২৫০ রানের টার্গেটে ব্যাট করে জিতে যাওয়া ৫ টেস্ট ম্যাচ

চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট হাতে টিকে থাকা আর গতানুগতিকভাবে রানে তুলে নেওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য। আর দক্ষতার বিষয় তো বটেই। চতুর্থ ইনিংসে যে কোনো দলকে ২৫০ বা এর বেশি রানের লক্ষ্য ছুড়ে দিতে পারলেই বিপক্ষ দল ম্যাচ জয়ের বিষয়ে বেশ আশাবাদী হয়ে থাকতেই পারেন। বিগত তিন বছরের পরিসংখ্যান তাই বলে।

Image Source: ESPNCricinfo

২০১৬ সাল থেকে টেস্ট র‍্যাংকিংয়ে ৪ নম্বরে থাকা ইংল্যান্ড, ৬ নম্বরে থাকা শ্রীলঙ্কা ও ৮ নম্বরে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছাড়া কোনো দলই ২৫০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জয়ের দেখা পায়নি। চলুন দেখে নেওয়া যাক গত তিন বছরে ২৫০ রান তাড়া করে জয় লাভ করা ৫টি টেস্ট ম্যাচ সম্পর্কে।

১. জিম্বাবুয়ে বনাম শ্রীলঙ্কা

কলম্বো; ২০১৭

২০১৭ সালে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কা সফরে যায়। সে সফরে ৫টি একদিনের ম্যাচ ও ১টি টেস্ট খেলে দুই দল। ওডিআই সিরিজ ৩-২ ব্যবধানে জয় লাভ করে জিম্বাবুইয়ানরা। পরের লক্ষ্যটা ছিল টেস্ট সিরিজটাও জেতা। কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি সফরকারীদের। এই শতকের সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে সফল হওয়ার রেকর্ড করে ম্যাচটি জিতে নেয় স্বাগতিকরা।

Image Source: ESPNCricinfo

সিরিজের একমাত্র টেস্ট ম্যাচটিতে টসে জিতে ব্যাটিংয়ে নামে জিম্বাবুয়ে। ক্রেগ আরভিনের ১৬০ রানের ওপর ভর করে ৩৫৬ রান সংগ্রহ করে তারা। জবাবে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে টপ অর্ডারদের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ভালো শুরু পায় লঙ্কানরা। কিন্তু মিডেল অর্ডার আর লোয়ার অর্ডারদের ব্যর্থতায় বেশি দূর এগোতে পারেনি তারা। প্রথম ইনিংসে জিম্বাবুয়ের দেওয়া লক্ষ্য থেকে ১০ রান দূরে থেকে অলআউট হয়ে যায় তারা।

Image Source: ESPNCricinfo

স্বাগতিকদের থেকে ১০ রান এগিয়ে থেকে তৃতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে সফরকারীরা। সে ইনিংসে লঙ্কান বোলারদের তোপে ৬০ রানের আগেই ৫ উইকেট হারায় জিম্বাবুয়ে। তখন দলের হাল ধরে সিকান্দার রাজা। তাঁর শতকে বড় সংগ্রহের দিকে যেতে থাকে জিম্বাবুয়ে। শেষ ইনিংসে ৩৮৭ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দেয় তারা। জয়ের জন্য ব্যাট করতে নেমে দারুণ শুরু করে ওপেনার করুনারত্নে ও উপল থারাঙ্গা।

Image Source: ESPNCricinfo

থারাঙ্গার ৪৯, কুশাল মেন্ডিসের ৬৬, নিরোশন ডিকওয়েলার ৮১ ও আসেলা গুণারত্নের অপরাজিত ৮০ রানের উপর ভর করে ৪ উইকেট হাতে রেখেই জয় তুলে নেয় স্বাগতিকরা। যা ছিল এই শতকের সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয় লাভ করার রেকর্ড।

২. ইংল্যান্ড বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ

হেডিংলি; ২০১৭

৩ ম্যাচ সিরিজের ১ম টেস্টে ইনিংস ও ১৮৬ রানের ব্যাবধানে পরাজয় লাভ করে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজ। হার দিয়ে সিরিজ শুরু করা ক্যারিবিয়ানরা সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ঘুরে দাঁড়ায়। ওই ম্যাচের দুই ইনিংসে শতক পূর্ণ করে দলকে জয়ের স্বপ্ন দেখান শাই হোপ। তার ১৪৭ ও অপরাজিত ১১৮ রানের ইনিংস হেডিংলিতে ক্যারিয়ানদের জয়ের স্বাদ পাইয়ে দেয়।

Image Source: ESPNCricinfo

ম্যাচটিতে টসে জিতে আগে ব্যাট করে ১ম ইনিংসে বেন স্টোকসের শতকে ২৫৮ রানের পুঁজি পায় ইংলিশরা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে শাই হোপের ১৪৭ ও কার্লোস ব্রাথওয়েটের ১৩৪ রানে ৪২৭ রান সংগ্রহ করে উইন্ডিজ। তৃতীয় ইনিংসে ১৬৯ রানে পিছিয়ে থেকে ব্যাট করতে নামে স্বাগতিকেরা। ৮ উইকেটে ৪৯০ রান করে ইনিংস ঘোষণা করে ইংলিশরা।

Image Source: ESPNCricinfo

জয়ের জন্য ৩২১ রানের টার্গেট পায় ক্যারিবিয়ানরা। চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে কার্লোস ব্রাথওয়েটের ৯৫ ও হোপের অপরাজিত ১১৮ রানের ওপর ভর করে ৫ উইকেট হাতে রেখেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় তারা। অসাধারণ ব্যাটংয়ের জন্য ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কার পান হোপ।

৩. শ্রীলঙ্কা বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা

ডারবান; ২০১৯

২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকায় সফর করার আগে তাদের মাটিতে ১৩টি টেস্ট ম্যাচ খেলে। যার ১১টি ম্যাচই হারে লঙ্কানরা। জয়ের দেখা পায় ১ ম্যাচে আর ১ ম্যাচ হয় ড্র। ২০১৯ এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে কখনো সিরিজ জেতা হয়নি তাদের। শুধু তারাই নয় এশিয়ার কোনো দেশই প্রোটিয়াদের মাটিতে ২০১৯ সালের আগ পর্যন্ত টেস্ট সিরিজ জয় লাভ করতে পারেনি।

Image Source: ESPNCricinfo

চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে সফরকারী শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই ম্যাচের একটি টেস্ট সিরিজ খেলে দক্ষিণ আফ্রিকা। ডারবানে সিরিজের প্রথম টেস্টে মুখোমুখি হয় দুই দল। ম্যাচটিতে টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় লঙ্কানরা। ব্যাটিংয়ে নেমে মাত্র ১৯১ রান তুলতেই সব কয়টি উইকেট হারায় প্রোটিয়ারা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ২৩৫ রানে গুটিয়ে যায় সফরকারীদের ইনিংস।

Image Source: ESPNCricinfo

৪৬ রান পিছিয়ে থেকে তৃতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ডু প্লেসিসের ৯০ ও ডি ককের ৫৫ রানের উপর ভর করে ২৫৯ রানের পুঁজি পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। জয়ের জন্য ৩০৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা দারুণ হলেও মাত্র ১১০ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় তারা। তখনই দলের হাল ধরেন কুশাল পেরেরা ও ডি সিলভা। দুই জনে মিলে ৯৬ রানের জুটি গড়েন যাতে দলের মোট সংগ্রহ দাঁড়ায় ২০৬ রান।

Image Source: ESPNCricinfo

পরের ২০ রান তুলতেই আরও তিন উইকেট হারিয়ে ৯ উইকেটে দলের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২২৬ রান। তখনও জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৭৪ রান, হাতে ছিল ১ উইকেট। মাঠে টিকে ছিলেন পেরেরা ও ফার্নান্দো। সেট ব্যাটসম্যান পেরেরা আক্রমণাত্মকভাবে খেলতে থাকেন, অন্য প্রান্ত থেকে তাকে ভালো সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছিলেন ফার্নান্দো।

Image Source: ESPNCricinfo

৭৪ রানের ৬ রান আসে তার ব্যাট থেকে, মোকাবেলা করেন ২৭ বল। অন্যদিকে শতক পূর্ণ করার পর দেড়শ রানের ইনিংস খেলেন পেরেরা। দলকে জিতিয়ে ১৫৩ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি।

৪. শ্রীলঙ্কা বনাম নিউজিল্যান্ড

২০১৯; গল

বিশ্বকাপ শেষে নিউজিল্যান্ডের প্রথম মিশন ছিল শ্রীলঙ্কা সফর। সে সফরে ২ ম্যাচের একটি টেস্ট সিরিজ ছিল। সিরিজের প্রথম টেস্টে সফরকারীরা টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাটিংয়ে নেমে ২৪৯ রানে থেমে যায় তাদের প্রথম ইনিংস। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ২৬৭ রান সংগ্রহ করে লঙ্কানরা। ১৮ রানে পিছিয়ে থেকে তৃতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে কিউইরা।

Image Source: ESPNCricinfo

সে ইনিংসেও নড়বড়ে অবস্থানে ছিল নিউজিল্যান্ড। সবকয়টি উইকেট হারিয়ে সংগ্রহ করে ২৮৫ রান। ফলে জয়ের জন্য স্বাগতিকদের প্রয়োজন ছিল ২৬৮ রান। জয়ের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে দিমুথ করুনারত্নে আর থিরিমান্নের ১৬১ রানের জুটিতে জয় অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায় শ্রীলঙ্কার। ৬৪ রানে থিরিমান্নে থেমে গেলেও শতক পূর্ণ করেন করুনারত্নে।

Image Source: ESPNCricinfo

২৪৩ বলে ১২২ রানে যখন সাজঘরে ফেরেন তখন দলের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেট হারিয়ে ২১৮ রান। জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৪০। তার বিদায়ের পর অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস ও ডি সিলভার ব্যাটে জয় পায় লঙ্কানরা। অসাধারণ ইনিংসের জন্য ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কার পান করুনারত্নে।

৫. ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়া

হেডিংলি;২০১৯

বিশ্বকাপের পরপরই শুরু হয় ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার মর্যাদার লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় সিরিজ অ্যাশেজ। বিশ্বকাপটা যেখানে শেষ হয়েছিল সেখান থেকে অ্যাশেজের শুরু হয়নি স্বাগতিক ইংল্যান্ডের। প্রথম টেস্ট হার, দ্বিতীয় টেস্টে ড্র নিয়ে তৃতীয় টেস্টে জয়ের আশায় মাঠে নামে ইংলিশরা।

Image Source: ESPNCricinfo

নানা নাটকীয়তায়, বেন স্টোকসের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিং ও লিচের সাথে তার শেষ উইকেটের ৭৬ রানের জুটি সিরিজ সমতায় ফেরায় স্বাগতিকদের। ম্যাচটিতে টসে হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে প্রথম ইনিংসে ১৭৯ রানে অলআউট হয়ে যায় অজিরা। জবাবে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ৬৭ রানেই অলআউট হয়ে যায় ইংলিশরা।

Image Source: ESPNCricinfo

১১২ রানে এগিয়ে থেকে তৃতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ২৪৬ রানে থেমে যায় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। ফলে ৩৫৯ রানের বিশাল টার্গেট পায় স্বাগতিকরা। ব্যাট করতে নেমে প্রথম দিকে উইকেট হারালেও রুট, ডেনলিদের ব্যাটিং দৃঢ়তায় জয়ের আশা জাগে ইংলিশ শিবিরে। কিন্তু শেষ দিকে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে তারা। ফলে শেষ উইকেটে প্রয়োজন ছিল ৭৪ রানের।

Image Source: ESPNCricinfo

শতকের দোরগোড়ায় থাকা স্টোকসের সঙ্গী ছিলেন জ্যাক লিচ। ৭৪ রানের মাত্র ১ রান করেন লিচ, যাতে তিনি খেলেছেন ১৭ বল। অন্যপ্রান্তে আক্রমণাত্মক শট খেলতে থাকেন স্টোকস। পূর্ণ করেন শতক। জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় দল। তার ২১৯ বলে অপরাজিত ১৩৫ রানের ইনিংসে এক ঐতিহাসিক জয় লাভ করে ইংল্যান্ড। অনেকে একে আবার এই শতকের সেরা টেস্ট ম্যাচ হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন।

Featured image: ESPNCricinfo

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *