টন্টনে টাইগারদের দাপুটে জয়

বিশ্বকাপে টিকে থাকার জন্য বাঁচা মরা লড়াইয়ের ম্যাচে গতকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৭ উইকেটে হারিয়ে দুর্দান্ত জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। প্রথমে ব্যাট করা উইন্ডিজের ছুড়ে দেওয়া ৩২২ রানের বিশাল লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ৫১ বল এবং ৭ উইকেট হাতে রেখেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় টাইগাররা। এই জয়ের মধ্য দিয়ে এবারের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার আশা বাঁচিয়ে রাখলো মাশরাফিরা।

এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে উড়ন্ত সূচনা করেছিল বাংলাদেশ। তবে নিজেদের দ্বিতীয়ত ও তৃতীয় ম্যাচে কিউই ও ইংলিশদের কাছে হার এবং বৃষ্টির কারণে শ্রীলঙ্কার সাথে পয়েন্ট ভাগাভাগিতে ব্যাকফুটে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু গতকাল ইংল্যান্ডের টন্টনে বাংলাদেশকে চনমনে করে তুলেছে সাকিব ও লিটনের অসাধারণ ব্যাটিং। ফলে জয়টাও এসেছে বেশ বড় ব্যবধানে। আইসিসি বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (৩২২) রান তাড়া করে জয় এখন বাংলাদেশের দখলে।

সাকিব ও লিটন : source: icc

সেমিফাইনালের আশা টিকিয়ে রাখতে দু’দলেরই জয়ের বিকল্প নেই, এমন সমীকরণকে সামনে রেখে টন্টন কাউন্টি গ্রাউন্ডে বাংলাদেশ সময় গতকাল বিকাল সাড়ে ৩ টায় মাঠে নামে বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট উইন্ডিজ। টসে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে প্রথমে ব্যাট করার আমন্ত্রণ জানায় টাইগার দলপতি মাশরাফি বিন মর্তুজা।

টসে হেরে ব্যাট করতে প্রথমে মোটেও সুবিধা করতে পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। মাশরাফি আর সাইফউদ্দীনের নিখুঁত লেন্থের বোলিংয়ের ফলে প্রথম তিন ওভারে মাত্র ৬ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় উইন্ডিজ। তবে উইন্ডিজরা মূলত চাপে পড়ে যায় পাওয়ার প্লের চতুর্থ ওভারে। সাইফউদ্দীনের ইনসুইং বোলিংয়ে মুশফিককে সহজ ক্যাচ দিয়ে ১৩ বল খেলে শূন্য রানেই ফিরে যান বিধ্বংসী ওপেনার ক্রিস গেইল।

সাইফউদ্দীন : source: icc

দলীয় মাত্র ৬ রানে মাথায় ক্রিস গেইল ফিরে গেলে ক্রিজে আসেন দুর্দান্ত ছন্দে থাকা শেই হোপ। এভিন লুইসের সঙ্গে জুটি বেঁধে ধীরে ধীরে উইন্ডিজকে এগিয়ে নিতে থাকেন তিনি। দ্বিতীয় উইকেটে তাদের জুটি থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর বোর্ডে মুল্যবান ১১৮ রান যোগ হয়। এরই মধ্যে অর্ধ শত রানে পৌঁছে যান এভিন লুইস।

তবে সাকিবের করা ২৫ তম ওভারের প্রথম বলে ছক্কা হাঁকানোর পর তৃতীয় বলে আবারও ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে কট আউট হন লুইস। ৬৭ বল মোকাবিলা করে ২ চার ও ২ ছক্কায় ৭০ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি। ফলে দলীয় ১২২ রানের মাথায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় উইকেটের পতন ঘটে।

এরপর উইকেটে আসেন নিকোলাস পুরান। তৃতীয় উইকেটে শেই হোপের সঙ্গে গড়েন ৩৭ রানের জুটি। ফলে ৩০ ওভার পেরোতেই ১৫০ রানে পৌঁছে যায় উইন্ডিজরা। কিন্তু ৩৩ তম ওভারে পুনরায় বাংলাদেশকে ব্রেক থ্রু এনে দেন ম্যাচ সেরা সাকিব আল হাসান। সেই ওভারের তৃতীয় বল উড়িয়ে মারতে গিয়ে সৌম্য সরকারের হাতে ধরা পড়েন পুরান। ফলে ১৫৯ রানে মধ্যে তিন উইকেট হারিয়ে বসে উইন্ডিজ।

হেটমায়ার ; source: icc

তবে পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিজে নেমেই ঝড়ো ব্যাটিং শুরু করেন শিমরন হেটমায়ার। সাকিব, সাইফ কিংবা মোস্তফিজ সবার বলই সীমানা ছাড়া করে মাত্র ২৫ বলেই অর্ধ শত রান পূর্ণ করেন হেটমায়ার। ফলে ৩৯ তম ওভার পেরোতেই ২৪০ রানে পৌঁছে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্যারিবিয়ানদের লক্ষ্য তখন স্কোর বোর্ডে বড় সংগ্রহ দাঁড় করানো। কিন্তু ৩৯ তম ওভারে মোস্তফিজের তৃতীয় বলে তামিমের দুর্দান্ত ক্যাচে মাঠ ছাড়েন হেটমায়ার।

তামিমের দুর্দান্ত ক্যাচটি : source: iccc

এরপর ক্রিজে আসেন আরেক বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান আন্দ্রে রাসেল। তবে সেই ৩৯ তম ওভারের ষষ্ঠ বলেই মোস্তফিজের দুর্দান্ত স্লোয়ারে কট বিহাইন্ড হয়ে যান রাসেল। ২ বল মোকাবিলা করে কোন রান না করেই সাজঘরে ফেরেন তিনি। ফলে কমে যায় উইন্ডিজের রান তোলার গতি।

এরপর ক্যারিবিয়ান দলপতি হোল্ডার কিছুটা বিধ্বংসী ব্যাট করলেও বড় করতে পারেনি ইনিংস। তবে অন্য প্রান্তে উইকেট আগলে রেখে খেলতে থাকেন শেই হোপ। যদিও শেষ রক্ষা হয়নি তার। ৪৮ তম ওভারে মোস্তফিজের তৃতীয় শিকার হয়ে ৯৭ রান করে মাঠ ছাড়েন তিনি। এরপর সাইফউদ্দীন আরো একটি উইকেট তুলে নিলে ৫০ ওভার শেষে ৮ উইকেট হারিয়ে ৩২১ রানে থামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস। বাংলাদেশ পক্ষে মোস্তফিজ ও সাইফউদ্দীন তিনটি করে এবং ২ টি উইকেট লাভ করেন।

শেই হোপ ; source: iccc

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছুড়ে দেওয়া ৩২২ রানের বড় লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা দুর্দান্ত হয়েছিল বাংলাদেশের। প্রথমদিকে তামিম ধীর গতিতে খেললেও সৌম্যের ঝড়ো ব্যাটিংয়ের ফলে প্রথম ৮ ওভারে বিনা উইকেটে ৪৬ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের ইনিংসে প্রথম আঘাত আসে এর পরের ওভারেই। আন্দ্রে রাসেলের করা নবম ওভারের তৃতীয় বলে কট আউট হয়ে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন সৌম্য সরকার। কিন্তু আউটের আগে ২ চার ও ২ ছক্কায় উপর্যুপরি ২৯ রান করে যান তিনি।

Source: icc

এরপরই ক্রিজে নামেন এই ম্যাচের অন্যতম জয়ের নায়ক সাকিব আল হাসান। দ্বিতীয় উইকেটে তামিমের সঙ্গে জুটি গড়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে থাকেন তিনি। এরই মাঝে ওয়ানডেতে ৬০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে কম ম্যাচ (২২২) খেলে ৬০০০ রানের পাশাপাশি ২৫০ উইকেট নেওয়া অলরাউন্ডারদের তালিকাতে শীর্ষে এখন সাকিব। পিছনে ফেলেছেন জ্যাক ক্যালিস, শহীদ আফ্রিদিকে। এছাড়া এই ম্যাচে সেঞ্চুরি করার মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ ক্রিকেট অঙ্গনে দ্বিতীয় বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি করছেন তিনি।

দ্বিতীয় উইকেটে তামিম আর সাকিবের সচল ব্যাটিংয়ের ফলে মাত্র ১৪ ওভারেই দলীয় ১০০ রান টপকে যায় বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের ইনিংসের ১৮ তম ওভারে নাটকীয় ভাবে রান আউট হয়ে যান তামিম। ৫৩ বল খেলে ৬ চারের সাহায্য ৪৮ রান করেন তিনি।

এরপর উইকেটে আসেন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। কিন্তু ১৯ তম ওভারের শেষ বলে ওশেন থমাসের বলে মাত্র এক রান করেই কট বিহাইন্ড হন তিনি। ফলে দ্রুত উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ।

হাফ সেঞ্চুরির পর লিটন : source: iccc

কিন্তু চতুর্থ উইকেটে লিটন আর সাকিবের অসাধারণ ব্যাটিং নৈপুণ্যে সহজেই জয়ে বন্দরে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের অভিষেক ম্যাচেই জ্বলে উঠেন লিটন দাস। ৬৯ বলে ৮ চার ও ৪ ছক্কার সাহায্যে খেলেছেন ৯৪ রানের অপরাজিত ইনিংস। অপরদিকে সাকিব আল হাসান তুলে নেন বিশ্বকাপে নিজের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। এছাড়া এই রানের মধ্যে দিয়ে চার ম্যাচে মোট ৩৮৪ রান নিয়ে এবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় আবারো প্রথমে উঠে এসেছেন সাকিব।

Featured photo source: icc

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *