অ্যাশেজের বিখ্যাত সব বাকযুদ্ধ

মর্যার্দার দিক থেকে ওডিআই ও টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরেই অ্যাশেজের অবস্থান। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার এই টেস্ট সিরিজটি ধারেভারে অন্যসকল টেস্ট সিরিজ থেকে বেশ এগিয়ে। ১৩৭ বছরের বেশী সময় ধরে অ্যাশেজ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। শতবর্ষের অধিক সময় পার করে এসেও অ্যাশেজ আজো চিত্তাকর্ষক। ক্রিকেট ইতিহাসের বহু রথীমহারথী সাদা পোশাকে অ্যাশেজ খেলে গেছেন। গড়ে গেছেন অসংখ্য রেকর্ড। ১৮৭৭ সালের ১৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে টেস্ট ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হয়। তবে অ্যাশেজের যাত্রা তারও আগে। ১৮৮২-৮৩ মৌসুমে প্রথমবারের মতো অ্যাশেজ অনুষ্ঠিত হয়।

ক্রিকেট বিশ্বে অ্যাশেজের যে জনপ্রিয়তা, তার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার লড়াই মানেই মাঠ ও মাঠের বাইরে খেলোয়াড়দের যুদ্ধংদেহী মনোভাব। কেউ কাউকে একচুল জায়গা ছেড়ে দিতে রাজি নয়। ক্রিকেটীয় লড়াই থেকে বাকযুদ্ধ সবখানেই দুই দল একেবারে সমানে সমান। অনেক ক্রিকেট ভক্ত অ্যাশেজকে দুটি কারণে ভালোবাসেন। এক, এই সিরিজে নিখাদ টেস্ট লড়াই দেখা যায়। আর দুই, এখানে মুখের লড়াইও বেশ চমৎকার। যদিও আইসিসি স্লেজিংকে সমর্থন করে না, এরপরও অ্যাশেজে এটি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মাইকেল ক্লার্ক এবং জেমস অ্যান্ডারসনের বাকযুদ্ধ; Image Source: Getty Images

সম্প্রতি আইসিসির পক্ষ থেকে স্লেজিং বন্ধ করার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এই বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি অজি ক্রিকেটাররা। তারা আইসিসির এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। কেননা স্লেজিং তাদের রক্তে মিশে গেছে। যার চর্চা তারা অ্যাশেজ সিরিজেই বেশি করে থাকেন। অ্যাশজকে বলা হয় ‘ব্যাট, বল আর মুখের লড়াই’। তাই এখানে ব্যাট ও বলের বাইরে মুখেরও অনেক লড়াই দেখা যায়। আজ আমরা অ্যাশেজের বিখ্যাত কিছু স্লেজিং বা বাকযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করবো।

ডব্লিউ জি গ্রেস বনাম এনরি জোনস

ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান ডব্লিউজি গ্রেস বেশ শান্ত স্বভাবের ছিলেন। যদিও তাকে দেখতে কড়া স্বভাবেরই মনে হতো। কিন্তু আদতে তার মধ্যে আক্রমণাত্মক কোনো মনোভাবই ছিল না। তিনি যখন ব্যাট হাতে মাঠে আসতেন তখন খুবই কম কথা বলতেন। চেষ্টা করতেন এক মনে খেলে যাওয়ার। কিন্তু সেই মানুষটাকেই রাগানোর চেষ্টা করেন অজি পেসার এনরি জোনস।

ডব্লিউ.জি গ্রেস; Source: sports360.com

১৮৯৬ সালের অ্যাশেজের প্রথম টেস্টে লর্ডসে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিক ওপেনার ডব্লিউ জি গ্রেসকে পরাস্ত করার জন্য শর্ট বল করেন অজি পেসার এনরি জোনস। তার একটি ডেলিভারি সরাসরি গ্রেসের দাঁড়ির মধ্যে ঢুকে যায়। তখন জোনস বলেন,

দুঃখিত ডাক্তার, হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে।

গ্রেস ছিলেন মূলত একজন ডাক্তার। এ কারণেই জোনস মজা করে এই কথাটি বলেন। কিন্তু গ্রেস কিছুটা রেগে গেলেও অজি পেসারের কথার কোনো জবাব দেননি।

বিল উডফুল বনাম ডগলাস জার্ডিন

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট ভক্তদের কাছে ডগলাস জার্ডিন এক অপ্রিয় নাম। জার্ডিন অবশ্য বেশ বিতর্কিত এক ক্রিকেটার। তিনি বেশ রাগী স্বভাবের ছিলেন, সেই সাথে তার মুখের ভাষাও ছিল বেশ বাজে। তিনি ক্রিকেট ইতিহাসে ব্যাট হাতে কোনো কীর্তি দিয়ে বিখ্যাত না হলেও একটি কথা দিয়েই স্মরণীয় হয়ে আছেন।

জার্ডিন ও উডফুল; Image Source: The Cricketer International

১৯৩২-৩৩ মৌসুমে অ্যাশেজ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় যায় ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল। সেই সিরিজে অজিদের বিপক্ষে শরীর বরাবর বল করার সিদ্ধান্ত নেয় ইংলিশরা। এই কারণেই সেই টেস্ট সিরিজকে বলা হয় ‘বডিলাইন’ সিরিজ। ইংলিশ পেসারদের পরিকল্পনা বেশ কাজেও দেয়। সেই সিরিজে তারা পাঁচ টেস্টের মধ্যে চারটিতে জয় পায়। তবে অস্ট্রেলিয়ার কোনো একজন ব্যাটসম্যান ইংলিশ পেসারকে হ্যারল্ড লারউডকে গালি দিয়ে বসেন। এই বিষয়ে অভিযোগ করার জন্য ইংলিশ অধিনায়ক জার্ডিন অজি ড্রেসিংরুমে গিয়ে তাদের অধিনায়ক উডফুলকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

এই অবৈধ সন্তান (বাস্টার্ড) ছাড়া (উডফুল) তোমাদের মধ্যে আর কোন অবৈধ সন্তান লারউডকে অবৈধ সন্তান বলেছো?

ডগলাস জার্ডিন বনাম ইয়াব্বা

আগেই বলেছি জার্ডিন ছিলেন অজি ক্রিকেট ভক্তদের মধ্যে সবচেয়ে অপ্রিয় ইংলিশ ক্রিকেটার। আর তার মন্তব্যের জন্য সেই তিক্ততা আরো বাড়তে থাকে। ১৯৩২-৩৩ সালের সেই সিরিজে তিনি যখন সিডনিতে খেলতে যান, তখন তাকে সিডনির বিখ্যাত হেকলার (যারা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন) ইয়াব্বার (স্টেফান গ্যাসকোইগনে) মুখোমুখি হন।

সিডনিতে ইয়াব্বার মূর্তি; Image Source: lynnwalsh.wordpress.com

জার্ডিন যখন সীমানার দিকে ফিল্ডিং করছিলেন, তখন তার আশেপাশে কিছু মাছি উড়তে দেখা যায়। সেগুলো কোনোভাবেই তার পিছু ছাড়ছিল না। তখন দর্শক সারি থেকে ইয়াব্বা উঠে বলেন,

জার্ডিন, আমাদের মাছিগুলোকে একা থাকতে দাও। এখানে ওরাই তোমার একমাত্র বন্ধু।

ইয়াব্বা তার এই মন্তব্যের জন্য বেশ বিখ্যাত হন। এবং তাকে উৎসর্গ করে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে একটি মূর্তি তৈরি করা হয়, যেটি এখনো আছে।

শেন ওয়ার্ন বনাম পল কলিংউড

২০০৫ সালে অ্যাশেজ জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের সকল ক্রিকেটারকে ব্রিটেনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদক ‘মেম্বার অব দ্য মোস্ট এক্সিলেন্ট অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (এমবিই)’ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।

শেন ওয়ার্ন এবং পল কলিংউড; Image Source: News Corp Australia

যে সকল ক্রিকেটার এই পদক পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে পল কলিংউডও ছিলেন। কিন্তু তার বলার মতো কোনো পারফরম্যান্স ছিল না। তিনি শুধুমাত্র ওভাল টেস্টে ১৭ রান করেছিলেন। এই বিষয়টিকে খোঁচা মারেন অজি লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন। কলিংউডকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

তুমি এমবিই পেয়েছো, তাই না? ওভালে ১৭ রান করার জন্য? বিষয়টি সত্যই অবাক করার মতো।

ফিল টাফনেল বনাম দর্শক

১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে অ্যাশেজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া সফরে যায় ইংল্যান্ড। সেই সিরিজে এক মজার ঘটনার জন্ম দেন ইংলিশ বোলার ফিল টাফনেল। এক ম্যাচে তিনি বল করার সময় অস্ট্রেলিয়ান আম্পায়ার পিটার ম্যাককোনেলকে প্রশ্ন করে বসেন, ওভার শেষ হতে আর কয় বল বাকি? এই প্রশ্নের পর আম্পায়ারও কিছুটা অবাক হন। কারণ এই প্রশ্ন সাধারণত ব্যাটসম্যানরা করে থাকেন।

পরবর্তীতে তিনি যখন সীমানার দিকে ফিল্ডিং করতে যান তখন কিছু অস্ট্রেলিয়ান দর্শক তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

টাফনেল তোমার মস্তিষ্ক আমাদের ধার দাও, আমরা একটা গাধা (নির্বোধ ব্যক্তি) তৈরি করছি।

Featured Image: News Corp Australia

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *