অ্যাশেজ ইতিহাসে স্পিনারদের গুরুত্বপূর্ণ ৫টি বোলিং ফিগার

টেস্টের ঐতিহ্যর ধারক ও বাহক বলা হয় অ্যাশেজকে, যা মূলত অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যে নির্দিষ্ট সময় পর পর হয়ে থাকে। ১৮৮২ সাল থেকে শুরু হওয়া অ্যাশেজের এখন পর্যন্ত ৭১টি সিরিজ সম্পুর্ণ হয়েছে। এতে ৩২ বার জয় লাভ করে ইংল্যান্ড। তাদের থাকে একবার বেশি জয় পায় অস্ট্রেলিয়া। বাকি ৬ বার সিরিজ ড্র হয়।

Image Source: ESPNCricinfo

ইংল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়া দুই দলের জয়-পরাজয়ের পার্থক্যটা কখনও ব্যাটসম্যান, কখনও বা বোলাররা গড়ে দিতেন। যেমনটা ২০১৯ অ্যাশেজ সিরিজে দেখা গিয়েছে। ইংল্যান্ড বোলারদের একাই নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছেন অজি ব্যাটসম্যান স্টিভ স্মিথ। পেসারদের পাশাপাশি স্পিন বোলারও ছিলেন ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট।

চলুন জেনে নেওয়া যাক অ্যাশেজ ইতিহাসে স্পিন বোলারদের গুরুত্বপূর্ণ ৫টি বোলিং ফিগার সম্পর্কে।

১. জিম লেকার

অ্যাশেজ ১৯৫৬; ম্যাচ ফিগারঃ ১৯/৯০

স্কোর- ইংল্যান্ড- ৪৫৯; অস্ট্রেলিয়া ৮৪ ও ২৫০ (ফ/অ) (ইনিংস ও ১৭০ রানে জয় লাভ করে ইংল্যান্ড)

১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের হয়ে টেস্ট খেলেন জিম লেকার। ১১ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে ৪৬টি ম্যাচ খেলেন তিনি। যাতে শিকার করেন ১৯৩টি উইকেট। ৪৬টি টেস্ট ম্যাচের মধ্যে ১৫টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। সেখানে উইকেট সংখ্যা ৮৯ টি। ইনিংস বেস্ট বোলিং ফিগার ছিল ১০/৫৩।

Image Source: ESPNCricinfo

লেকার তার ক্যারিয়ার জুড়েই বেশ অলোচিত ছিলেন। ক্যারিয়ারের শেষ সময়ে এসেও সে আলোচনার কমতি ছিল না। অবসর ঘোষণা দেওয়ার তিন বছর আগে ১৯৫৬ অ্যাশেজ সিরিজে নিজেকে যেন নতুন মাত্রায় নিয়ে গেলেন এই অফ ব্রেক বোলার। সিরিজের প্রথম তিন ম্যাচ খেলেই ২০ উইকেট তুলে নেন তিনি। চতুর্থ ম্যাচটিতে খেলতে নেমে বল হাতে গড়েন অনন্য এক কীর্তি।

Image Source: ESPNCricinfo

টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৯ উইকেট ও পরের ইনিংসে ১০ উইকেট শিকার করে অ্যাশেজ ও টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র বোলার হিসেবে এক ম্যাচে ১৯ উইকেট শিকার করার রেকর্ড গড়েন। যা এখন পর্যন্ত অটুট রয়েছে। তার বোলিং তোপে প্রথম ইনিংসে অজিরা ৮৪ রান ও দ্বিতীয় ইনিংসে ২৫০ রানে অলআউট হয়ে যায়। ইংলিশরা ম্যাচটি ১৭০ রান ও ইনিংস ব্যবধানে জয় লাভ করে। লেকার সে সিরিজে মোট ৪৬টি উইকেট শিকার করেন, যা এখন পর্যন্ত অ্যাশেজের এক আসরে সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকারের রেকর্ড।

২. স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল

অ্যাশেজ ১৯৯৯; ম্যাচ ফিগারঃ ১২/১০৭

স্কোর- অস্ট্রেলিয়া- ৩২২ ও ১৮৪; ইংল্যান্ড- ২২০ ও ১৮৮ (অস্ট্রেলিয়া ৯৮ রানে জয়ী)

স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল ছিলেন একজন দুর্দান্ত লেগ স্পিন বোলার। কিন্তু শেন ওয়ার্নের মতো লিজেন্ডারি বোলার দলে নিয়মিত হওয়ায় সব সময় সুযোগ পেতেন না তিনি। তবে যখনই সুযোগ পেয়েছেন নিজেকে প্রমাণ করেছেন। অজিদের হয়ে ওডিআইতে বেশি সুযোগ না পেলেও টেস্টে মোটামুটি নিয়মিতই ছিলেন ম্যাকগিল।

Image Source: ESPNCricinfo

ম্যাকগিল ক্যারিয়ারে ৪৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন যাতে উইকেট শিকার করেন ২০৮টি। ম্যাকগিল ১৯৯৯ অ্যাশেক সিরিজে খুব দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। সিরিজের প্রথম ৩ ম্যাচের ২টিতে জয় লাভ করে অজিরা। আর ১টি ড্র হওয়ায় সে সিরিজে ২-০ এগিয়ে ছিল তারা। চতুর্থ টেস্টে মাত্র ১২ রানের ব্যবধানে হারতে হয় তাদের। ফলে ২-১ ব্যবধান নিয়ে ৫ম টেস্ট খেলতে নামে তারা।

Image Source: ESPNCricinfo

শঙ্কা ছিল একটাই, শেষ ম্যাচ ইংলিশরা জিতলে সিরিজ যদি ড্র হয়ে যায়। অজিদের সে শঙ্কা দূর করে দেন ম্যাকগিল। দ্বিতীয় ইনিংসে তার বোলিং তোপে ৩২২ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নামা ইংল্যান্ডের ইনিংস থেমে যায় ২২০ রানে, তিনি শিকার করেন ৫৭ রান দিয়ে ৫ উইকেট।

Image Source: ESPNCricinfo

১০২ রানে এগিয়ে থাকা অজিরা তৃতীয় ইনিংসে আরও ১৮৪ রান যোগ করেন ফলে জয়ের জন্য ইংলিশদের টার্গেট হয় ২৮৬ রানের। সেখানেও আধিপত্য দেখান ম্যাকগিল। ৫০ রান দিয়ে তুলে নেন ৭ উইকেট। ৯৮ রান দূরে থেকেই অলআউট হয়ে যায় ইংল্যান্ড। ৩-১ ব্যবধানে সিরিজ জেতে অস্ট্রেলিয়া।

৩. শেন ওয়ার্ন

অ্যাশেজ ২০০৫; ম্যাচ ফিগারঃ ১০/১৬২

স্কোর- ইংল্যান্ড- ৪০৭ ও ১৮২; আউস্ত্রালিয়া- ৩০৮ ও ২৭৯ (ইংল্যান্ড ২ রানে জয়ী)

লেগ স্পিন জাদুকর নামে পরিচিত শেন ওয়ার্ন অ্যাশেজ ইতিহাসের এখন পর্যন্ত সেরা উইকেট শিকারি বোলার। অ্যাশেজ ক্যারিয়ারে ৩৬টি ম্যাচ খেলে ১৯৫ উইকেট শিকার করেন তিনি। অজি এই বোলার ক্যারিয়ারের একটা সেরা মুহুর্ত পার করছিলেন ২০০৫ সালের অ্যাশেজ সিরিজে। ৫ ম্যাচ খেলে ৫০ উইকেট শিকার করেন তিনি, যেখানে ২য় স্থানে থাকা বোলারের সাথে তার উইকেট ব্যবধান ছিল ১৬টি।

Image Source: ESPNCricinfo

সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ইংল্যান্ড ব্যাটিং লাইনআপে একাই কাঁপুনি ধরিয়েছিলেন ওয়ার্নার। ১ম ইনিংসে ১১৬ রান দিয়ে তুলে নেন ৪ উইকেট এবং শেষ ইনিংসে ৪৬ রান দিয়ে নেন ৬ উইকেট। যদিও ম্যাচটি অল্পের জন্য হেরে যায় তার দল। ১ম ইনিংসে ব্যাট করে সব কয়টি উইকেট হারিয়ে ইংলিশরা সংগ্রহ করে ৪০৭ রান। জবাবে ২য় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ৩০৮ রানে গুটিয়ে যায় অজিদের ইনিংস। ৯৯ রানে এগিয়ে থেকে ৩য় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে ১৮২ রানে অলআউট হয়ে যায় ইংল্যান্ড। ২৮১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ২ রান দূরে থেকে অলআউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।

৪. নাথান লায়ন

অ্যাশেজ ২০১৯; ম্যাচ ফিগারঃ ৯/১৬১

স্কোর- অস্ট্রেলিয়া- ২৮৭ ও ৪৮৭/৭ ডিক্লে. ইংল্যান্ড- ৩৭৪ ও ১৮৬ (অস্ট্রেলিয়া ২৫১ রানে জয়ী)

বর্তমানে টেস্টে অজি স্পিন লাইনআপকে নেতৃত্ব দেওয়া বোলার নাথাম লায়ন। ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৯১টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ৩৬৩ উইকেট শিকার করেন তিনি। অ্যাশেজেও খেলে ফেলেছেন ২৩ ম্যাচ, শিকার করেছেন ৮৫ উইকেট। ২০১৯ অ্যাশেজে তিনি দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। এই সিরিজের প্রথম ম্যাচে অজিদের জয় পাওয়ার পেছনে বল হাতে তার অবদান ছিল অনেক বেশি।

Image Source: ESPNCricinfo

ইংল্যান্ডের ২০ উইকেটের মধ্যে তার ঝুলিতে যায় ৯ উইকেট, খরচ করেন ১৬১ রান। প্রথম ইনিংসে শিকার করেন ৩ উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে নেন ৬ উইকেট। শেষ ইনিংসে তার ৬ উইকেট শিকারের দুর্দান্ত বোলিংয়ে মাত্র ১৪৬ রানে অলআউট হয়ে যায় ইংল্যান্ড। ২৫১ রানে বিশাল ব্যবধানে জয়ে দিয়ে সিরিজের শুভ সূচনা করে অজিরা।

৫. গ্রেম সোয়ান

অ্যাশেজ ২০০৯; ম্যাচ ফিগারঃ ৮/১৫১

স্কোর- ইংল্যান্ড- ৩৩২ ও ৩৭৩/৯ ডিক্লে; অস্ট্রেলিয়া- ১৬০ ও ৩৪৮ (ইংল্যান্ড ১৯৭ রানে জয়ী)

২০০৯ সালের অ্যাশেজ সিরিজে শেষ ম্যাচের আগে একটি করে জয়ে দুই দলের মধ্যকার সমান অবস্থা ছিল। পঞ্চম টেস্টে জয়-পরাজয় হিসাবে সিরিজ জয় লাভ করত যে কোনো এক দল। আর যদি ড্র হতো তাহলে স্বাগতিক চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার কাছেই যেত মর্যাদার সে ট্রফি। কিন্তু গ্রেম সোয়ান, স্টুয়ার্ট ব্রডের দুর্দান্ত বোলিং বারবার ম্যাচ জয়ের আভাস দিচ্ছিল ইংলিশ শিবিরে। শেষ পর্যন্ত ইংলিশরাই ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয় লাভ করে।

Image Source: ESPNCricinfo

শেষ টেস্টটিতে ইংলিশদের ২০ উইকেটের ৮টি তুলে নেন সোয়ান। প্রথম ইনিংসে ৩৮ রান দিয়ে তুলে নেন ৪ উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ ব্রেক থ্রুসহ কার্যকরী বোলিংয়ে ১২০ রান দিয়ে ৪ উইকেট শিকার করেন। ম্যাচটি অজিরা ১৯৭ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় লাভ করে।

Featured Image: ESPNCricinfo

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *