দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বিশ্বকাপে শুভসূচনা করলো টাইগাররা

কিউই লিজেন্ড ব্রেন্ডন ম্যাককালামের প্রেডিকশনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে শুভসূচনা করলো টাইগাররা। যেখানে ম্যাককালামের প্রেডিকশনে বলা ছিল বাংলাদেশ পুরো আসরে একটি মাত্র ম্যাচ জিতবে। অপরদিকে চলতি বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় হারের স্বাদ ভোগ করলো প্রোটিয়ারা।

বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে সৌম্য সরকারের দারুণ সূচনা, সাকিব-মুশফিকের অনবদ্য জুটি এবং শেষে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও মোসাদ্দেক সৈকতের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ৩৩০ রানের বিশাল সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। যা বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্কোর। জবাবে ব্যাট করতে নেমে নিয়মিত উইকেট হারিয়ে ৩০৯ রান করতে সক্ষম হয় আফ্রিকান ব্যাটসম্যারা।

ম্যাচ বিবরণী

গতকাল বিশ্বকাপের পঞ্চম ম্যাচে লন্ডনের কেনিংটন ওভালে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক ফ্যাফ ডু প্লেসি। বাংলাদেশের পক্ষে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে আসেন তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকার। এবং বোলিং আক্রমণে আসেন দক্ষিণ আফ্রিকার ফাস্ট বোলার লুঙ্গি এনগিদি।

সৌম্য সরকার; Image Source: The Telegraph

উদ্বোধনী জুটিতেই দুরন্ত সূচনা এনে দেন তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকার। যদিও পঞ্চম ওভারের এনগিদির শেষ বলে স্লিপে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন সৌম্য সরকার। যা দুই স্লিপারের মাঝ দিয়ে চারে পরিণত হয়। নতুন জীবন ফিরে পেয়ে বেশ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেন সৌম্য। অপরপ্রান্তে তামিম ইকবাল কিছুটা ধীর গতিতে রান তুলতে থাকেন। তবে সেই জুটিতে প্রথম আঘাত হানেন আন্দিলে ফিকোয়াহ। উইকেটরক্ষক ডি ককের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরে যান তামিম ইকবাল। ২৯ বল মোকাবিলা করে ২টি চারে ১৬ রান করেন তিনি।

তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে আসেন সাকিব আল হাসান। তবে সে জুটিটি বেশিদূর এগোতে দেননি ক্রিস মোরিস। পুল শট খেলতে গিয়ে উইকেটরক্ষক ডি ককের হাতে ক্যাচ তুলে দেন সৌম্য সরকার। ৩০ বল খেলে ৯টি চারের সুবাদে ৪২ রানের অনবদ্য এক ইনিংস খেলেন তিনি। দলীয় স্কোর তখন ২উইকেটে ৭৫ রান।

মুশফিক ও সাকিবের জুটি; Image Source: Latestly

এরপর উইকেটে আসেন মিঃ ডিপেন্ডেবল খ্যাত মুশফিকুর রহিম। তাকে নিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে থাকেন সাকিব। ২৫ ওভার শেষে দলীয় স্কোর দাঁড়ায় ২ উইকেটে ১৬০ রান। এরই মাঝে ৪৩তম হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করেন সাকিব। পূর্ণ হয় সাকিব ও মুশফিকের শতরানের জুটি। এরপর মুশফিকুর রহিমও পূর্ণ করেন ব্যক্তিগত ৩৪তম হাফসেঞ্চুরি। তাদের অসাধারণ জুটিতে ৩০ ওভারে বাংলাদেশ দলীয় স্কোর দাঁড়ায় ২ উইকেটে ১৯০ রান।

৩৬তম ওভারের প্রথম বলেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে ব্রেক থ্রু এনে দেন ইমরান তাহির। বোল্ড হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান সাকিব আল হাসান। ভেঙ্গে যায় তাদের ১৪২ রানের অনবদ্য জুটি। আউট হবার আগে ৮৪ বল খেলে ৮টি চার ও ১টি ছয়ে ৭৫ রান করেন সাকিব।

এরপর উইকেটে আসেন মোহাম্মদ মিথুন। তাকে নিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে রান তুলতে থাকেন মুশফিকুর রহিম। তবে সে জুটিও বেশিদূর গড়াতে পারেনি। ৪০তম ওভারে ইমরান তাহিরের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন মোহাম্মদ মিথুন। বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফিরে যান তিনি। আউট হওয়ার আগে ২১ বল খেলে ২টি চার ও ১টি ছয়ে ২১ রান করেন মিথুন। দলীয় স্কোর তখন ৪ উইকেটে ২৪২ রান।

মুশফিকুর রহিম; Image Source: Scroll.in

উইকেটে আসেন সাইলেন্ট কিলার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তবে উইকেটের অপরপ্রান্তে থাকা মুশফিকুর রহিম তাকে সঙ্গ দিতে পারেননি বেশিক্ষণ। ফন ডার ডুসেনের হাতে ক্যাচ দিয়ে আন্দিলে ফিকোয়াহের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন তিনি। ৮০ বল মোকাবিলা করে ৮টি চারের সুবাদে ৭৮ করেন মুশফিক।

এরপর উইকেটে আসেন মোসাদ্দেক। তাকে নিয়ে বেশ দ্রুত রান তুলতে থাকেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ফলে ৪৮ ওভারেই ৩০০ রানের মাইলফলক পূর্ণ করে বাংলাদেশ। এরপরের ওভারেই ক্রিস মরিসের বলে ফিকোয়াহের হাতে ক্যাচ তুলে দেন মোসাদ্দেক। ২০ বল খেলে ৪টি চারে ২৬ রান করেন তিনি। এরপর মেহেদী মিরাজ উইকেটে এলে তাকে নিয়ে ইনিংস শেষ করেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। মেহেদী মিরাজ ৩ বলে ৫ রান ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ৩৩ বলে ৪৬ রান করে অপরাজিত থাকেন। ৫০ ওভার শেষে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ৩৩০ রান। যা বাংলাদেশের একদিনের ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্কোর। দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে আন্দিলে ফিকোয়াও, ক্রিস মোরিস ও ইমরান তাহির ২টি করে উইকেট তুলে নেন।

বিশাল টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে উদ্বোধনী দুই ব্যাটসম্যান এইডেন মার্করাম ও কুইন্টন ডি কক বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে থাকেন। তবে দশম ওভারে মেহেদী মিরাজের বলে প্রোটিয়াদের উদ্বোধনী জুটি ভেঙ্গে যায়। কুইন্টন ডি কক উইকেটের পিছনে ক্যাচ তুলে দিলে তা তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হন মুশফিকুর রহিম। তবে রান নেওয়ার জন্য ডি কক উইকেট থেকে বেড়িয়ে এলে সরাসরি থ্রোতে তাকে রানআউট করেন মুশফিক। ৩২ বল খেলে ২৩ রান করে সাজধরে ফিরে যান ডি কক।

সাকিব আল হাসান; Image Source: espncricinfo.com

দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ব্যাট করতে আসেন দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক ডু প্লেসি। মার্করামকে নিয়ে বেশ ধীরেসুস্থে খেলতে থাকেন তিনি। তবে সেই জুটিকে বেশি বড় করতে দেননি সাকিব আল হাসান। সরাসরি বোল্ড আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান মার্করাম। এরই সাথে দ্বিতীয় বাংলাদেশী বোলার হিসেবে ২৫০ উইকেট শিকার করেন সাকিব। এবং সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে ৫০০০ রান ও ২৫০ উইকেট শিকার করা রেকর্ডের মালিকও এখন তিনি।

এরপর চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে আসেন ডেভিড মিলার। তাকে নিয়ে জুটি গড়তে থাকেন ডু প্লেসি। তুলে নেন ব্যক্তিগত ৩৩তম হাফসেঞ্চুরি। তবে ২৭ তম ওভারে ডু প্লেসিকে বোল্ড আউট করে দলকে ব্রেকথ্রু এনে দেন মেহেদী মিরাজ। ৫৩ বল খেলে ৬২ রান করেন ডু প্লেসি। দলীয় স্কোর তখন ৩ উইকেটে ১৪৭ রান।

পরবর্তী ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে আসেন ফন ডার ডুসেন। তাকে নিয়ে অর্ধশত রানের একটি জুটি গড়েন ডেভিড মিলার। সেই জুটিতে আঘাত হানেন মোস্তাফিজুর রহমান। মেহেদী মিরাজের হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন ডেভিড মিলার। ৪৩ বলে ২টি চারে ৩৮ রান করেন তিনি। এরপর উইকেটে আসেন জেপি ডুমিনি। ৩৮তম ওভারে মুস্তাফিজের প্রথম বলেই এলবিডব্লুর ফাঁদে পড়েন ডুমিনি। তবে রিভিউয়ের আবেদন করে নটআউট প্রমাণিত হওয়ায় জীবন ফিরে পান তিনি।

মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন; Image Source: Hindustan Times

এরপর ৪০ তম ওভারে আগ্রাসী হতে থাকা ফন ডার ডুসেনকে বোল্ড আউট করে সাজঘরে ফেরান সাইফুদ্দিন। ৩৮ বল খেলে ১টি ছয় ও ২টি চারে ৪১ রান করেন ডুসেন। পরবর্তী ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে আসেন ফিকোয়াও। ৪৩তম ওভারে ফিকোয়াহকে ব্যক্তিগত দ্বিতীয় শিকারে পরিণত করেন সাইফুদ্দিন। নতুন ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে আসেন ক্রিস মোরিস। ৪৬তম ওভারে মরিসকে সৌম্য সরকারের ক্যাচে পরিণত করেন মুস্তাফিজ। দলীয় স্কোর তখন ৭ উইকেটে ২৭৫ রান।

জিততে হলে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়োজন ২৪ বলে ৫৫ রান। ৪৮তম ওভারের প্রথম বলে দ্রুত রান তুলতে থাকা ডুমিনিকে ফেরান মুস্তাফিজ। এরপর কাসিগো রাবাদা ও ইমরান তাহির দলকে আর জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি। ৫০ ওভার শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা ৩০৯ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। ফলে ২১ রানের জয় পায় বাংলাদেশ।

মুস্তাফিজুর রহমান; Image Source: www.indiatoday.in

বাংলাদেশের পক্ষে মুস্তাফিজুর রহমান ৬৭ রান দিয়ে ৩টি উইকেট শিকার করেন। এছাড়াও সাইফুদ্দিন ২টি এবং সাকিব ও মিরাজ একটি করে উইকেট তুলে নেন।অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের জন্য ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন সাকিব আল হাসান।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ ৩৩০/৬ (৫০ ওভার)

সাকিব ৭৮, ফিকোয়াও ২/৫২

দক্ষিণ আফ্রিকা ৩০৯/৮ (৫০ ওভার)

প্লেসি ৬২, মুস্তাফিজ ৬৭

Featured Image Source: Dream11indian

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *