাতে ক্যাচ তুলে দেন। দলীয় স্কোর তখন ৪ উইকেটে ১৫৯ রান। এরপর বেন স্টোকস ও জনি বেয়ারস্টো বেশ ভালো একটি জুটি গড়তে থাকেন। তবে সে জুটিটিও বেশিদূর গড়াতে দেননি হাজলেউড। দলীয় ২৪৫ রানের মাথায় ৩৬ রান করে আউট হন বেয়ারস্টো।

এরপর উইকেটের একপ্রান্ত বেন স্টোকস আগলে রাখলেও অপরপ্রান্তের ব্যাটসম্যানরা ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের স্কোর গিয়ে দাঁড়ায় ৯ উইকেটে ২৮৬ রান। অতএব ইংল্যান্ডের জয়ের জন্য প্রয়োজন আরো ৭৩ রান এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন একটি মাত্র উইকেট। উইকেটে তখন ব্যাট করছিলেন বেন স্টোকস ও জ্যাক লিচ।

বেন স্টোকস; Source: The Australian

এই অবস্থান হতে বেন স্টোকস দলকে একাই টেনে নিয়ে যেতে থাকেন। এরই মাঝে সেঞ্চুরি পূর্ণ করে ফেলেন স্টোকস। এরপর বেন স্টোকসের সহজ একটি ক্যাচ তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হন হ্যারিস। ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ছিল তখন আরও ১৭ রান। অতএব নতুন জীবন পেয়ে একেবারে দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন স্টকস। তিনি ১৩৫ রানে অপরাজিত থাকেন। তার এই অনবদ্য ইনিংসের সুবাদে ইংল্যান্ড ম্যাচটি জিততে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে হাজলেউড ৮৫ রান দিয়ে ৪টি উইকেট শিকার করেন। এছাড়াও নাথান লায়ন ২টি এবং কুমিন্স ও পেটিনসন ১টি করে উইকেট লাভ করেন।

Featured Image Source: Stadium Astro

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *