রান সংখ্যায় এগিয়ে থাকা পাঁচটি ওডিআই ম্যাচ

যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে ঐতিহাসিক ম্যাচ কোনটি? নিশ্চয়ই ২০০৬ সালের অস্ট্রেলিয়া বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচটি চোখের সামনে ভেসে উঠবে? হ্যাঁ, সেই ম্যাচটি ইতিহাসের অন্যতম শ্বাসরুদ্ধকর একটি ম্যাচ। সেদিন অস্ট্রেলিয়া বিগত সব রেকর্ড ভেঙ্গে ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়ে। একই ম্যাচে ১ বল ও ১ উইকেট হাতে রেখে সেই রেকর্ড টপকে জয় ছিনিয়ে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। এবং এক ম্যাচে দুইটি দলের মোট রান সংখ্যা হিসেবেও সেই ম্যাচটি এখনও রেকর্ড তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। আজ সেরকমই শীর্ষ পাঁচটি ম্যাচ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

৫. ভারত বনাম ইংল্যান্ড (৭৪৭ রান)

২০১৭ সালে ভারতের কটকে তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামে ভারত। টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ইংল্যান্ড। ব্যাট করতে নেমে প্রথমেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে যার ভারত। দলীয় ২৫ রানে ৩ উইকেট হারালে চতুর্থ উইকেট জুটিতে যুবরাজ সিং ও এমএস ধোনি ২৫৬ রানের অনবদ্য এক জুটি গড়েন। যুবরাজ সিংয়ের ১২৭ বলে ১৫০ ও এমএস ধোনির ১২২ বলে ১৩৪ রানের সুবাদে সবমিলিয়ে ৫০ ওভার শেষে ৬ উইকেটে ৩৮১ রান সংগ্রহ করে ভারত।

ইংল্যান্ড ও ভারত; Source: zeenews.india.com

বিশাল টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে উদ্বোধনী জুটিতে ভালো করতে না পারলেও দ্বিতীয় উইকটের জুটিতে জেসন রয় ও জো রুট ১০০ রান তুলেন। জো রুট ৫৪ রানে আউট হলে এউইন মরগানের সাথে আরেকটি ছোট জুটি গড়েন জেসন রয়। এরপর রয় ৮২ রানে আউট হলে নিয়মিত বিরতিতে উইকেটের পতন হতে থাকে ইংল্যান্ডের। তবে একপ্রান্ত এউইন মরগান আগলে রাখলেও অপরপ্রান্তে তাকে সঙ্গ দিতে পারেনি কোনো ব্যাটসম্যান। ফলে মরগানের ৮১ বলে ১০২ রানের ইনিংসটিও দলকে জেতাতে পারেনি। ম্যাচটি ১৫ রানে হেরে যায় ইংল্যান্ড।

ম্যাচটিতে ১০০ ওভার ব্যাট করে ১৪টি উইকেট হারিয়ে ৭.৪৭ গড়ে ৭৪৭ রান সংগ্রহ করে দুই দল। এটি ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে এক ম্যাচে দুই দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহের তালিকায় শীর্ষ পাঁচে রয়েছে।

৪. ইংল্যান্ড বনাম নিউজিল্যান্ড (৭৬৩ রান)

২০১৫ সালে লন্ডনের কেনিংটন ওভাল স্টেডিয়ামে পাঁচ ম্যাচ সিরিজে দ্বিতীয় ম্যাচে মুখোমুখি হয় নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ড। টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ৬১ রান তুলেন। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম আউট হলে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে আরেকটি ছোট জুটি গড়েন মার্টিন গাপটিল ও কেন উইলিয়ামসন। এরপর গাপটিল ৫০ রান করে আউট হলে তৃতীয় উইকেট জুটিতে রস টেলর ও কেন উইলিয়ামসন ১২১ রানের অসাধারণ এক জুটি গড়েন। কেন উইলিয়ামসনের ৯৩ ও রস টেলরের অপরাজিত ১১৯ রানের উপর ভর করে ৫০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ৩৯৮ রান সংগ্রহ করে নিউজিল্যান্ড।

নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ড; Source: indianexpress.com

জবাবে ইংল্যান্ডের উদ্বোধনী দুই ব্যাটসম্যান অ্যালেক্স হেলস ও জেসন রয় ৮৫ রান তোলেন। এরপর দ্রুত আরো দুই উইকেটের পতন হয়। এরপর চতুর্থ ও পঞ্চম উইকেট জুটিতে বেন স্টোকস ও জশ বাটলারের সাথে ৬৩ ও ৯৬ রানের দুটি জুটি গড়েন এউইন মরগান। পরে মরগানও ৪৭ বলে ৮৮ রান করে আউট হন। পরে আর কোনো ব্যাটসম্যানই বড় জুটি গড়তে পারেনি। অবশেষে বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচে ৪৬ ওভার শেষে ৯ উইকেট হারিয়ে ৩৬৫ রান করতে সক্ষম হয় ইংল্যান্ড। ডাক-ওয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে ১৫ রানে ম্যাচ জিতে যায় নিউজিল্যান্ড। ম্যাচটিতে দুই দল মিলে ৯৬ ওভার ব্যাট করে ১৪ উইকেট হারিয়ে ৭.৯৪ গড়ে ৭৪৭ রান সংগ্রহ করে।

৩. ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম ইংল্যান্ড (৮০৭ রান)

২০১৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের গ্রেনাডায় অবস্থিত ন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাঁচ ম্যাচ সিরিজের চতুর্থ ম্যাচে মুখোমুখি হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড। টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক জেসন হোল্ডার৷ প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ডের দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান শুভসূচনা করেন। উদ্বোধনী দুই ব্যাটসম্যান জনি বেয়ারস্টোর ৫৬ ও অ্যালেক্স হেলস ৮২ রানে আউট হলে চতুর্থ উইকেট জুটিতে শুরু হয় এউইন মরগান ও জশ বাটলারের ব্যাটিং তাণ্ডব। গড়েন ২০৪ রানের অনবদ্য এক জুটি। এরই মাঝে দুজনই পূর্ণ করেন ব্যক্তিগত সেঞ্চুরি। এউইন মরগানের ১০৩ ও জশ বাটলারের ১৫০ রানের সুবাদে ৫০ ওভার শেষে ৬ উইকেটে ৪১৮ রান সংগ্রহ করে ইংল্যান্ড।

গেইলকে আউট করার পর ইংল্যান্ডের উল্লাস ছিল দেখার মতো; Source: Newsd

পাহাড় সমতুল্য লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে প্রথমেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে ক্রিস গেইল প্রথম ওভার হতেই আগ্রাসী হয়ে ব্যাট চালাতে থাকেন। তৃতীয় উইকেট জুটিতে ১০৭ বলে ১৭৬ রান সংগ্রহ করেন ক্রিস গেইল ও ড্যারেন ব্রাভো। ব্রাভো ৬১ রানে আউট গেলে রান তোলার গতি কমে যায়। এরপর দলীয় ২৯৫ রানের মাথায় ৯৭ বলে ১৬২ রানে আউট হন ক্রিস গেইল৷ শেষে অ্যাশলে নার্স ও কার্লোস ব্রাথওয়েটের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ম্যাচ জেতার আশঙ্কা জাগলেও তারা দুজন আউট হলে তা আর সম্ভব হয়নি৷ ৪৮ ওভার শেষে সবকটি উইকেট হারিয়ে ৩৮৯ রান সংগ্রহ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অতএব দুদল ৯৮ ওভার ব্যাট করে ১৬টি উইকেট হারিয়ে ৮.২৩ গড়ে মোট ৮০৭ রান করে। এটি ওয়ানডে ক্রিকেটে এক ম্যাচের দুই ইনিংস মিলিয়ে সর্বোচ্চ রানের তালিকায় তিন নম্বরে রয়েছে।

২. ভারত বনাম শ্রীলঙ্কা (৮২৫ রান)

২০০৯ সালে ভারতের রাজকোটে পাঁচ ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মুখোমুখি হয় ভারত ও শ্রীলঙ্কা৷ টসে জিতে ভারতকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানায় শ্রীলঙ্কা। ব্যাট করতে নেমে উদ্বোধনী জুটিতে ১৫৩ রান সংগ্রহ করেন বীরেন্দর শেবাগ ও শচীন টেন্ডুলকার। ৬৯ রানে শচীন আউট হলে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে এমএস ধোনির সাথে ১৫৬ রানের আরেকটি জুটি গড়েন শেবাগ। ১০২ বলে ১৪৬ রান করে শেবাগ আউট হলে একটু পরে ধোনিও ৭২ রান করে আউট হয়ে যান। এরপর বড় কোনো জুটি গড়তে না পারলেও ৫০ ওভার শেষে ভারতের সংগ্রহ গিয়ে দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ৪১৪ রান।

তিলকরত্নে দিলশান; Source: indiatimes.com

৪১৫ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে উদ্বোধনী জুটিতে ১৮৮ রান তুলেন উপুল থারাঙ্গা ও তিলকরত্নে দিলশান। থারাঙ্গা ৬৭ রান করে আউট হলে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে কুমার সাঙ্গাকারার সাথে আরেকটি শত রানের জুটি গড়েন দিলশান। এরপর ৯০ রানে সাঙ্গাকারা ও ১২৪ বলে ১৬০ রান করে দিলশান সাজঘরে ফিরে গেলে দ্রুতই উইকেট হারাতে থাকে শ্রীলঙ্কা। এরপর অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস দলকে জয়ের খুব কাছাকাছি নিলেও শেষ পর্যন্ত জেতাতে পারেননি তিনি। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ৪১১ রান করতে সক্ষম হয় শ্রীলঙ্কা। ফলে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ৩ রানের জয় পায় ভারত। ম্যাচটিতে দুই দল পুরোপুরি ১০০ ওভার ব্যাট করে ১৫ উইকেট হারিয়ে ৮.২৫ গড়ে ৮২৫ রান সংগ্রহ করে।

১. দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম অস্ট্রেলিয়া (৮৭২ রান)

২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে পাঁচ ম্যাচ সিরিজের সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে মাঠে নামে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া। টসে জিতে প্রথম ব্যাট করতে নেমে শুভসূচনা করে অস্ট্রেলিয়ান দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও সাইমন ক্যাটিচ। ৫৫ রান করে গিলক্রিস্ট আউট হলে দলীয় অধিনায়ক রিকি পন্টিং উইকেটে এসে সাইমন ক্যাটিচের সাথে ১১৯ ও মিচেল হাসির সাথে ১৫৮ রানের দুটি জুটি গড়েন। সাইমন ৭৮ ও মিচেল হাসি ৫১ বলে ৮১ রান করে আউট হন। রিকি পন্টিং ১০৫ বলে ১৬৪ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেন। সবমিলিয়ে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৪ উইকেটে ৪৩৪ রানের বিশাল স্কোর গড়ে অস্ট্রেলিয়া।

উল্লাসিত দক্ষিণ আফ্রিকা; Source: hindi.sportzwiki.com

জবাবে ব্যাট করতে নেমে প্রথমেই উইকেট হারায় দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে গ্রায়েম স্মিথ ও হার্সেল গিবস ১৮৭ রানের অসাধারণ এক জুটি গড়েন। স্মিথ ৫৫ বল খেলে ৯০ রান করে আউট হলেও তৃতীয় উইকেট জুটিতে এবিডি ভিলিয়ার্সের সাথে ৯৪ রানের আরেকটি জুটি গড়েন হার্সেল গিবস। তবে ২৯৯ রানের মাথায় ১১১ বল খেলে ১৭৫ রানে আউট হন গিভস। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়তে থাকে। তবে শেষে এসে জোহান ভ্যান ডারের ৩৫ ও মার্ক বাউচারের অপরাজিত ৫০ রানের উপর ভর করে ১ বল হাতে রেখে ১ উইকেটের জয় পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। দুই দল ৯৯.৫ ওভার ব্যাট করে ১৩টি উইকেট হারিয়ে ৮.৭৩ গড়ে মোট ৮৭২ রান তুলে। যা ক্রিকেট ইতিহাসে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ রান।

Featured Image Source: sportskeeda

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *