যুবরাজ সিংয়ের ক্যারিয়ার সেরা ৫টি মুহুর্ত

গত ১০ জুন মুম্বাইয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ক্রিকেটের সব ধরনের ফরম্যাট থেকে অবসর ঘোষণা দেন যুবরাজ সিং। ৩৭ বছর বয়সী ভারতীয় অলরাউন্ডার তার ১৯ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ভারতের হয়ে সব ফরম্যাটে মোট ৩৯৯টি ম্যাচ খেলেন।

Image Source: northeastlive

তার নামের পাশে রয়েছে তিনটি আইসিসি ট্রফি। ২০০২ আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ট্রফি ও ২০১১ ওডিআই বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের মতো বড় বড় সাফল্য রয়েছে তার নামের পাশে। চলুন জেনে নেওয়া যাক যুবরাজ সিংয়ের ক্যারিয়ারের কয়েকটি স্মরণীয় ম্যাচ সম্পর্কে।

৫. ২০০৮ সালে চেন্নাইতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেন্ডুলকারের সাথে জুটি

২০০৮ সালের শেষ দিকে ইংল্যান্ড দল ভারত সফরে আসে। সে সফরে তাদের ৭টি একদিনের ম্যাচ ও ২টি টেস্ট ম্যাচ খেলার কথা ছিল। কিন্তু ২৬ নভেম্বর পঞ্চম ওডিআই চলাকালীন সময় ভারতের মুম্বাইয়ে জঙ্গি হামলা হওয়ায় পরবর্তী ২টি ওডিআই ম্যাচ বাতিল ঘোষনা করা হয়। এবং সেই ম্যাচের পরপরই ইংলিশরা দুই টেস্ট বাকি থাকতেই ভারত ত্যাগ করে। তবে নিজ দেশে ফিরে না গিয়ে তারা আবুধাবিতে অবস্থান করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলে ইংলিশরা আবারও ভারতে এসে টেস্ট সিরিজ খেলতে সম্মতি জানায়।

Image Source: espncricinfo

সে সিরিজের ৫টি ওডিআইয়ের মধ্যে ৫টিতেই জয় লাভ করেছিল স্বাগতিকরা। যার পেছনে ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন যুবরাজ সিং। ৫ ম্যাচের ২টিতেই তিনি শতক হাঁকান। ওডিআই সিরিজে দুর্দান্ত পারফর্ম করায় যুবরাজ সিং জায়গায় করে নেন টেস্ট সিরিজেও। তবে সে সুযোগটা এতো সহজে মেলেনি, সৌরভ গাঙ্গুলির ইঞ্জুরিতে দলে জায়গা হয় তার। কারণ তখনকার সময়ে ভারত দলের ব্যাটিং লাইনাআপের মূলমন্ত্র হিসেবে দেখা হতো রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলি, শচীন টেন্ডুলকার ও ভিভিএস লক্ষ্মণকে।

Image Source: espncricinfo

টেস্ট, ওডিআই কিংবা টি টোয়েন্টি তাদের দলে থাকাটা ছিল নিশ্চিত। তাদের মাঝে নতুন কেউ দলে জায়গা পাওয়াটা ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। তাই ওডিআইতে ভালো করেও টেস্ট দলে নিয়মিত জায়গা পাননি যুবরাজ সিং। কিন্তু হঠাৎই গাঙ্গুলির ইঞ্জুরিতে ভাগ্যে খুলে তার। দলে জায়গা পেয়ে প্রথম টেস্ট ম্যাচেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণেও সফল হন তিনি। প্রথম টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ দিনের চা বিরতিতে এসে ইংল্যান্ড দল ইনিংস ঘোষনা করে। ফলে শেষ ইনিংসে ভারতের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩৮৭ রানের।

জয় উদযাপনে যুবরাজ ও টেন্ডুলকার; Image Source: espncricinfo

জয় কিংবা ড্র যেকোনো একটির জন্য ভারতকে ৩৮৭ রান সামনে রেখে লড়তে হতো আরও ৪ সেশন। জবাবে ব্যাট করতে নেমে চতুর্থ দিনের শেষ সেশনে ভারতের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৩১/১। পঞ্চম দিনে ব্যাটিংয়ে নেমে দলীয় ২২৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ হারের শঙ্কা জাগে স্বাগতিকদের মাঝে। সে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় যুবরাজ সিং ও টেন্ডুলকারের ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে ১৬৩ রানের ইনিংস। সে জুটিতে আর কোনো উইকেট না হারিয়ে ৬ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে জয় তুলে নেয় ভারত। ম্যাচটিত অপরাজিত থেকে টেন্ডুলকার ১০৩ ও যুবরাজ ৮৫ রান করেন।

৪. অভিষেক ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৮৪ রান

২০০০ সালে আইসিসির অধীনে কানাডায় ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আইসিসি নক আউট কাপ নামক একটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করে। যাতে ভারত, বাংলাদেশ, কানাডা, সহ ১১টি দেশ অংশগ্রহণ করে। টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয় ভারত ও কানাডা। এই ম্যাচ দিয়েই যুবরাজ সিং তার আন্তর্জাতিক ওডিআই ক্যারিয়ার শুরু করেন। তবে ওই ম্যাচে তিনি ব্যাট করার সুযোগ পাননি। পরবর্তী রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্যাট করার সুযোগ পান। অভিষেক ম্যাচে ব্যাট করতে নেমে বাজিমাত করেন যুবরাজ।

Image Source: espncricinfo

ম্যাচটিতে যখন তিনি ব্যাট করতে নামেন ভারতের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেট হারিয়ে ৯০ রান। ব্যাট করতে নেমে তার অসাধারণ সব শট দেখে হতবাক হয়ে যান টিম ম্যানেজমেন্ট এবং অজি বোলাররা। ১৮ বছর বয়সের এই যুবক অভিষেক ম্যাচে মাত্র ৪৬ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করেন। তারপরও তিনি দমে যাননি, তার ৮৪ রানের ইনিংসের উপর ভর করে ২৬৫ রানের পুঁজি পায় ভারত এবং তারা ম্যাচটি ২০ রানের ব্যবধানে জয় লাভ করে। যুবরাজের এই ইনিংসটি তখন প্রমাণ করে সাদা বলের একজন উপযুক্ত খেলোয়াড় ভারত দল খুঁজে পেয়েছে।

৩. ২০০২ সালের ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের ফাইনাল

২০০২ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডকে নিয়ে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজের আয়োজন করা হয়। যার ফাইনালে মুখোমুখি হয় ভারত ও স্বাগতিক ইংল্যান্ড। দিনটি ছিল ২০০২ সালের ১৩ জুলাই। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে আগে ব্যাট করে ৩২৫ রানের পুঁজি পায় ইংলিশরা। বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নামা ভারতের ম্যাচ জয়ের আশার কেন্দ্র বিন্দুতে ছিলেন শচীন টেন্ডুলকার। কিন্তু টেন্ডুলকার যখন আউট হয়ে সাঝঘরে ফিরে যান তখন ভারতের সংগ্রহ পাঁচ উইকেটে ১৪৬ রান।

যুবরাজ ও কাইফ; Image Source: espncricinfo

টেন্ডুলকারের উইকেট পতনে হতাশ হন ভারতের ক্রিকেট প্রেমীরা। কিন্তু সে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন দুই যুবক মোহাম্মদ কাইফ ও যুবরাজ সিং। তারা প্রমাণ করেন ভারত এখন আর টেন্ডুলকার নির্ভর না, ম্যাচ জেতানোর মতো খেলোয়াড় তাদের আরও রয়েছে। দুই জনের ১২১ রানের জুটি ভারতকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যায়। যুবরাজ ৬৯ রান ও কাইফের অপরাজিত ৮৭ রান দলকে ঐতিহাসিক জয় উপহার দেয়। এটি ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য।

২. ছয় বলে ছয় ছক্কা

ক্রিকেট ইতিহাসের যেকোনো ফরম্যাটের জন্য দ্রুততম অর্ধশতকের রেকর্ডটি রয়েছে যুবরাজ সিংয়ের দখলে। ২০০৭ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার এইট রাউন্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ১২ বলে এই রেকর্ডটি করেন তিনি। তাছাড়া ওই ম্যাচে তিনি আরেকটি রেকর্ডের জন্ম দেন। সেটি ইংলিশ বোলার স্টুয়ার্ট ব্রডের এক ওভারের ছয় বলে ছয়টি ছক্কা হাঁকান যুবরাজ। এই রেকর্ডের বারো বছর পার হলেও এখনো কেউ তার দ্রুততম অর্ধ শতকের রেকর্ডটি ভাঙ্গতে পারেনি।

১. ২০১১ বিশ্বকাপে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট

২০১১ বিশ্বকাপে ব্যাট বলে দুর্দান্ত ছিলেন যুবরাজ সিং। বলা যায় তার অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্সেই ২৭ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ গ্রহণ করে ভারত। পুরো টুর্নামেন্টে বল হাতে ১৫ উইকেটের পাশাপাশি ব্যাট হাতে ৩৬২ রান করেন। ১টি শতকের পাশাপাশি ৪টি অর্ধ শতকও করেন তিনি। তার একমাত্র শতকটি আসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে।

ধোনী ও যুবরাজ; Image Source: espncricinfo

সে আসরে তার সেরা বোলিং ফিগার ছিল ৩১ রানের বিনিময়ে ৫ উইকেট। যা তিনি আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে করেন। তাছাড়া কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও তিনি উইকেট শিকার করে দলের জয়ে ভূমিকা রাখেন। ওই আসরের ফাইনালে ম্যাচের শেষ উইকেট জুটিতে ধোনির সাথে মাঠে থেকে ইতিহাসের সাক্ষী হন যুবরাজ।

Featured Image: espncricinfo

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *