‘২০১৫’ বিশ্বকাপের বিখ্যাত কয়েকটি ঘটনা

নিঃসন্দেহে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসর আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ। ১৯৭৫ সালে ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বকাপের প্রথম আসর। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত সর্বমোট ১১ বার অনুষ্ঠিত হয়েছে ক্রিকেটের এই সেরা আসর। সর্বশেষ ২০১৫ সালে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া যৌথভাবে আয়োজন করে বিশ্বকাপের ১১তম। সেই আসরের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় অস্ট্রেলিয়া।

২০১৫ সালের বিশ্বকাপ ছিল সব উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনায় ভরপুর। জন্ম দিয়েছিল অসংখ্য নতুন রেকর্ডের। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথমবারের মতো নক আউট পর্বে খেলা, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম নক আউট পর্বে জয় সবই ঘটেছিল ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে।

বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে খেলা ডট কোর আজকের আয়োজনে থাকছে ২০১৫ বিশ্বকাপের বিখ্যাত কয়েকটি ঘটনা।

১. অপ্রতিরোধ্য সাঙ্গাকারার ধারাবাহিক সেঞ্চুরি

শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক সাঙ্গাকারার দুর্দান্ত ব্যাটিং পারফরম্যান্স ছিল ২০১৫ বিশ্বকাপের বিখ্যাত ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। ইতিহাসের প্রথম ও একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি বিশ্বকাপে পরপর ৪টি ম্যাচে সেঞ্চুরি করার বিরল রেকর্ড গড়েন। সেই বিশ্বকাপে মাত্র ৭ ম্যাচ খেলে ৫৪৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। যা ছিল ২০১৫ বিশ্বকাপ আসরে ব্যক্তিগত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান।

Source: espncricinfo.com

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৭৫ বলে ১০৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংস দিয়ে শুরু হয়েছিল সাঙ্গাকারার এই রেকর্ডের পথচলা। এরপর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েলিংটনে খেলেন ৮৬ বলে ১১৭ রানের আরেকটি দুর্ধর্ষ ইনিংস। এছাড়া পরবর্তী দুটি ম্যাচে যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১০৪ ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১২৪ রানের দানবীয় ইনিংস খেলে এই কীর্তি গড়েন।

তবে ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়াটার ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার হেরে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় সাঙ্গাকারাদের। সেই ম্যাচ শেষে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন সাঙ্গাকারা।

২. ওয়াহাব রিয়াজ বনাম শেন ওয়াটসন

২০১৫ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের অন্যতম সেরা বোলার ছিলেন ওয়াহাব রিয়াজ। পাকিস্তানের পক্ষে সেবারের বিশ্বকাপে ১৬টি উইকেট সংগ্রহ করে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হন তিনি।

Source: cricbuzz.com

সেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে ওয়াহাব রিয়াজ তার শক্তিমত্তা দেখাতে সক্ষম হন। বিশেষ করে ঐ ম্যাচে শেন ওয়াটসনকে লক্ষ্য করে তিনি দুর্ধর্ষ বোলিং করতে থাকেন এবং প্রতিটি বলের পরে ওয়াটসনকে লক্ষ্য করে কিছু বলছিলেন।

তবে ওয়াটসন ঠান্ডা মাথায় রিয়াজের নিখুঁত লেন্থের বাউন্সার গুলো মোকাবেলা করেন এবং অর্ধশত রান করার মাধ্যমে দলের জয়ে অবদান রাখেন।

ওয়াহাব রিয়াজের বলে ওয়াটসন সেদিন আউট না হলেও বিশ্বকাপ ইতিহাসে তার করা একটি ওভার অন্যতম সেরা বলে বিবেচনা করা হয়। সেই ম্যাচে ওয়াটসনকে বিরুদ্ধে মোট ২৭ টি বল করেছিলেন ওহাব রিয়াজ। যার মাঝে ১৯ টি বলই ছিল ডট, বাকি ৮ বল থেকে ৯ রান সংগ্রহ করেন ওয়াটসন।

৩. বিশ্বকাপ থেকে ইংলিশদের বিদায়

২০১৫ বিশ্বকাপে অন্যতম সেরা এবং রোমাঞ্চকর মুহুর্তের একটি হলো বিশ্বকাপ থেকে ইংলিশদের বিদায়। সেবারের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের পারফরম্যান্স ছিল একেবারে বাজে। গ্রুপ পর্বে শুধুমাত্র আফগানিস্তান ও স্কটল্যান্ডকে হারাতে পেরেছিল তারা।

Source: essentiallysports

সেই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বাংলাদেশের মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড। মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরির সুবাদে প্রথমে ব্যাট করে ২৭৬ রানের লড়াকু সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ভালোই শুরু করেছিল ইংল্যান্ড। তবে ইনিংসের শেষের দিকে রুবেল হোসেনের অসাধারণ বোলিংয়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে ইংলিশ দুর্গ। ফলে ২৬০ রানেই গুটিয়ে যায় ইংলিশরা।

সম্প্রতি আইসিসির ফেসবুক পেজের এক জরিপের মাধ্যমে এই ম্যাচটি বিশ্বকাপের অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। এই ম্যাচ জয়ের মধ্য দিয়েই প্রথম বারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে বিতর্কিত ম্যাচে ভারতের কাছে হেরে যায় বাংলাদেশ।

৪. নক আউট পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম জয়

নক আউট পর্বে বারংবার হারের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকাকে অনেকবার সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। কারণ ২০১৫ বিশ্বকাপের আগে তারা কোনো মাল্টিন্যাশনাল টুর্নামেন্টের নক আউট পর্ব টপকাতে পারেনি।

১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি টাই করেছিল প্রোটিয়ারা। ক্রিকেটের জটিল হিসাবনিকাশের কারণে বাদ পড়তে হয় ল্যান্স ক্লুজনারদের।

Source: dna india

২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের আগ পর্যন্ত তারা সর্বমোট ৬ বার নক আউট পর্বে খেলেও জিততে পারেনি। অবশেষে ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়াটার ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে ৯ উইকেটে হারিয়ে সেই ব্যর্থতা ঘুচায় দক্ষিণ আফ্রিকা।

শ্রীলঙ্কা প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। জে পি ডুমিনির হ্যাটট্রিকের সুবাদে মাত্র ১৩৭ রানেই গুটিয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে কুইন্টন ডি কক ৫৭ রানের অপরাজিত ইনিংস সুবাদে ৯ উইকেট হাতে রেখেই জয় পায় প্রোটিয়ারা।

৫. অশ্রুসিক্ত দক্ষিণ আফ্রিকা

নক আউট পর্বে দীর্ঘ ৬ টি ম্যাচ হারের পর ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জয় পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে পরবর্তী ম্যাচেই তাদের সেই আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে হেরে যায় তারা।

সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম ব্যাট করতে নেমে ৪৩ ওভারে ২৮৩ রান সংগ্রহ করার পর ম্যাচটি বৃষ্টির সম্মুখীন হয়। বৃষ্টির মাত্রা অতিরিক্ত হওয়ায় ডার্কওয়ার্থ লুইস পদ্ধতির মাধ্যমে নিউজিল্যান্ডরে জয়ের জন্য ৪৩ ওভারে ২৯৩ রানের লক্ষ্য সেট করে দেয়া হয়।

স্টেইনের পঞ্চম বলে এলিয়ট ছয় হাঁকালে হতাশায় মাটি শুয়ে পড়েন স্টেইন।

source: espncricinfo.com

৪৩ ওভারে ২৯৩ রানের বড় লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ২৬ বলে ৫৯ রানের একটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন কিউই ওপেনার মার্টিন গাপটিল। একপর্যায়ে ম্যাচের শেষ ওভারে নিউজিল্যান্ডের জয়ের জন্য প্রয়োজন পড়ে ১২ রান। অন্যদিকে বল হাতে ক্রিজে আসেন দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সেরা বোলার ডেল স্টেইন।

স্টেইনের সেই ওভারের প্রথম চার বল থেকে ৭ রান সংগ্রহ করে কিউইরা। ফলে শেষ দুই বলে প্রয়োজন পড়ে ৫ রান। এমনই শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তে সেই ওভারের পঞ্চম বলে বিশাল এক ছক্কা হাঁকিয়ে নিউজিল্যান্ডের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে গ্রান্ট এলিয়েট। এমন শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে হারের পর দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় সব খেলোয়াড়কেই মাঠে কাঁদতে দেখা যায়।

Featured image source:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *